বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫১

বাংলা নাটকের গতিতত্ত্ব ও ক্রমবিকাশ

জাহাঙ্গীর হোসেন
বাংলা নাটকের গতিতত্ত্ব ও ক্রমবিকাশ

নাটক নিয়ে হরহামেশা অনেক ধরনের স্তূতি কিংবা কটু শব্দ আমরা শুনে থাকি। মানুষের আচরণ স্বাভাবিকত্ব থেকে একটু ছিটকে পড়লেই কাউকে আমরা মুখের ওপর বলে থাকি--এতো নাটক কইরো না, নাটক কম করো পিও, কিংবা নাটক রাখো। আর নাটকীয়তা একটু বিস্তৃত হলেই তখন সেটি ‘সিনেমা’ শব্দের গতিমুখে যায়। মুখের ওপর সপাটে বলে থাকি আর সিনেমা কইরো না, কাহিনী কইরো না, কতই না সিনেমা দেখেছি ইত্যাদি।

আসলে ‘নাটক’ একধরনের প্রতিচ্ছবি, অনুকরণ, স্মৃতিপট এবং বিস্মৃতিকে মূর্তমান করে দেয়া। কিছুটা ভিন্নতা আছে বলেই এতে আকর্ষণ আছে। তাইতো নাটক এক ধরনের প্রভাব বলয় তৈরি করে।

এক পলকে চোখ ধাঁধালেই দেখতে পাই কতগুলো বাস্তবতার অনুষঙ্গ। স্থানিক প্রভাবকে উপলক্ষ করে আমরা দেখতে পাবো যে, এক এলাকার লোক নতুন কোনো এলাকায় কিছু দিন অবস্থান করলে আচরণিক প্রভাব দৃশ্যমান হয়। যেমন তাদের ভাষা এবং আচরণে ধীরে ধীরে প্রভাব পড়ে। যেমন, ঢাকা বা বরিশালে অন্য কোনো এলাকার লোক দীর্ঘদিন অবস্থান করলে ভাষাগত মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তেমন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি আচরণিক বৈশিষ্ট্যেও পরিবর্তন আসে। ফলে এটি একটি শিল্পরূপে চলে যায়। আমরা বাসে-ট্রেনে লক্ষ্য করলে দেখি, একদল ভিক্ষুককে সমস্বরে গানের মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তি করতে। মানুষকে আকর্ষণ করতে-তারা এক ধরনের পালাগান করে থাকে। আমরা দেখি কৃষাণ-কৃষাণিরা ধান ভানতে বা ফসলকে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে কত ধরনের গান গেয়ে থাকতে। অর্থাৎ এ ভিন্নতাই একধরনের নাটকীয়তা। এতে ছন্দ আছে বলেই বৌদ্ধিকমহল নাটককে ‘দৃশ্যকাব্য’ বলে অভিহিত করছেন।

নাট্যাচার্য ভরত নাটককে ‘রূপক’ আখ্যা দিয়েছেন। অভিনয়শৈলীর কারণেই তিনি ‘রূপক’ অর্থে অভিহিত করেন। কিন্তু নাটককে আরও বাস্তব করতে কতগুলো আলঙ্করিক দিকের সমাবেশ ঘটাতে হয়। এরপর প্রয়োগের বিষয়টি থাকে। নাটকের মূল উপকরণসমূহ হলো : সংলাপ-কথোপকথন-মঞ্চ নির্দেশনা। আর নাটককে সজ্জিত করে আনতে প্রয়োজন প্রেক্ষাপট নির্মাণ, চরিত্রায়ন, অভিনয়শিল্পী, আবহসঙ্গীত, মঞ্চসজ্জা, রূপসজ্জা প্রভৃতি।

নাটকের আবির্ভাবের সময় ও স্থান বিশেষে বিভিন্ন মত-পার্থক্য হয়তো আছে। তবে এ নিয়ে মিস জেন হ্যারিসন বলেন, “In all probability dramtic art has always gone to through the stage of ritual.” অর্থাৎ “ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির ক্রমবিবর্তনে কালক্রমে নাট্যশিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।”

