প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫০
সুরের শৃঙ্খলা যাঁর জীবনের বেদ

সুরের মায়ায় যে বাঁধা পড়ে পার্থিব বিত্তের মোহ তাকে অন্ধ করতে পারে না। সুর হলো ঈশ্বরের ভাষা। এ ভাষা যার রপ্ত হয়েছে পূর্ণাঙ্গরূপে সে-ই হলো জগতে অন্তর্চক্ষুষ্মান। অন্তর্চক্ষুর বদৌলতে সুরের সাধক প্রজ্ঞার বাহনে চড়ে জীবন-বেদের ভাষা বুঝে নেন। সুরের সাধনায় লীন হয়ে যিনি জীবনকে গেঁথে নিয়েছেন সরগমে, তিনি আমাদের অতি প্রিয়, সর্বজনশ্রদ্ধেয় সংগীত গুরু প্রয়াত স্বপন সেনগুপ্ত। ইন্দ্রমোহে মুগ্ধ হয়ে তিনি বৈকুণ্ঠে যাত্রা করলেও তাঁর সুরের অনুরণন আজও চাঁদপুরের পথে-প্রান্তরে, মিত্রজনের হৃদয়ের স্পন্দনে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি যতটুকু না শিল্পী তার অধিক হলেন কারিগর। তিনি হলেন সুরের বিশ্বকর্মা। সুরের ছাঁচে গড়ে দিয়েছেন অগণিত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। তাঁর স্নেহের ফল্গুধারার কাছে আমার অনেক ঋণ আছে। সে ঋণের আশিসে সিক্ত আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই তাঁর স্মিতহাস্য মুখ, কানে বাজে তাঁর মর্মজয়ী মধুভাষ। চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক জগতে তিনি বাতাসের মতো; মিশে আছেন সবখানে কিন্তু বোধ্যতার ঊর্ধ্বে। যখন আলোড়ন হয় তখনই কেবল অনুধাবন হয়, যখন প্রবহমান থাকে তখনই উপলব্ধি হয়।
প্রয়াত সংগীত গুরু স্বপন সেনগুপ্ত চুয়াত্তর বছর বয়সে প্রয়াত হলেও দীর্ঘ তিপ্পান্ন বছর ধরে তিনি ছিলেন চাঁদপুরের প্রাচীন ও স্বনামধন্য সংস্কৃতি শিক্ষা কেন্দ্র সংগীত নিকেতনের অধ্যক্ষ। তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর শ্যামল সেনগুপ্তের হাতে সংগীত নিকেতনের জন্ম হলেও ঊনিশশো বাহাত্তর সাল থেকেই স্বপনদা হাল ধরেন এ প্রতিষ্ঠানের। তাঁর অগণিত শিক্ষার্থীর কণ্ঠে স্বপনদার শিক্ষা ঝলকিত হবে, মূর্ছনায় মন্দ্রিত হবে ভাবীকালের জলসায়। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহতের অধিষ্ঠান তা কেবল স্বপনদাকে দেখলেই আমার মনে হতো। ক্ষুদ্রাকৃতির মানব অবয়বে বৃহদাকৃতির দেবপ্রতিম ব্যক্তিসত্তার উন্মেষ ও বিকাশ আমাকে চমকিত করে তুলেছিলো। দৈহিক আকৃতির তুলনার কণ্ঠের বজ্রতা ছিলো তাঁর সমীহ জাগানিয়া ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। তাঁর আচরণে ও কণ্ঠ প্রক্ষেপণে ছিলো সচেতন সৌন্দর্য। ফলে অনুজের শ্রদ্ধা আর অগ্রজের স্নেহ, বন্ধুর মৈত্রী আর শুভাকাঙ্ক্ষীর কল্যাণাকাঙ্ক্ষা সবসময় তাঁকে ঘিরে ছিলো। তিনি যে কেবল সংগীতেই মগ্ন ছিলেন তা নয়। তাঁর তীক্ষ্ণ রসবোধ আমাদের উৎকর্ণ রাখতো সব সময়। এই বুঝি তাঁর ধারালো মন্তব্যে রসের ধারা উপচে পড়লো!
