প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩
তৃতীয় ভাষা শেখানোর চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, আনন্দময় ও বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে যেখানে স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসির মতো কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বিদেশি ভাষাও শেখার সুযোগ পাবেন। এমতাবস্থায় প্রশ্ন আসে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখা জরুরি কি না। এমন প্রশ্নে ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করে শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখা জরুরি। দেশের শিক্ষাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকমের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ১৪ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় শিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে তাদের শ্রেণি উপযোগী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইংরেজির অবস্থা কি? সেটি নিয়ে কথা হয়নি। শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তবজীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির দাবি করা হলেও এখনো প্রায় ১০ লাখ শিশু প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে শিশুর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ লাখ। প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশু এবং দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর সঙ্গে আরেকটি সমস্যা যেটি শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘অভিভাবকরা চান জিপিএ-৫ কিন্তু শিক্ষার্থীরা কিছু শিখলো কি না, সেটি দেখতে চান না।’ জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার কারণে মূল শিখণফল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা মনে করি, এখানে রাষ্ট্রকে যা করতে হবে, শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ পেলেই যেন সবাই কোন ধরনের সন্দেহ ছাড়া বুঝতে পারে যে, ওই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ে এবং শ্রেণি উপযোগী দক্ষতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি নিয়ে সমালোচনা, অভিভাবকদের দোষ দেওয়া আর এসব চিন্তা না করে নতুন নতুন কথা বলা আর প্রজেক্ট চালু করলে এ ঘটনাই ঘটতে থাকবে। জিপিএ-৫ পেলে যেন উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বুঝতে পারে যে, তাদের আর পরীক্ষা নেওয়ার দরকার নেই। সরকারকে এসব জায়গায় গীভরভাবে কাজ করতে হবে এবং এটি সবচেয়ে বড় কাজগুলোর মধ্যো একটি। এসব দিকে চিন্তা না দিয়ে অন্যসব আশার কথা বলা হলে আমাদের মনে সন্দেহ তো জাগবেই কারণ, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো ভয় পাবেই!আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার কোনো সুরাহা করতে পারিনি। এর ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং তারও পূর্বে ব্রিটিশ শাসনের সময়ও ইংরেজির সঙ্গে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরিচিত ছিল। তারপরেও আমরা কিন্তু পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ থেকে ইংরেজি ব্যবহারে এবং আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় এখনো অনেক পিছিয়ে। এর কারণ অনেক! কারা ইংরেজি পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন, কেন পড়াবেন, শিক্ষার্থীরা কোন গ্রেডে পাস করলে ইংরেজিতে কি কি অর্জন করবে, কারিকুলামে লেখা থাকলেও শিক্ষার্থীরা কেন তার ধারে কাছেও যাচ্ছে না সেটির অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা দুটিই ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে আছে। অথচ এ দুটি লেভেলেই ইংরেজি শিক্ষার ভীত গড়ার সময় যেটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকারি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখি বিশাল বিশাল প্রজেক্ট, অর্থ খরচের প্লাবন কিন্তু বাস্তবে ‘যেই লাউ সেই কদু’।
ইংরেজি ভাষা শেখানো চলে গেছে বহুধা বিভক্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বেকার ও অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিদের কাছে। তারা যে যেভাবে বুঝছেন এবং পারছেন, সে সেভাবে ইংরেজি পড়িয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন উচ্চারণ শিখতে হবে, কেউ বলছেন প্রিপজিশনের লিখিত বই পৃথিবীর সেরা আর বাকিরা গ্রামার কীভাবে আয়ত্ত করা যায়, সহজে মনে রাখা যায় ইত্যাদি বই ও আলোচনা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সরব। কেউ আবার কিছু রেয়ার ট্রান্সলেশন দিয়ে বই বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন টাকা। আর শিক্ষার্থীরা পুরো ১২ বছরে ইংরেজিকে একদিকে গুরুত্ব দেয়নি, দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদেরও ধারণা নেই যে, কীভাবে তাদের ইংরেজি শোনা, বলা, পড়া