সময়ের বিবর্তন মাথায় রেখে নাট্যদার্শনিক, এলারডাইস নিকলের মতে, খ্রিস্টিয় জন্মের হাজার হাজার বছর আগে ‘এইস্কিলাসের’ নাটকের অভিনয় হতো।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মিশরে দেবতার উদ্দেশ্যে নাট্যাভিনয়ের প্রচলন শুরু বলে অনেকের ধারণা। আর অতিপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নাটকের প্রচলন হয়ে থাকে। ইতিহাসের ধারাক্রমে প্রতীয়মান হয় যে, যর্জুবেদ, মহাভারত, পাণিনির ব্যাকরণ, পতঞ্জলির মহাভাষ্য প্রভৃতি।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মানুভূতির ওপর নির্ভর করে নাটক নির্মিত হয়েছে, তেমনি প্রাচীন ভারতেও। নাট্যশাস্ত্র প্রণেতা ভরত নাটককে ‘পঞ্চমবেদ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

খ্রিস্টপূর্বের দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যে ভরত-এর ‘নাট্যশাস্ত্র’ রচনা হয়ে থাকে। সময়ের বিবর্তনে মানুষের চরিত্রও নির্মাণ হয়। এ প্রসঙ্গে নাট্যতত্ত্ববিদ এগরির মতে, “Every human being is in a state of constant fluctuation and change.Nothing is static in nature,least of all man..”

অর্থাৎ “অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার দাস মানুষেরও পরিবর্তন ঘটে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অবিরাম এক পরিবর্তন প্রবাহ চলছে। প্রকৃতিতে কোনো কিছুই স্থাণু নয়, মানুষতো নয়ই।”

এ কথা প্রসঙ্গে বলা যায়, নাটকের ঐতিহাসিক ধারাক্রমের গতিশীলতা। ধর্মানুভূতির বিচারে নাটকের প্রাথমিক কাল শুরু হলেও পরে আর এখানে আটকে থাকেনি। ধর্মানুষ্ঠান মঞ্চ থেকে থেকে বের হয়ে গেছে নির্মাতাগণ বহু আগেই। এবং ধর্মীয় ভাবধারাকে পুষ্ট করতে আধুনিক নাটক এখন আর দায়িত্বভার গ্রহণ করছে না। প্রাচীন ভারতে খ্রিস্টপূর্ব থেকে নাটক চলে আসলেও নাটকের প্রাক-আধুনিকতা ধরা হয় আঠারো শতক থেকে। আর বাংলা নাটক চর্চার সূত্রপাত ধরা হচ্ছে ১৮৫৭ সাল থেকে। অর্থাৎ রাম নারায়ণ তর্করত্নের ‘কলীন-কুল-সর্বস্ব’ নাটকের মধ্য দিয়ে। নাটককে আরও জীবন্ত করে তুলতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ শক্তিমান নাট্যকারগণ পাশ্চাত্য নাটক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

প্রাচীন বাংলায় মনসা লৌকিক দেবদেবীর ভিত্তিতেও সাহিত্য রচিত হয়। পাল-সেন আমল এবং মুসলিম আমলে মনসা পূজার ব্যাপকতার সম্বন্ধে সন্ধান পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মঙ্গলকাব্য মনসা-পূজার বিস্তৃত হয়েছে এ সময়। কৌম সমাজে প্রচলিত ছিল প্রজনন শক্তির পূজা।এরপর সর্পদেবীর মনসার পূজার সূচনা হয়। মনসাপূজা ও মনসামঙ্গল কাব্য নিয়ে অমরসৃষ্টি মনসামঙ্গল নাটক ও পালাগান।

নাটককে অনানুষ্ঠানিক থেকে আনুষ্ঠানিক এরপর গুরুত্বের বিচারে একাডেমিকভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আশির দশকের আগ থেকে নাট্যকলাকে একাডেমিক পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে আমেরিকা-ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়-তৃতীয় দশক থেকে নাট্যবিদ্যা ফলিত-কলাবিদ্যার স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে নাট্যতত্ত্বের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স পড়ানো হচ্ছে। এখানে কেবলমাত্র মঞ্চ নাটককেই প্রাধান্য দেয়া হয়নি, চিত্র নাটককেও প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। উপমহাদেশে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে নাট্যবিদ্যার ওপরে ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়নি। তবে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কোর্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এখন বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্বের ওপর গ্রাজ্যুয়েট-পোস্ট গ্রাজ্যুয়েট বিভাগ খোলা হয়েছে।

অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব রয়েছে, রয়েছে হিংসা, দ্বেষ। কখনও দ্বন্দ্ব মিলনার্থক, কখনও বিরোধার্থক। দ্বন্দ্বের প্রবহমান গতিই নাটকীয়তা। কখনও কখনও বাস্তবতা বিবর্জিতও ঠেকে। এর দৃশ্যায়ন যখন সুনিপুণভাবে নেয়া হবে তখনই দৃশ্যগুলো কাব্যিক হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে এগরি বলেন, দ্বন্দ্বই যখন নাটকের প্রাণ, তখন দ্বন্দ্বকে সম্যক রূপ দিতে এমন চরিত্র নির্মাণ করতে হবে যে উপযুক্ত মাত্রায় দ্বন্দ্ব করতে সমর্থ।

দার্শনিক বার্নার্ড শ বলেন, “ নাটক হচ্ছে সামাজিক মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাতজনিত এমন এক জীবন সংগ্রাম, যা মূলত মানুষের ইচ্ছা শক্তির সাথে তার পরিবেশের দ্বন্দ্ব।”

এ প্রসঙ্গে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি জন হাওয়ার্ড লসনের বক্তব্যে। তিনি বলেন,

“সামাজিক মানুষের জীবন দ্বন্দ্বের রূপ হচ্ছে নাটক। তিনি নাটকীয় কাজকে চার পর্বে ভাগ করেছেন--১। Exposition (বাধার উপস্থাপনা), ২। Rising action (বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম), ৩। Clash (শক্তি পরীক্ষা), ৪। Climax (চূড়ান্ত পরিণতি)।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নাটক হচ্ছে মানুষের জীবনশৈলীর প্রতিরূপ। সমাজের প্রতিচ্ছবি নাটকের মাধ্যমে আখ্যান হিসেবে গড়ে ওঠে। নাটকে জীবনকর্ম পরিধি প্রকাশ পায়। যা কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া বলা যায়। এর ধারাবাহিকতা কাব্যের মতো ঠেকে বলেই এটাকে দৃশ্যকাব্য হিসেবে ধরা হয়।

দার্শনিক এরিস্টটল তাঁর রচিত বিখ্যাত সাহিত্যশাস্ত্র ‘ঢ়ড়বঃরপং’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নাটক যেমন প্রাচীন, তেমনি পূর্ণাঙ্গ। তিনি বলেন, “ নাটক হচ্ছে দৃশ্যকাব্য যা মানব জীবনের কর্মোদ্যোগকে রূপায়িত করে।”তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, “ নাটক হচ্ছে এক প্রকার কাব্য, যা দৃশ্য রূপে উপস্থাপিত কিংবা রচিত হয়।

নাট্যব্যক্তিত্ব মোহিত লাল মজুমদার আরেকটু অগ্রসর হয়ে বলেন- “নাটকমাত্রেই অভিনয়াত্মক এই জন্য যে, উহার কোন অংশই চিত্র নয়, ভাব নয়, স্মৃতি বা ধ্যানের বিষয় নয়; তাহাতে সৃষ্টির সেই আদি গতিধারায় জীবন মুহূর্তে মুহূর্তে ঘটনাময় হইয়া উঠিতেছে, দেশে ও কালে বিবর্তিত হইতেছে- একটা পরিণামমুখে দ্রুত ছুটিয়া চলিতেছে। এই অর্থে ইহা দৃশ্যমাত্র- অর্থাৎ প্রত্যক্ষ অনুভূতির যোগ্য।”

বাংলার নাটকে এক সময় পশ্চিমা নাটকের প্রভাব থাকতো। ফলে বাংলার নাটক জীবন্ত হয়ে উঠতো না। বাংলার মানুষের জীবনশৈলী স্পষ্ট হতো না। বাংলা নাটকে ইউরোপীয় তথা পশ্চিমা নাটকের প্রভাব বলয়ে থাকাটা ঘোর বিরোধিতা করেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তিনি বলেন, ‘আমি সরাসরি ইউরোপীয় রীতিতে লেখার অপপ্রয়াস কখনও করিনি। কাজেই ট্র্যাজেডি নাটকের সংলাপের স্থিতিস্থাপকতা আমার নাটকে অপ্রয়োজনীয়। ট্র্যাজেডি-পড়া কান দিয়ে বাংলাদেশি মনকে বোঝা যাবে না কখনও। বাংলা নাটকে ইউরোপীয় রীতির ট্র্যাজেডি করার প্রয়াস সর্বাংশে ব্যর্থ হয়েছে।’

নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন গ্রাম বাংলার মানুষের যাপিত জীবন নিয়ে নাটক রচনা করেছেন। ঘটনার বাস্তব চরিত্র নাটকে তুলে আনতে তিনি প্রয়াসী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার নাটকে নাটকই প্রাধান্য পেয়েছে, গীতলতা বা কাব্যালুতা নয়। মূলত দৈনন্দিনের গদ্যকে আমি জীবনের নিগূঢ় প্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাই। আমার সংলাপরীতিকে আমি চরিত্রের উল্লাস ও বেদেনাপ্রবাহের সঙ্গে একীভূত করতে চাই।’

ড. সেলিম আল দীন ‘চাকা’ নাটকটিতে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো, এরশাদবিরোধী স্বৈরাচার আন্দোলনে নূর হোসেনের মৃত্যুর পটভূমি। মোটকথা, তিনি বাংলাদেশের নাটককে আধুনিক ফর্মে নিয়ে আসেন।

প্রসঙ্গত, ‘সক্রেটিসের জবানবন্দী’ নাটকটি কেন্দ্রীয় চরিত্র সক্রেটিসকে নাম ভূমিকায় রেখে নাটকটি রচিত হয়েছে। কিন্তু এ নাটকে রয়েছে সক্রেটিসের সমসাময়িক সমাজের জীবন চরিতের নানা দিকসমূহ। এখানে উঠে এসেছে সমাজের অন্তরস্থ দ্বন্দ্ব-সংঘাত। এ নাটকে কেবলমাত্র দুটো চরিত্র। একজন সক্রেটিস, অপরজন মেলিটাস। মঞ্চ : বিচারকক্ষ। এ নাটক এমনই জীবনঘনিষ্ঠ যে সে সময়কার রাজপ্রাসাদের সকল অপকর্মের কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছিল। রাজা মেলিটাস কোনোভাবেই সক্রেটিসের অস্তিত্ব রাখতে চাচ্ছিলেন না। বিচারকক্ষে নায়ক সক্রেটিস বলেন, “তারা বলছে জ্ঞানী সক্রেটিস স্বর্গ-মর্ত্য পাতাল সম্পর্কে চিন্তা করে এবং সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করে। -----স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের যে চিন্তা করে সে নিশ্চয়ই স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।”

সক্রেটিসের আরেকটি সংলাপ এ দেশের মানুষের মাঝেও জীবন-ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে। শিক্ষকদেরকে এক হাত নিতে সর্বদাই প্রস্তুত কিছু লোক। সে রকম কিছু সক্রেটিসের জীবনকালেও ছিল। সংলাপে সক্রেটিস বলেন, “আমি কোনো পেশাদার শিক্ষক নই কিংবা আমি কারো নিকট থেকে এ জন্য কোনো অর্থও গ্রহণ করি নি। অপর অভিযোগও যেমন ভিত্তিহীন, এ অভিযোগও তেমনি মিথ্যা। অবশ্য এ কথা সত্য, মানুষকে শিক্ষা দেবার যদি কারো জ্ঞান এবং ক্ষমতা থাকে, তাহলে তার জন্যে অর্থ-গ্রহণ তার পক্ষে সম্মানেরই বিষয়। লিওনটিয়ামের গর্জিয়াস, সিওসের প্রডিকাস এবং এলিসের হিপিয়াসকে আপনারা জানেন। এঁরা এথেন্সনগরী বিচরণ করেন।”

