বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:৫৬

ধারাবাহিক স্মৃতিকথা

বড়বেলার স্কুলজীবন

হীরামনি
বড়বেলার স্কুলজীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আজ বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ভাবছি ডরমিটরিতে ফিরে জম্পেশ একটা ঘুম দিবো, এই পরিকল্পনা করতে করতে ফিরছি। হঠাৎ সূর্যের আলো মনকে চনমনে করে দিলো। ঘুমের চিন্তা বাদ। পড়াশোনা করবো, ঘর গুছাবো, গান শুনবো, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি করবো। ইদানিং প্রচুর অডিওবুক শুনছি। অডিওবুক শোনার একটা সুবিধা হলো বই শোনার পাশাপাশি অন্য কাজও করা যায়। বই শুনতে শুনতে অনেক কাজ করলাম। এবার কী করা যায়! সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ। ভাবলাম একটা ম্যুভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া যেতে পারে, ঠিক তাই হলো। রোমাঞ্চরহস্য সিনেমা আমার বেশ পছন্দের। মগজ সজাগ থাকে, মগজে ঘর্ষণ হয়, ভালোলাগার অনুভূতি কাজ করে। এখন যে ম্যুভি দেখছি তার নাম চুপ। ভারতের দক্ষিণের নাম করা মুসলমান নায়ক দুলকার সালমানের এই ম্যুভিটা অসাধারণ। ম্যুভির একটা গান খুব মনে ধরেছে। ১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতের হিন্দি ভাষার ছবি পিয়াসার একটি গান ব্যবহার করা হয়েছে এই ম্যুভিতে। সেই গানটির একটা অংশ এই ম্যুভিতে বারবার শোনা যাচ্ছিলো। ভাল লাগায় গুগোল সার্চ করে তারপর এই গান সিঙ্গেল লুপ দিয়ে শুনেই যাচ্ছি। তাছাড়া কেন যেনো নৃ -র সাথে নায়কের বেশ মিল পেয়েছি। ম্যুভি দেখা শেষ। ডিনার করা দরকার। কিছু কাপড়-চোপড় জমে আছে সেগুলোও ধোয়া দরকার। উন্নত রাষ্ট্রের এটা একটা অসুবিধা, সব কাজ নিজের হাতে করতে হয় যদিও মেশিন আছে, তবুও মেশিনকে ঠিকঠাক নির্দেশনা দিতে হয়, সাথে সময়ের একটা ব্যাপার আছেই। সবই করলাম।

বাইরে অনেক ঠাণ্ডা কিন্তু হঠাৎ ইচ্ছে করছে আইসক্রীম খাই। এজন্য যেতে হবে ই-মার্টে। দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম বৃহত্তম রিটেইল সুপারমার্কেট চেইনশপ ই-মার্ট, যা শিনসেগে গ্রুপের মালিকানাধীন। এটি ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কোরিয়াজুড়ে অসংখ্য শাখা রয়েছে। ই-মার্ট মূলত গ্রোসারি, ইলেকট্রনিক্স, পোশাক, গৃহস্থালী পণ্য, প্রসাধনী এবং অন্যান্য ভোক্তা সামগ্রী বিক্রি করে। এটি কোরিয়ার প্রথম হাইপারমার্কেট হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে অনলাইন শপিং সেবাও প্রদান করে। আমাদের স্কুলের ই-মার্টেই আইসক্রীম পাবো। কিন্তু সেখানে কোনো দোকানদার থাকেন না। ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে এই ই-মার্ট। পণ্য নির্বাচন করে কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করতে হয় নিজেকেই।

