প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১
শিশুর পারিবারিক শিক্ষা ও শিক্ষকের মেন্টরিং

মানুষের “জীবন গড়ার কারিগর” হিসেবে একজন শিক্ষক শিশুর জীবনে মেন্টর হিসেবে কাজ করে। তবে পারিবারিক শিক্ষার ভিত যদি মজবুত না হয়, তবে একজন শিক্ষকের জন্য কাজটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। পারিবারিক শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক একটি শিশুর ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা দান করেন। পরিবার শিশুকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে শিক্ষা দেয়, কিন্তু শিক্ষক শিশুকে বাইরের পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি শিশুর চিন্তার জগতকে বড় করতে সাহায্য করেন। প্রতিটি শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো বিশেষ গুণ থাকে। একজন দক্ষ শিক্ষক সেই প্রতিভাটি চিনতে পারেন এবং তাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যান। স্কুলে সমবয়সীদের সাথে কীভাবে মেলামেশা করতে হয়, শৃঙ্খলা মেনে চলা এবং দলগতভাবে কাজ করার শিক্ষা শিক্ষকই দিয়ে থাকেন।পরিবারে অনেক সময় অন্ধ স্নেহের কারণে শিশুর ভুলগুলো ঢাকা পড়ে যায়। শিক্ষক নিরপেক্ষভাবে সেই ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে তাকে সঠিক পথে আনেন। কেননা সব শিশুর শেখায় সক্ষমতা একরকম নয়, একই পরিবার থেকে সকল শিশু আসেনা। একজন আদর্শ শিক্ষকের কাজ শুধু তথ্য পেঁৗছে দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর ভেতরে জানার আগ্রহ জাগিয়ে তোলা। আমেরিকান লেখক উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ডের একটি কালজয়ী উক্তি শিক্ষকতার ‘সার’ ধারণ করে “ঞযব সবফরড়পৎব ঃবধপযবৎ ঃবষষং. ঞযব মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ বীঢ়ষধরহং. ঞযব ংঁঢ়বৎরড়ৎ ঃবধপযবৎ ফবসড়হংঃৎধঃবং. ঞযব মৎবধঃ ঃবধপযবৎ রহংঢ়রৎবং.”যা প্রমিত বাংলায় “একজন সাধারণ শিক্ষক কেবল ‘বলেন’, একজন ভালো শিক্ষক ‘ব্যাখ্যা’ করেন, একজন উন্নত মানের শিক্ষক ‘হাতে-কলমে প্রদর্শন’ করেন, আর একজন মহান শিক্ষক ‘অনুপ্রাণিত’ করেন।”এই উক্তিটি কেবল শব্দের পার্থক্য নয়, এটি শিক্ষাদানের গুণগত মান ও প্রভাবের স্তর নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায়, এই স্তরগুলোর উপলব্ধি আমাদের শিক্ষণ পদ্ধতি ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
আসুন, প্রাথমিকের সাধারণ বিজ্ঞানের “বীজের অঙ্কুরোদগম” পাঠটির মাধ্যমে এই ৪ ধরনের শিক্ষকের ভূমিকার পার্থক্য দেখে নিই:
১. সাধারণ শিক্ষক (ঞযব সবফরড়পৎব ঃবধপযবৎ ঃবষষং)
যিনি কেবল তথ্য বা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু বলেন বা লিখিয়ে দেন।এই স্তরের শিক্ষকের ক্লাসে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা। মুখস্থনির্ভরতা এখানে প্রাধান্য পায়। জ্ঞানের গভীরতা বা বোঝাপড়া তৈরি হয় না।
উদাহরণ : সাধারণ শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে পাঠ্যবই থেকে পড়বেন: “বীজ থেকে চারা গজানোর প্রক্রিয়াকে অঙ্কুরোদগম বলে। এর জন্য পানি, বায়ু ও তাপ প্রয়োজন।” তিনি শিক্ষার্থীদের এই বাক্যগুলো মুখস্থ করতে বলবেন এবং পরীক্ষায় লিখতে বলবেন।
২. ভালো শিক্ষক (ঞযব মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ বীঢ়ষধরহং)
যিনি তথ্যের পেছনের কারণ, যুক্তি ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেন।শিক্ষার্থীরা “কেন” ও “কীভাবে” প্রশ্নের উত্তর পায়। যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা এখানে মূল বিষয়। এটি সৃজনশীল পদ্ধতির প্রাথমিক স্তর।
উদাহরণ : ভালো শিক্ষক বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন: “বীজে একটি জীবন সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পানি পেলে বীজফুলে ওঠে, খোসা ফেটে যায় এবং ভেতরের ভ্রূণ বেরিয়ে আসে। এই তাপ ও অক্সিজেন ছাড়া ভ্রূণের বৃদ্ধি সম্ভব নয়।” তিনি ছবি এঁকে বা চার্ট দেখিয়ে প্রক্রিয়াটা বোঝাবেন।