সক্রেটিসের জীবনকর্ম নিয়ে ‘ফিডো’ নাটক রচিত হয় এবং মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকে চরিত্রের সংখ্যা ৭। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র সক্রেটিস। তবে নাম ভূমিকায় যাকে আনা হয়েছে তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। চরিত্রাবলি : ফিডো, সক্রেটিস, অ্যাপোলোডোরাস, সিমিয়াস, সিবিস, ক্রিটো, কারা বিচারক। ( তথ্যসূত্র : প্রাগুক্ত)। এ নাটকের ক্রিটোর একটি সংলাপ উপস্থাপন করা যেতে পারে। সেটি হচ্ছে : আমি শুধু কারাভৃত্যের একটি অনুরোধ তোমাকে জানাতে চাচ্ছিলাম। যে ভৃত্যের উপর দায়িত্ব পড়েছে তোমাকে বিষ প্রদান করার। সে বলছে, তুমি যেন অধিক পরিমাণে বাক্যালাপ না কর। কেননা তার অভিমত এই যে, বাক্যালাপ দেহে উষ্ণতার পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং এর ফলে দেহে প্রযুক্ত বিষের ক্রিয়া প্রকাশ পেতে বিলম্ব ঘটে। কারা-কর্মচারীদের অভিজ্ঞতা এরূপ যে, যারা বিষ প্রয়োগের পূর্বে উত্তেজিত হয় তাদের মৃত্যুর জন্য দুবার এমন কি তিনবারও বিষ প্রয়োগের আবশ্যক হয়।”

ক্রিটোর এ কথা শুনে সক্রেটিস জবাব দিলেন : আমাকে নিয়ে কারাভৃত্যের চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তাকে বল তার আপন কর্তব্য নিয়েই সে ব্যস্ত থাকুক। আর আমার উপরে দুবার এমনকি তিনবারও যদি বিষপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় তাহলে সেরূপ করার জন্যই যেন সে প্রস্তুত থাকে।” এ প্রসঙ্গ সম্পর্কে অধিক বলা আমি অনাবশ্যক বোধ করি।

সক্রেটিসের জীবনপ্রণালীর ওপর অপর আরেকটি নাটক-চারমিডিস। চরিত্রাবলি : সক্রেটিস, চারমিডিস, ক্রিটিয়াস, চারফেন। নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল আরকন প্রাসাদের অলিন্দের নিকটবর্তী তাউরিস কুস্তিমঞ্চে। এ নাটকের কথক চরিত্রে আনা হয়েছে সক্রেটিসকে এবং এ সংলাপের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এখনও ঢের রয়েছে। মানুষ যাপিত জীবনে অহংবোধ এবং বাগাড়ম্বরতাকেও অনেক ক্ষেত্রে প্রধান করে দেখেন। অহংবোধকে প্রধান অন্তরায় না ভেবে বাহক মনে করেন। এখানে সক্রেটিসের একটি সংলাপ জুড়ে দেয়া হলো : “তাহলে শুধু এই জ্ঞান যার আছে তার পক্ষে জ্ঞানের প্রতারককে যাচাই করা তো সম্ভব নয়। জ্ঞানের প্রতারক যে জ্ঞানের ভান করছে, তা যথার্থ কিংবা যথার্থ নয় তাকে নির্ধারণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার ‘জ্ঞানী’ শুধু এতটুকু জানবে যে, এই ব্যক্তির কোনো প্রকারের জ্ঞান রয়েছে; কিন্তু তার নিজের জ্ঞান সেই জ্ঞানের প্রকৃতি নির্ধারণে মোটেই সাহায্য করতে সক্ষম হবে না।”

নাটক কৌতূহল ও দৃষ্টিনন্দন না জাগাতে পারলে তা আকর্ষণ হয়ে ওঠে না। নাট্যকার এবং নির্দেশকের মুন্সিয়ানা না দেখাতে পারলে তা হয়ে ওঠে আড়ষ্ঠ ও নিশ্চল।আর কুশীলবকে হয়ে উঠতে হবে চরিত্র-ঘনিষ্ঠ। তাই নাটকের থিম একটা মুখ্য বিষয়। নাটকের স্পষ্ট থিম দাঁড় করাতে পারলে নাটকের বিভিন্ন প্লট বা কাহিনী নির্মাণ করতে লেখকের জন্যে সুখকর হয়। লেখার পরতে পরতে ব্যঞ্জনা বেজে ওঠে। এ সম্পর্কে উইলিয়াম আর্চার বলেন, “থিম বলতে নাটকের বিষয়বস্তু অথবা কাহিনী এই দুয়ের যে কোন একটা বোঝায়।”