রবার্ট তাঁর গ্রাজুয়েশন শেষ করে যখন ক্যামেরুনে ফেরত গিয়েছে, সেদিন একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। রবার্ট, আমার কাছের বন্ধু, যখন জানিয়েছিলো যে তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে, তখন আমার মনটা ভারী হয়ে গিয়েছিলো। তার উপস্থিতি সবসময়ই আমাকে সাহস আর আনন্দ দিয়েছে। যাওয়ার আগে সে আমাকে একটি মেসেজ দিয়ে বলেছিল, “তুমি চিন্তা করো না। আমি দূরে থাকলেও সব সময় তোমার সাথেই থাকবো, তুমি যাতে একা অনুভব না করো।” রবার্টের পাঠানো ভিডিওটি খুলতেই বুঝলাম, ই-মার্টে গিয়ে কিভাবে কার্ড দিয়ে পণ্য কিনতে হয় তারই একটা ভিডিও। রবার্ট বাড়ি ফেরার আগে নিজে যখন ই-মার্টে পণ্য কিনেছে তখন সেটার ভিডিও করে রেখেছিলো। সেটাই পাঠিয়েছে। কার্ড দিয়ে কিভাবে ই-মার্টে পণ্য কিনতে হয় আমি জানতাম না, সেটা রবার্ট খুব ভালো করে জানে। ভিডিওতে সে হাসিমুখে ইংরেজিতেই বলল, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় “তুমি প্রথমবার ই-মার্টে একা একা গিয়ে যখন কেনাকাটা করবে, সেটা যাতে সহজ হয়, তাই তোমার জন্য এই ভিডিওটা করছি।” ভিডিওতে রবার্ট প্রথমে পণ্য বাছাই করলো। তারপর শপিং কার্টে পণ্যগুলো রাখার সময় সে আমাকে বোঝাতে লাগল, কোন শেলফ থেকে কীভাবে পণ্য নিতে হয়। চেকআউট কাউন্টারে গিয়ে সে দেখালো কীভাবে বারকোড স্ক্যান করতে হয়। তারপর সে তার কার্ডটি বের করে মেশিনে ট্যাপ করল এবং বললো, “দেখলে, এটা কত সহজ? শুধু ট্যাপ করো, ভাষা পরিবর্তন করে ইংরেজি করে নাও, এখন পিন দাও আর পেমেন্ট হয়ে যাবে। পেমেন্ট শেষ হলে রসিদটা নিতে ভুলো না।” রবার্টের ভিডিওর প্রতিটি ধাপ আমার জন্য যত্নের প্রতীক। তার কণ্ঠে আমি তার বন্ধুত্বের গভীরতা অনুভব করলাম। সে জানত, আমি প্রথমবার ই-মার্টে গেলে কী কী নিয়ে সংকোচ করতে পারি। তাই সে তার উপস্থিতি ছাড়াই আমাকে সাহস যোগাতে চেয়েছিল। তার চলে যাওয়ার পরও এই ভিডিওটা আমাকে একাকীত্ব অনুভব করতে দেয় না। ই-মার্টে গিয়ে প্রথমবার কেনাকাটা করার সময় আমি মনে মনে রবার্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। তার এই ছোট কাজগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব দূরত্বে নয়, বরং যত্ন আর আন্তরিকতায় পরিমাপ হয়।

আজকাল মাথায় অডিওবুক ঢুকে থাকে সব সময়। তবে এটাকে খারাপ লাগছে না, বেশ ভালো অনুভব করছি। নিজেকে শিক্ষা দীক্ষায় ভীষণভাবে সমৃদ্ধ করতে ইচ্ছে করে। বই পড়ে মনে অসম্ভব আনন্দ পাওয়া যায়, বই শুনেও। ইউটিউবে অডিওবুক খুঁজতে গিয়ে পেলাম স্টয়িসিজম নিয়ে একটি অডিওবুক। মনে হলো এটা শুনে দেখা যাক। শুনছি, বেশ ভালো লাগছে। আগামীকাল সকাল ৭ টায় একটা সেমিনারে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি ঘুমালে সকালবেলা উঠলেও সারাদিন নিজেকে সতেজ মনে হবে। কম ঘুমালেও শরীরকে ঠিকই সকালে ঘুম থেকে তুলে কাজে লাগানো যায়, শরীর ঠিকঠাক কাজও করে। কিন্তু মনটা ভীষণ দুষ্টু। বারবার শরীরকে মনে করিয়ে দেয় তার ঘুমের ঘাটতির কথা।

ভোর ৬:৩০ এ ঘুম থেকে উঠেছি। প্রায় এক মাস স্কুল বন্ধ ছিলো। আমার স্কুলের নাম কেডিআই স্কুল অব পাবলিক পলিসি এন্ড ম্যানেজমেন্ট, সংক্ষেপে কেডিআইএস বলে থাকি আমরা। আজও স্কুল বন্ধ। কোইকা-র স্কলারশিপ নিয়ে কোরিয়ায় পড়তে এসেছি। কোইকা একটা বিশেষ প্রোগ্রামের আয়োজন করেছে, যার নাম হলো প্রজেক্ট কনসেপ্ট পেপার। ৭:১০ এ বাস থাকবে ডরমিটরির সামনে, সকল কোইকা বৃত্তি প্রাপ্তদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রথমে কোইকা হেডকোয়ার্টার্সে যাবো। ওখানে প্রজেক্ট কনসেপ্ট পেপার নিয়ে লেকচার শোনার পর আরও প্রোগ্রাম থাকবে। ৭:১০ বেজে গেছে। আমি সময়মতো বাসে পৌঁছে গেলাম। এখানে ৭:১০ মানে ৭:১০-ই, এক মিনিটও কম বেশি করা চলবে না। বাসে উঠতেই আমাদের গাইড আমাকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে উপস্থিতি লিস্টে স্বাক্ষর করতে বললেন। চমৎকার একটি বাস। অনেক জায়গা প্রতিটি সীটে। ভীষণ আরামদায়ক। আমি সবার পরে বাসে উঠেও আমার পছন্দমতো একটি সীট পেয়ে গেলাম। বাসের ঠিক মাঝামাঝি। বিশাল গ্লাসের জানালা। বাইরে দেখতে দারুণ লাগছে। কিন্তু ঘুম পাচ্ছে ভীষণ আবার বাইরে তাকিয়ে থাকতেও ইচ্ছে করছে। ঘুম ঘুম চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেড় ঘণ্টা কেটে গেলো।

হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।

(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়