দুহাজার বারো সালেই বলতে গেলে আমি স্বপনদার প্রাণের কাছে পৌঁছি এবং মরমে ঢুকে যাই। মে মাসে নজরুল জয়ন্তীর সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে নজরুল’ এ বিষয়ে বলবার জন্যে আমি আমন্ত্রিত হই। আমার এ আমন্ত্রণের পেছনে অবদান হলো প্রয়াত সাংবাদিক ও অনেকের গুরু মাকসুদ আলম ভাইয়ের। নজরুল জয়ন্তী উদযাপনের সভায় জেলা প্রশাসনের আহ্বানে তিনি আলোচক হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জনাব মতিউল ইসলাম আমাকে ফোন করে আমন্ত্রণ জানান। তাঁর অনুরোধ ছিলো আমি যেন বাংলাদেশে নজরুল বিষয়ে আমার আলোচনা উপস্থাপন করি। আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনার জন্যে ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষ স্বপন সেনগুপ্তের নেতৃত্বে সংগীত নিকেতনের শিল্পীবৃন্দ। দাদা মিলনায়তনের ভেতর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শ্রবণ করলেন। এরপরদিন তিনি আমাকে দেখা হলে পথে দাঁড় করিয়ে প্রায় আধঘন্টা স্নেহ ও আশীর্বাদে সিক্ত করলেন। অতঃপর তাঁর মনোভূমে আমার যাত্রা হলো শুরু। একটু সুযোগ হলেই সংগীত নিকেতনের যে কোনো অনুষ্ঠানে দাদা আমাকে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাঁর সেই স্নেহের আহ্বানে আমি গিয়েছি অনেকবার। চন্দ্রকান্ত সাহা মিলনায়তন হবার পর তাঁর সাংগীতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীলতা অর্জন করে। আমি সেই গতিপথে এক গ্রাহাণুর মতো তাঁর সৌরজগতে ঢুকে যাই নিয়তির নির্মল বাঁধনে।
অনেক সদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল হিসেবে দাদা শুরু করলেন সংগীত নিকেতনের মাসিক আয়োজন ‘সুরসভা’। শিল্পীদের প্রকাশ ও বিকাশের জন্যে, প্রচার ও প্রসারের জন্যে এ ছিলো তাঁর অনন্য পরিকল্পনা। এতে শিল্পী ব্যক্তিগতভাবে যেমন মূল্যায়িত হতেন তেমনি সাংগীতিক সংগঠনগুলোও মূল্যায়নের আওতায় চলে আসতো। এক একজন শিল্পী একাধারে পাঁচ-সাতটা গান পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বোদ্ধা শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে নিজেকে নিবেদন করতেন। এতে শিল্পের উপযুক্ত কদর যেমন হতো তেমনি সাংস্কৃতিক রেনেসাঁসের যাত্রায় সময়কেও এগিয়ে নেওয়া হতো। তাঁর ‘সুরসভা’ শিল্পীকে উৎসাহ দেওয়া ও শিল্পের জন্যে এক আলাদা মঞ্চ সৃষ্টিতে অগ্রগামী ছিলো। সাংগীতিক আয়োজনে কারও অমনোযোগ দেখলে কিংবা কারও অনুষ্ঠান চলাকালে মুঠোফোনে ব্যস্ত হয়ে ওঠাকে তিনি অপছন্দ করতেন তীব্রভাবে। তিনি জানতেন, এতে শিল্পের অমর্যাদা হয় তীব্রভাবে। তাঁর ভয়ে অনেকেই তাই সচেষ্ট থাকতেন যাতে সংগীত শ্রবণে পুরো অস্তিত্বই নিমগ্ন হয়।