ডব্লিউ টি প্রাইস-এর মতে,”যে লেখকের উদ্দেশ্য মহৎ এবং সুস্পষ্ট, বিষয়বস্তু যার মনের অনেকখানি অধিকার করে থাকে, সহজে তার লক্ষ্যচ্যুতি ঘটে না।”

সুষ্ঠু প্রতিপাদ্য স্থির করে নেওয়ার গুরুত্ব বিষয়ে নাট্যতত্ত্ববিধ লাজোস এগরি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, “ডযবহবাবৎ ধ পড়হভষরপঃ ষধমং, ৎরংবং লবৎশরষু, ংঃবঢ়ং ড়ৎ লঁসঢ়ং, ষড়ড়শ ঃড় ুড়ঁৎ ঢ়ৎবসরংব, ওং রঃ পষবধৎ পঁঃ? ওং রঃ ধপঃরাব জবসবফু ধহু ভধঁষঃ যবৎব ধহফ ঃযবহ ঃঁৎহ ঃর ুড়ঁৎ পযধৎধপঃবৎ? অর্থাৎ “যখন কোনো কাহিনীর দ্বন্দ্ব (পড়হভষরপঃ) ধীর হয়ে যায়, অসমভাবে বা হঠাৎ হঠাৎ সামনে আগায়, তখন আপনার কাহিনীর মূল ভিত্তি (ঢ়ৎবসরংব) বা যুক্তিটি খতিয়ে দেখুন; সেটি কি পরিষ্কার? দ্বন্দ্বটি কি সক্রিয়? কাহিনীর এই ত্রুটিগুলো সংশোধন করুন এবং তারপর আপনার চরিত্রের ওপর মনোযোগ দিন।”

নাটকের কাহিনী বা ঘটনা বিন্যাসের উপর নাটকের অগ্রসরতা নির্ভর করা না করা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও নাট্যবোদ্ধারা দিয়েছেন। এতে সমালোচক উইলিয়াম আচার বলেন,”নাটকে বৃত্ত বা ঘটনা-বিশ্বাস চরিত্রদের চালিত করে সেই নাটক মৃত; আর যে নাটকে চরিত্রবল বৃত্তকে নিয়ন্ত্রিত করে সেই নাটক জীবন্ত। বলাবাহুল্য, ঘটনা ও চরিত্রকে বিশ্লিষ্ট করে দেখার ফলেই আর্চারের মুখ থেকে এই সব কথা বেরিয়েছে।” অপরদিকে ডব্লু টি প্রাইস লিখেছেন,” কার্যসিদ্ধ করার জন্যই চরিত্রের প্রয়োজন-চরিত্র কার্যাধীন। ব্যক্তিসম্পর্কের ক্ষেত্রে না দাঁড় করিয়ে অন্য কোন উপায়ে চরিত্রবৈশিষ্ট্য দেখানো সম্ভব নয়।

যাই হোক সময়ের বাঁকে বাঁকে মঞ্চ নাটক অকাঠামো থেকে কাঠামোবদ্ধ হয়েছে, শৃঙ্খলায় এসেছে। এখন মঞ্চ নাটক ব্যতিরেকে চিত্র নাটকে ঝোঁক বেশি। যাই হোক, নাটককে প্রাণময় করতে গড়ে উঠেছে একাডেমিক পাঠক্রম। নাটককে বিস্তৃত করতে এর বিশ্বায়নের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। অনানুষ্ঠানিক থেকে আনুষ্ঠানিক হয়েছে, নিয়মাবদ্ধ হয়েছে। থিয়েটারকে আরও জীবন্ত করতে একদল নিবেদিত মানুষ নিবেদন করছেন তাদের মূল্যবান সময়, মেধা। তাতে হচ্ছে নাটকের প্রাণ সঞ্চরণ।

তথ্যসূত্র :

১। নাটক লেখার মূল সূত্র-ড. সাধন কুমার ভট্টাচার্য;

২। প্লেটোর সংলাপ, সরদার ফজলুল করিম;

৩।। সাহিত্য তত্ত্ব-কথা, আবুল ফজল ও রেজাউল ইসলাম;

৪। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড;

৫। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন : দেশকে নিয়ে গেছেন যিনি অনন্য উচ্চতায়, ইমরান ইমন।

লেখক পরিচিতি: প্রাবন্ধিক ও মার্কসবাদী গবেষক; সভাপতি : চাঁদপুর লেখক পরিষদ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়