৩. শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (ঞযব ংঁঢ়বৎরড়ৎ ঃবধপযবৎ ফবসড়হংঃৎধঃবং)
যিনি শ্রেণিকক্ষে বাস্তব প্রদর্শন, পরীক্ষণ বা হাতে-কলমে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখান।পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান জীবন্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা দেখে, করে ও অভিজ্ঞতা থেকে শেখে। এটি কার্যকর শিখন-শেখানো (অপঃরাব খবধৎহরহম) এর অনুষঙ্গ।
উদাহরণ : শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ক্লাসেই করে দেখাবেন: তিনি আগে থেকে ভেজানো কিছু ছোলা, মটর বা সরিষার বীজ নিয়ে আসবেন। একটি কঁাচের পাত্রে ভিজা তুলার ওপর বীজগুলো সাজিয়ে রেখে দিবেন। প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সাথে পর্যবেক্ষণ করবেন, অঙ্কুর বের হওয়ার ছবি তুলবেন, একটি ডায়রি লিখবেন। শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে জীবন্তভাবে অনুভব করবে।
৪. মহান শিক্ষক (ঞযব মৎবধঃ ঃবধপযবৎ রহংঢ়রৎবং)
যিনি পাঠদানের গণ্ডি অতিক্রম করে শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল, স্বপ্ন ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বীজ বপন করেন।
শিক্ষার্থীরা বিষয়ের চেয়েও বড় কিছু পায়Ñজীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ও অনুপ্রেরণা। শিক্ষক হয়ে ওঠেন একজন রোল মডেল।
উদাহরণ : মহান শিক্ষক অনুপ্রেরণা দেবেন: তিনি বলবেন, “এই ছোট্ট বীজটির মধ্যে একদিন বিশাল একটি গাছ, শত শত ফল লুকিয়ে আছে। ঠিক যেমন তোমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একজন বিজ্ঞানী, একজন কৃষিবিদ, একজন পরিবেশবিদ হওয়ার সম্ভাবনা।” তিনি শিক্ষার্থীদের বাড়িতে টবে বা বাগানে বীজ রোপণ করতে, একটি “আমার গাছ” প্রকল্প শুরু করতে অনুপ্রাণিত করবেন। তিনি গাছের মাধ্যমে ধৈর্য, যত্ন ও জীবনচক্রের গভীর দর্শন শেখাবেন।
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, বরং এটি একটি সৃজনশীল সাধনা। একজন সাধারণ শিক্ষক যেখানে সিলেবাস শেষ করার তাড়নায় থাকেন, একজন মহান শিক্ষক সেখানে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে অজানাকে জানার একটি চিরস্থায়ী তৃষ্ণা তৈরি করে দেন। দিনশেষে, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো তঁার শিক্ষার্থীর প্রদীপ্ত চোখ এবং সুন্দর একটি মানুষ হিসেবে তাদের গড়ে ওঠা। পারিবারিক শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে যখন সামঞ্জস্য থাকে না, তখন শিক্ষকের জন্য দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১। ভুল সংস্কার বা অভ্যাস: একটি শিশু যদি পরিবার থেকে কোনো ভুল আচরণ বা কুসংস্কার শিখে আসে, তবে শিক্ষককে প্রথমে সেটি তার মন থেকে মুছতে হয় (টহষবধৎহরহম), তারপর নতুন কিছু শেখাতে হয়। এই ‘ভুল মোছার’ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন।
আচরণগত বৈপরীত্য: শিশু যদি বাড়িতে এক ধরনের পরিবেশ (যেমন: চিৎকার করা বা অবাধ্য হওয়া) দেখে অভ্যস্ত হয়, তবে স্কুলের শান্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সে লড়াই করে। এতে শিক্ষকের সময় ও শ্রম বেশি ব্যয় হয়।
২। সহযোগিতার অভাব: অনেক সময় অভিভাবকরা মনে করেন তাদের কাজ শুধু স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া। শিশুর পড়াশোনা বা আচরণের বিষয়ে শিক্ষকের সাথে যখন অভিভাবক সহযোগিতা করেন না, তখন শিক্ষকের একার পক্ষে পরিবর্তন আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৩। আবেগীয় জটিলতা : যেসব শিশু পরিবারে অশান্তি বা অবহেলা দেখে বড় হয়, তারা মানসিকভাবে কিছুটা সংবেদনশীল বা জেদি হতে পারে। এমন শিশুদের শাসন বা পরিচালনা করা একজন শিক্ষকের জন্য বড় একটি মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষা একটি দ্বি-মুখী প্রক্রিয়া। পরিবার যদি মাটির মান উন্নত করে রাখে, তবেই একজন শিক্ষক সেখানে জ্ঞানের বীজ বুনে সুন্দর গাছ তৈরি করতে পারেন।
রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), সদর, চঁাদপুর।