আমার পুরো পরিবার তাঁর স্নেহের চাদরে মোড়ানো ছিলো। আমার পত্নীকে তিনি বোনের মর্যাদায় স্নেহ করতেন। এ কারণে তার সংগঠন ‘পদক্ষেপ বাংলাদেশ’-এর চাঁদপুর শাখায় তিনি উপদেষ্টা হিসেবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাঁর সবক’টা অনুষ্ঠানে স্বপনদা এসেছেন সশরীরে। এমনকি কখনও সূচনা সংগীতেও অংশ নিয়েছেন। আমার ছোটো ছেলে প্রখরের নাম শুনে তিনি গুন গুন করে গেয়ে উঠলেন, ‘প্রখর তপন তাপে/ আকাশ তৃষায় কাঁপে/ বায়ু করে হাহাকার।’ দাদার নেতৃত্বে সংগীত নিকেতনের বষর্বরণের ভোরে শুরু হতো নান্দনিক অনুষ্ঠান। এ কেবল নিছক অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিলো না, এ ছিলো নিবিড় মগ্নতায় শিল্পের নিবেদন, যাতে বাঙালির শেকড়ের সংস্কৃতি অম্লান থাকে, অনন্য হয়ে ওঠে প্রজন্মের হৃদয়-সরসী নীরে।
চাঁদপুরে যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতিযোগিতায় নিরপেক্ষ বিচারক পাওয়া কঠিন। এটা এমন নয় যে, যারা বিচারক তারা পক্ষপাত দেখান। মূলত সকল সংগীতজ্ঞই কোনো না কোনো প্রতিযোগীর শিক্ষক বা গুরু। ফলে কেউ প্রথম হলে আর কেউ তাতে পক্ষপাতের সংশয় তোলে। এতে অভিভাবকের আস্থা যেমন মেলে না তেমনি প্রতিযোগীদের মনেও নির্মলতা তৈরি হয় না। কিন্তু কয়েকজন বিচারকের কথা উঠলে তাতে কারও সংশয় থাকে না। এক্ষেত্রে স্বপনদার নাম অগ্রগামী। তিনি সর্বজনের কাছে নিরপেক্ষতায় ও যোগ্যতায় শতভাগ গ্রহণযোগ্য ছিলেন। বরং তাঁর হাতে কেউ প্রথম বা দ্বিতীয় হলে সে যেন অতিরিক্ত একটা সনদের অধিকারী হতো। এই আত্মতৃপ্তি শিল্পীরা পেতো স্বপনদার মূল্যায়নে।
দুহাজার বাইশে করোনার মাঝপথে আমার বাসা বদল করে লেডি দেহলভী স্কুলের সামনে আসি। প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার এলেই দাদার সাথে দেখা হতো। দাদা আসতেন লেডি দেহলভী স্কুলে সংগীত নিকেতনের সাপ্তাহিক ক্লাসে। আর আমি বের হতাম নিত্যকৃত্যে। চলাচলের পথে দেখা হলেই দাদা পরম স্নেহে কথা বলতেন। তাঁর সে বলায় ঝরে পড়তো অনাবিল ভালোবাসা।
মানুষ হিসেবে স্বপনদা সভ্য সমাজে অগ্রগণ্য এক সত্তা। তাঁর আচরণিক কোনো ত্রুটি কেউ খুঁজে পায়নি। যথা নম্রতায়, যথা হৃদ্যতায় তাঁর জীবনকে যাপনের নৈমিত্তিকতা ছিলো চোখে পড়ার মতো। তাঁর বৈকুণ্ঠে গমন আমাদের স্নেহ বঞ্চিত করলেও তিনি আছেন আমাদের হৃদয় মন্দিরের প্রণম্য ব্যক্তি হয়ে। তিনি নিজে যেমন কোনোদিন বেপথু হননি তাঁর সাধনায়, তেমনি কেউ বেসুরো গাইলে তাকেও শাসন করতে ভোলেননি। তিনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন এমন এক গুরু যাঁর কাছে সুরের শৃঙ্খলাই ছিলো জীবনের বেদ। পরপারে দাদা চির শান্তিময় হোন। চাঁদপুরকে তাঁর নামে জ্যোতির্ময়ী করে তিনি জ্বলজ্বলে থাকুন সকল সাংগীতিক উৎসবে।