ও লেখা উন্নত করতে হবে, আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতে তা নেই আর সর্বোপরি কিছু না জানলেও পরীক্ষায় বড় বড় গ্রেড প্রাপ্তি ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের জন্য ইংরেজি ব্যবহার করার বিষয়টি গড়ে ওঠেনি। তাই বাস্তবজীবনে এসে বাজারে যে যেভাবে বলছেন, তারা সেগুলোর পেছনে ছুটছে। এমতাবস্থায় সরকার বৈশ্বিক চাহিদার কথা চিন্তা করে তৃতীয় আর একটি ভাষা শেখানোর কথা বলছে। সরকার যখন বলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে নতুন একটি ভাষা সংযোজন করা হবে তখন ভয় হয় সেই ব্যবসা আবার কীভাবে চলবে? বিদেশি ভাষা বলতে এখন আরবি, চাইনিজ (মান্দরিন) আর জাপানিজ, ফ্রেন্স ভাষাই বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে সরকার সেটি কীভাবে করবে বা করার চিন্তা করছে? প্রশ্ন করা হলে বলা হবে এ নিয়ে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা আছে কিন্তু সেই ব্যাপক পরিকল্পনা কি, তা আমরা কখনো জানতে পারব না, একসময় দেখব বিশাল এক প্রজেক্ট হাজির করা হবে; কিন্তু তাতে ভাষা শেখার যে কিছুই হয় না, সেটি আর দ্বিতীয়বার দেখার বা প্রশ্ন করার অবকাশ আর কারও থাকে না। গ্লোবাল ভিলেজে বাস করে সরকার যে বিষয়টি বুঝতে পেরেছে এবং ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছে এবং অনুভব করছে, এটির জন্য ধন্যবাদ; কিন্তু সরকার যদি স্কুল-কলেজে ভাষা শেখানোর দায়িত্ব নেয়, তাহলে সেটি ধরে রাখতে হবে সেটি ইংরেজির চেয়েও বহুগুণে বেশি করুণ অবস্থায় পতিত হবে কারণ সরকারের সেই সক্ষমতা নেই, সঠিক স্ট্র্যাটেজি নেই। সরকার করতে গেলে যেটি হবে, জনগণের অজস্র টাকা নষ্ট হবে, ভাষা শিক্ষার ভ-ও হবে না।
সরকার যেটি করতে পারে, গ্র্যাজুয়েশনের সঙ্গে কিংবা গ্র্যাজুয়েশনের পরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেখানে বেসরকারি গুরুত্ব ও প্রাধান্য থাকবে চূড়ায়, সরকারকে মনে রাখতে হবে, যাতে কাজে বাধা না আসে, বিভিন্ন ভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা। যদি বেসরকারিতে হয়, তাহলে প্রতিযোগিতা থাকবে। মানুষ শিখবে; কিন্তু স্কুল-কলেজে এগুলো খোলা মানে কোনো কিছুই হবে না। এখন না শিখছে বিজ্ঞান, না শিখছে সমাজবিজ্ঞান, না গণিত, না কলা না কোনো ভাষা। ইংরেজি শেখানোর জন্য কয়েক লাখ শিক্ষক আছেন কিন্তু শিক্ষার্থীরা ভাষা শিখছে না। ভাষা শেখার জন্য তাদের ব্যক্তি পর্যায়ে কোচিং সেন্টারে যেতে হয় যদিও সবাই ১২ বছর বাধ্যতামূলক ইংরেজি পড়ে এসেছে। একইভাবে, মাদরাসা থেকে যারা পাস করে তারা না ইংরেজি, না বাংলা না আরবি শিখছে। মাদরাসা থেকে যারা পাস করে তারা যদি আরবি শিখতে পারত, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের বড় একটি মার্কেট আমাদের দখলে থাকত। একইভাবে, সাধারণ স্কুল কলেজ থেকে পাস করার পর যদি শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিখত, তাহলে অনেক দেশের অনেক মার্কেট আমাদের হাতে থাকত এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন একটা ভালো পর্যায়ে থাকত। এখন যেটি হচ্ছে অদক্ষ শ্রমিকরা বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছে কিন্তু তাদের যদি আন্তর্জাতিক একটি ভাষিক দক্ষতা থাকত, তাহলে তাদের উপার্জন অনেক বেশি হতো, দেশ আরও বেশি মুদ্রা অর্জন করতে পারত। সেটি কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে, কাজে কবে দেখতে পাব, সেটি একটি প্রশ্ন।
আমরা তো ইংরেজি ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যই বুঝতে পারছি না, আর তাই ইংরেজি শেখাচ্ছিও না। সেটিকে পড়ানো হচ্ছে অন্যান্য বিষয়ের মতো। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চেষ্টা করা হলে বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা না শিখবে শিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো যেমন বিজ্ঞান, গণিত, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি, না শিখবে কোনো ভাষা।ভাষা শেখাতো দূরের কথা, দশ-বারো বছর সময় নষ্ট করে কেউ কেউ দু-একটি অক্ষর আর শব্দ হয়তো শিখবে, ইংরেজির যে অবস্থা ইংরেজির এত বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও, এটি পঁচাত্তর থেকে আশি বছর পর্যন্ত চলছে আমাদের দেশে, তারও আগে ব্রিটিশ আমলেও ইংরেজির সঙ্গে এদেশের মানুষের পরিচয় ছিল তারপর ইংরেজির কিছু নিয়ম শিখছে, যারা বহু বছর এ ভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর বাকিরা অক্ষর আর কিছূ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এর ব্যবহার কেউ অন্তত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইংরেজি পড়ানো থেকে শেখেনি। যারা শিখছেন তারা শিখছেন বেসরকারি কোনো ব্যবস্থায় কিংবা নিজ উদ্যোগে। তৃতীয় ভাষা যার প্রয়োগ, পরিচিতি কিংবা চারপাশে কেউ নেই, এমতাবস্থায় তারা এতটুকুও শিখবে কি না দেখার অপেক্ষায় রইলাম। মাছুম বিল্লাহ : ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক।








