প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:১৭
অসহিষ্ণুতার মূল্য দিচ্ছি অমূল্য জীবন দিয়ে

সম্প্রতি রাজধানীতে ইটের আঘাতে আহত তরুণ সাজিদ চৌধুরী রাফির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি মিরপুরে পূর্ব শেওড়াপাড়ার যে পথ দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, একই পথে আমি সাইকেলে যাতায়াত করি। সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, পূর্বশত্রুতার জেরে এই হামলা হয়েছিল ৯ জুন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় রাফিকে লক্ষ্য করে একজন ইট ছুড়ে মারেন। ইটের আঘাতে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় পড়ে অচেতন হয়ে যান। এরপর তাঁকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। আইসিইউ সাপোর্টসহ ১৩ দিনের সব ধরনের চিকিৎসা ব্যর্থ করে তাঁর মৃত্যু হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এমন বেদনাদায়ক প্রাণহানি বেড়ে গেছে উদ্বেগজনক হারে। তুচ্ছ কারণে প্রতিপক্ষকে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলা হচ্ছে, কেমন অবলীলায়! গত বৃহস্পতিবার সমকালে এমন চারটি ঘটনার খবর ছিল। রংপুরে নিছক থুতু ফেলা নিয়ে হোটেল শ্রমিককে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে ফোন চুরির অপবাদে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তারই কিছু সিনিয়র সহপাঠী। গাইবান্ধায় এক কিশোরকে পুকুরে চুবিয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে তারই দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে।
এই সকল অঘটন নিশ্চয় আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সামাজিক সহনশীলতা ও মানবিকতা নিয়ে। অপরাধীরাও যেন আগের চেয়ে বেপরোয়া। ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণহানির খবর আগের চেয়ে বেড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে ছিনতাইকারী ব্যাগ টানাহেঁচড়ায় রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যু হয়েছে এক নারীর।
একেকটি প্রাণহানি পরিবারের জন্য কতটা বেদনার, ভুক্তভোগীরাই কেবল বুঝতে পারেন। সাজিদ চৌধুরী রাফির মৃত্যুর খবরের শিরোনাম ‘রাফি ছিল অন্ধের যষ্টি, তাকে ঘিরেই আমার দুনিয়া’ (সমকাল, ২৩ জুন ২০২৬)। সন্তানের মৃত্যু মা কি সহ্য করতে পারেন? বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজনও কি পারেন? রাফি যে কয়দিন ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন, মা সেখানেই ছিলেন। আশা ছিল, ছেলেকে সুস্থ করে একসঙ্গে বাসায় ফিরবেন। মা বাসায় ফিরেছেন, কিন্তু রাফি চলে গেছেন না ফেরার ঠিকানায়। শত্রুতার জেরে মানুষ এতটা অমানবিক হয় কীভাবে?
মঙ্গলবার ভোরেই বেদনাদায়ক ভিডিও দেখে দিনটা শুরু হয়েছে। গ্রামে আমাদেরই প্রতিবেশীর দোকান কারা যেন পুড়িয়ে দিয়েছে। তার আয়ের একমাত্র উৎস ছিল দোকানটি। অথচ পুড়িয়ে দিল! এ কেমন শত্রুতা? আগুনের লেলিহান শিখায় খাবারসহ দোকানের আসবাব পুড়ছিল, আর সবাই অসহায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মানুষের ভেতরের শত্রুতা, হিংসা, ইগো আর ক্রোধের আগুন সম্ভবত এর চাইতেও লেলিহান।
রাস্তায় চলতে ফিরতেও ক্রোধ ও ক্রূরতা কিছুটা টের পাওয়া যায়। যানজটের শহরে পাশাপাশি চলতে গিয়ে একটি পরিবহন আরেকটির সঙ্গে লেগে যেতেই পারে। সঙ্গে সঙ্গেই চালক বা আরোহী রুদ্র মূর্তি ধারণ করে। একদিনের ঘটনা। দুই মোটরসাইকেলের মধ্যে লেগে গেল। এরপর বাদানুবাদ। কিছুক্ষণ পর দেখলাম একজন লোহার রড নিয়ে হাজির! ততক্ষণে জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। কী ঘটেছে আর জানা হয়নি; আমিও নির্মম ও অসহায় নিজের সাইকেল নিয়ে চলে গেলাম।
কোনো ঘটনা ঘটলেও সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিশোধ নিতে হবে কেন? এটাও ঠিক, আইনের কাছে গিয়ে অনেক সময় বিচার পাওয়া যায় না। উল্টো নিজেকেই ফাঁসতে হয়। অবশ্যই সরকারকে আইনশৃঙ্খলায় মনোযোগী হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ যেভাবে বেড়েছে তা উদ্বেগজনক। সোমবারের সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন আইনশৃঙ্খলার সেই চিত্রই দেখিয়েছে। পুলিশ বলছে, তারা চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি যতটা ভয়ানক; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা ততটা জোরালো কিনা, সেই প্রশ্ন উঠছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো হলে; প্রশাসন বিচার পাওয়ার মতো ভরসাস্থল হয়ে উঠলে নিশ্চয় পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
পরিস্থিতি যেমনই হোক, মানবিকতা জরুরি। মানুষ হিসেবে ন্যূনতম সহিষ্ণুতা তো দেখাতেই হবে। সামাজিক জীব হিসেবে পাশাপাশি চলতে গেলে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা লাগতেই পারে। সে জন্য প্রাণহানির আয়োজন! মানুষের জীবন অমূল্য। এই জীবনের জন্যই পৃথিবীর শত আয়োজন! মা-বা সন্তানকে কত কষ্ট করে ছোট থেকে বড় করেন! চিকিৎসকরা রোগীর সুস্থতায় কমতি করেন না। রাষ্ট্রের আয়োজনও তো জীবন রক্ষার জন্য। সেই জীবনই চলে যাচ্ছে সামান্য কারণে!
ইন্টারনেটের যুগে এখন পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয়। হাজারো সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমে মানুষ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের খবর পায়। এই কাছে আনার প্রযুক্তিই কি মানুষের দূরত্বের কারণ হয়ে যাচ্ছে? অনলাইনে তাৎক্ষণিক মন্তব্য, প্রিয়জনের সামান্য অপ্রিয় বার্তার কড়া জবাব দিতে গিয়ে আমরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। বাস্তবেও ইগোর কারণে তুচ্ছ সমস্যাকে আমরা বড় করি। আমাদের এখানেই থামতে হবে।








