বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:১৮

ব্রিটিশ ভারতের মহিশুর রাজ্যের শেষ স্বাধীন শাসনকর্তা টিপু সুলতান

মো. জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
ব্রিটিশ ভারতের মহিশুর রাজ্যের শেষ স্বাধীন শাসনকর্তা টিপু সুলতান

ব্রিটিশ আমলে যে কয়জন শাসনকর্তা ছিলেন তাদের মধ্যে টিপু সুলতানের শাসনব্যবস্থা ছিল ভিন্নধর্মী। ব্রিটিশ ভারতের মহীশুর রাজ্যের শেষ স্বাধীন শাসনকর্তা টিপু সুলতানের জন্ম ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর দেওয়ানহালিতে। তার বাবা হায়দার আলী ছিলেন মহিশুরের শাসক। মায়ের নাম ফাতেমা বা ফখরুন নিসা।

টিপু সুলতান ১৭৯৯ সালের ৪ মে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একাধারে কবি পণ্ডিত ও সেনানায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীরত্বসহকারে যুদ্ধ করে তিনি শহীদ হন। তিনি শের-ই মহীশুর বা মহীশুরের বাঘ নামে পরিচিত। তাকে ডাকা হতো টিপু সাহেব, সুলতান ফতেহ আলী খান সাহেব, বাহাদুর খান টিপু সুলতান ইত্যাদি নামে।

টিপু সুলতান নামের পেছনে যে কারণটি ছিল তা হচ্ছে : তার বাবা হায়দার আলী এবং মা ফখরুন নিসার বাড়িতে এক ফকির আসতেন। সেই ফকিরের নাম ছিলো টিপু। আল্লাহর রহমতে পরবর্তীতে তাদের সন্তান লাভ করেন। সন্তান লাভ করার পরে এই দম্পতি ফকিরের নামে সন্তানের নাম রাখেন টিপু সুলতান। স্থানীয় কানাড়ি ভাষায় টিপু শব্দের অর্থ বাঘ। তবে শের-ই মহিশুর উপাধিটি ইংরেজদের দেওয়া। তার বাঘ হয়ে ওঠার পেছনে ছিল অসাধারণ ক্ষীপ্রতা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলপূর্ণ রাজ্য পরিচালনা। ১৭৬৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইংরেজদের বিরুদ্ধে মহিশুরের প্রথম যুদ্ধে সাত হাজার সৈন্যের এক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে ইংরেজদের পরাস্ত করেন। এছাড়া (১৭৭৫-১৭৭৯) প্রথম অ্যাংলো মারাঠা যুদ্ধেও তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

১৭৮১ সালে ইংরেজি সেনাপতি হেক্টর মুনরোর বাহিনীর তার কাছে নাজেহাল হয় এই যুদ্ধের পর ব্রিটিশদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন যা মাঙ্গালোর চুক্তি হিসেবে খ্যাত। ১৭৮২ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি মহিশুরের কর্ণধার হন। তার রাজ্যের রাজধানী ছিল শ্রীরঙ্গপত্তন। শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরী নদীর একটি বদ্বীপে নির্মিত, একটি দুর্গ থেকে রাজ্য শাসন শুরু করেন।

তার রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল উত্তরের কৃষ্ণ নদী থেকে পূর্বের পূর্ব ঘাট ও পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত। তৃতীয় মহিশুরের যুদ্ধে তাকে ছেড়ে দিতে হয় মালাবার ও ম্যাঙ্গালোর। চতুর্থ মহিশুরের যুদ্ধে ১৭৯৯ সালের ৪ মেয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়াই করে শহীদ হন। তার আগে টিপু সুলতানের এক সেনাপতি মীর সাদিক বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলান।

টিপুর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ছিল ভারতবর্ষের রাজপুত্রদের জন্য সামরিক বিজ্ঞানের বিদ্যালয় স্বরূপ। যুদ্ধক্ষেত্রে রকেট ব্যবহার করার প্রবর্তক তিনি। ধর্মভিরু মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ফরাসীদের অনুরোধে মহীশুরে প্রথম গির্জা নির্মাণ করেন।

একটি নতুন ক্যালেন্ডারের ও প্রবর্তন করেন। নতুন ধরনের রাজস্বব্যবস্থা ও রেশম শিল্পের যথেষ্ট উন্নতি করেন। ফরাসীদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। ইংরেজ ও পার্শ্ববর্তী মারাঠা, সিরা, মালাবারের শাসক কুর্গ, বেন্দুর, কর্ণাটক ও ট্রাভানকরের (হিন্দু সামন্ত রাজত্ব) বিরুদ্ধে অভিযানে ফরাসি প্রশিক্ষিত সৈন্যের ব্যবহার করেন। উসমানিয়া সাম্রাজ্য, আফগানিস্তান ও ফ্রান্সে কূটনৈতিক পাঠান বিভিন্ন সময়ে। তার ইচ্ছে ছিল নেপোলিয়নের সঙ্গে মিলে ব্রিটিশদের উৎখাত করা।

ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপ্রথম উর্দু পত্রিকা ফাতহুল মুজাহিদীন তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হতো। বাংলাদেশ টেলিভিশনে টিপু সুলতানের সেই বীরত্বগাথা সময়গুলো সম্প্রচারিত হওয়ায় দেখার সুযোগ হয়েছিল। আজ টিপু সুলতান নেই। মোগলরা নেই, নেই সাম্রাজ্য, কিন্তু ইতিহাস রয়ে গেছে। এইভাবেই যুগের পর যুগ মানুষ চলে যাবে তার কর্ম জীবনের প্রতিটি ইতিহাস লিখা থাকবে কোন না কোনভাবে মানুষের মাঝে। ভারত উপমহাদেশের মধ্যে এখনো পুরাতন ইতিহাস ঐতিহ্য দৃশ্যমান।

মো. জাহাঙ্গীর আলম হৃদয় : সাংবাদিক, কবি, সাংস্কৃতিক সংগঠক, সমাজকর্মী, নাট্যকার ও রোটারিয়ান।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়