বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:১৭

পরিবারের ভিত্তি নির্মাণে বাবার ভূমিকা কেবল আর্থিক নয় বরং মানসিক ও নৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার
পরিবারের ভিত্তি নির্মাণে বাবার ভূমিকা কেবল আর্থিক নয় বরং মানসিক ও নৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ

সমাজে সফল সন্তানদের গল্প শোনা যায়, কিন্তু সেই সফলতার পেছনে বাবার নিরলস পরিশ্রম ও ত্যাগের কথা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, একজন সন্তানের প্রতিটি অর্জনের পেছনে বাবার ঘাম, শ্রম, উদ্বেগ ও আত্মত্যাগের এক দীর্ঘ ইতিহাস থাকে। বাবার ভালোবাসা এক নিঃশর্ত, নির্মল ও চিরন্তন অনুভূতির নাম। একজন সন্তানের জন্মের পর থেকে তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পেছনে বাবার অবদান অপরিসীম।

অনেক সময় বাবার ভালোবাসা মায়ের মতো প্রকাশ্য নয়, বরং তা প্রকাশ পায় দায়িত্ববোধ, ত্যাগ, পরিশ্রম এবং কঠোর শাসনের মাধ্যমে। সন্তান যেন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে এবং সমাজে একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, এই লক্ষ্যেই একজন বাবা নিজের আরাম-আয়েশ, স্বপ্ন এবং ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দেন। পরিবারের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করতে তিনি দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেন, নিজের কষ্টকে আড়াল করে রাখেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে তিনি অনেক সময় নিজের আনন্দকেও তুচ্ছ জ্ঞান করেন। তাই পরিবারের ভিত্তি নির্মাণে বাবার ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানসিক ও নৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানের জীবনে নানা প্রতিকূলতা, সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুহূর্তে বাবা এক অদৃশ্য ঢালের মতো পাশে দাঁড়ান। আর্থিক সংকট, সামাজিক বাধা কিংবা জীবনের অনিশ্চয়তার সময় একজন বাবা নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ নিশ্চিত করে সন্তানের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেন। অনেক বাবা নিজের চিকিৎসা, শখ কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সন্তানের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করেন। কেউ কেউ দিনের পর দিন অতিরিক্ত কাজ করেন, আবার কেউ বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়ে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান। কিন্তু এসব ত্যাগের অধিকাংশই প্রচারের আলো পায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আধুনিক সমাজে পারিবারিক বন্ধনের কিছুটা অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা-মাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না। বিশেষ করে মা মারা যাওয়ার পর অনেক বাবা চরম নিঃসঙ্গতার মধ্যে জীবন কাটান। সন্তানেরা কর্মব্যস্ততা, নগরজীবনের চাপ কিংবা ব্যক্তিগত নানা কারণে বাবার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়। এর ফলস্বরূপ অনেক বৃদ্ধ অভিভাবক অবহেলা, অযত্ন কিংবা একাকীত্বের শিকার হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যদিও সব বৃদ্ধাশ্রমের পরিবেশ খারাপ নয় ও ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেন। তবুও একজন বাবা তার জীবনের শেষ সময়ে পরিবারের কাছেই থাকার ইচ্ছে রাখেন। পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিক উপস্থিতি প্রত্যাশা করেন। যে মানুষটি সারা জীবন পরিবারকে আগলে রেখেছেন, তার বার্ধক্যে একাকীত্ব ও মানসিক কষ্টের জীবন কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

অনেক সন্তান আছেন, যারা বাবার সুখ ও মানসিক সুস্থতার কথা ভেবে অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দেন। এসব উদ্যোগ কেবল বাবার জীবনকে আনন্দময় করে তোলে না, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক দায়িত্ববোধেরও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এমন উদাহরণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম, তবুও এগুলো সমাজের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে। কারণ একজন মানুষের মানসিক সুস্থতা ও সুখের জন্য শুধু খাদ্য, বস্ত্র বা চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান, সঙ্গ এবং সামাজিক স্বীকৃতি। বার্ধক্যে বাবার এসব চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া সন্তানের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বের অংশ।

প্রকৃতপক্ষে বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক হলো নিঃশর্ত ভালোবাসা, নির্ভরতা এবং নীরব ত্যাগের এক অপূর্ব বন্ধন। মুখে না বললেও সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপে বাবার যে অদৃশ্য ছায়া থাকে, তা সন্তানের জীবনকে করে তোলে সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী। সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো বাবার কাঁধ। বাবা বাইরে থেকে যতই কঠোর বা গম্ভীর হোন না কেন, সন্তানের প্রতি তাঁর হৃদয় সবসময় কোমল থাকে। যেকোনো বিপদে সন্তান সবার আগে বাবার মাঝেই ভরসার জায়গা খুঁজে পায়।

প্রতিবছর জুনের তৃতীয় রোববার (এ বছর ছিলো ২১ জুন) বিশ্ব বাবা দিবস হলেও দিবসটির প্রকৃত সার্থকতা কোনো নির্দিষ্ট দিনে উপহার দেয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আসল সার্থকতা হলো বাবার আজীবন করা অসীম ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে উপলব্ধি করা এবং বছরব্যাপী তাকে যথাযথ সম্মান, সঙ্গ ও নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা। এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে বাবার প্রতি দৈনন্দিন যত্ন, সম্মান এবং দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে।

বৃদ্ধ বয়সে বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে নয়, বরং নিজের পরিবারে, নিজের সন্তানের পাশে এবং আপনজনদের সান্নিধ্যে রাখার মধ্যেই তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। যে বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, বিপদে সাহস জুগিয়েছেন এবং জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাশে থেকেছেন, তার বার্ধক্যে সন্তানেরও উচিত একইভাবে তার পাশে দাঁড়ানো। আমাদের মনে রাখতে হবে, একদিন আমরাও বৃদ্ধ হব এবং আমাদের সন্তানরাও আমাদের আচরণ থেকেই শিক্ষা নেবে। তাই পরিবারে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

বাবা দিবসে সকল বাবাকে গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকননোলজি,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়