রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১

ধারাবাহিক উপন্যাস-২৯

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমার ছোট ভাই এখন সহকারী সচিব আর বোন শহরের নামকরা ডাক্তার। তাদের গড়ে তুলতে আমার জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করেছি অথচ বলে ওদের জন্য কিছুই করিনি। বিয়েটাও করেছিলাম চল্লিশের পর তাই তো ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে পারিনি সময়মতো তার আগেই চাকরিটা অবসর দিয়ে দিল। অবসরের আগে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেই আর একমাত্র ছেলেকে পরবতীতে বিদেশে কাজের জন্য পাঠিয়ে দেই। মাঝে মধ্যে ভাবি সেদিন যদি আত্মহত্যাটা সফল হতো নতুবা আমি আমার স্বার্থটাকে প্রাধান্য দিতাম তাহলে কী ওরা আজ এতটা সফল হতে পারত! অথচ বলে আমি ওদের জন্য কিছুই করিনি। কিছুটা স্বপ্ন রেখেছিলাম মুঠোয় পুরে যখন মুঠো খুলি শূন্য ছাড়া কিছুই পাইনি। সেই থেকে আজ অবদি আমি আমার পরিচয়ে চলছি আর ওরা আছে ওদের মতো করে। পিটার এই হাসিখুশি চেহারাটার পিছেও অনেক বেদনা লুকিয়ে আছে যা প্রকাশ করা যায় না। আমি সেই ব্যর্থ মানুষ যে নকল হাসি হেসে নিজেকেই ঠাকায় আর বলেÑএই বেশ ভালো আছি।’ সারোয়ারের কথায় সেদিন পিটারের কান্না থেমেছিল ঠিকই কিন্তু নতুনরূপে তার আত্মপ্রকাশটাও ঘটেছিল। নিজেকে এভাবে প্রকাশ না করলে জানতে পারতাম না তার হাসিমাখা রূপটার পেছনে রয়েছে কতটা করুন আর্তনাদ। আমাদের চারজনের প্রকৃতি ভিন্ন, বেদনা ভিন্ন, ভিন্ন জীবনধারা শুধু একটা বিষয় মিলে যায় আমরা প্রত্যেকে বাঁচতে চাই আত্মসম্মান নিয়ে। সারোয়ারের বীরত্বের কাছে অবশেষে হেরে যাই। জীবনযুদ্ধে সে আমাদের চেয়েও বড় যোদ্ধা কারণ তার বেদনাগুলো মুখোশের আড়ালে রেখে সে হাসতে জানে, বাঁচতে জানে।

১৬.

প্রমোশনের বিষয়টা ঘনিয়ে এলে মনটা কেমন যেন উতলা হয়ে আসে। আমি একজন চাকরিজীবী তাই বদলি হওয়া অসম্ভব কিছু না। এবারের প্রমোশনের লিস্টে নামটা তালিকার শুরুতেই আছে তাছাড়া প্রমোশন হলে বদলি হওয়া অনেকাংশে নিশ্চিত তাই দ্বিধায় আছি। ভয় বদলির নয় তবে বাবার বিষয়ে ভাবলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে সবে মাত্র স্বাভাবিক হলেন আর এখন স্থান পরিবর্তন করলে আবার আগের মতো একা হয়ে যাবেন। সূপর্ণা বারের সদস্য পদের জন্য পরীক্ষা দিবে তাই তার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সর্বসময়। ঢাকায় স্যাটেল হয়ে যাওয়ার চিন্তাধারা আমাদের বহু আগে থেকেই ছিল। রাজধানী বলে কথা তাছাড়া অন্যান্য মেট্রো বা জেলা সদরের তুলনায় ঢাকায় আনুষাঙ্গিক সুযোগ সুবিধাদি বেশি শুধু সমস্যা যানযট আর ঘনবসতি। এগুলোকে বাদ দিলে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা ও তাদের উন্নতর পরিবেশের ক্ষেত্রে রাজধানী অবশ্যি বসবাসের যোগ্য। ঢাকায় বাবার জন্য সমস্যা হবে কারণ এখানে যতটুকুই মানিয়ে নিয়েছেন সেখানে আবারও একা হয়ে যাবেন। আমরা দুজনেই কর্মব্যস্ত তাই উনাকে সময় দেওয়া হয়ে উঠবে না। এ শহরে সমসাময়িক কতগুলো সঙ্গী তিনি জোগাড় করেছেন যার ফলে উনার সময়গুলো ভালো কাটছে এবং সবসময় প্রাণবন্ত আর হাসিখুশিও থাকছেন। আমি তো প্রথমে ভাবতেই পারিনি উনার মানসিক অবস্থা এত সহজে রিকোভারি করবেন। সত্যি প্রতিটি বয়সে তার সহপাটি বা তার বয়েসি কিছু মানুষের প্রয়োজন আছে নতুবা মানুষ একাকিত্বে ভোগে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবাকে সেখানে ফেলে আসাটাই ছিল বোকামি। তাছাড়া কেন যে উনি আমাদের সাথে থাকতে রাজি হননি বুঝতে পারিনি। নিশ্চয় আমাদের কোথাও গ্যাপ ছিল নতুবা উনার সেরকম আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারিনি তাই হয়তো আমাদের সাথে আসতে উনার দ্বিধা ছিল। পাড়ার দোকানদার দিদার মিয়া ফোন করে না জানালে বাবার এ পরিস্থিতির কথা জানতামই না। কী যে একটা ভুল করেছিলাম আমরা সেটা প্রথমে বুঝতে পারিনি। যাক আরও বড় ধরনের ভুল হয়ে যেত যদি বাবাকে হারিয়ে ফেলতাম সে সময় তাহলে একটা আফসোস সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হতো আর নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারতাম না।

‘কী হয়েছে, এভাবে একা বসে থেকে কী ভাবছ?

‘ভাবছি আমার প্রমোশনের বিষয়ে।’

‘সহসাই সম্ভবনা আছে নাকি?’

‘এবারের লিস্টে প্রথমদিকে আছি তাই সম্ভবনা বেশি।’

‘বাহ্ চমৎকার একটা নিউজ শোনালে তাহলে এটাতে ভাবনার কী আছে?’

‘বাবাকে নিয়ে ভাবছি। সবেমাত্র রিকোভারি হয়েছে আর আমার প্রমোশনে যদি ট্রান্সফার হয়ে যায় তাহলে উনি নতুন জায়গায় আবার একা হয়ে যাবেন।’

‘কথাটা মন্দ বলনি। তোমার ট্রান্সফার হলে আমারও তো ঝামেলা হয়ে যাবে। নতুন এলাকায় গিয়ে আবার নতুনভাবে সবকিছু গোছাতে হবে এদিকে আমার বারের পরীক্ষাও শেষ হয়নি। তাছাড়া ছেলে-মেয়েদের নতুন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ভালো স্কুলে ভর্তি করা, অজানা পরিবেশ ইত্যাদি ঝামেলা হয়ে যাবে। ট্রান্সফার সুফল কতটুকু দেয় জানি না তবে প্যারা দেয় প্রচুর।’

‘আমি অতসব নিয়ে ভাবছি না। বাচ্চাদের পড়াশোনা নিয়ে প্রথমে একটু সমস্যায় পড়তে হবে পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যাবে। আমার চিন্তা শুধু বাবাকে নিয়ে।’

‘ঠিক বলেছ। উনার বয়সে নতুন করে কিছু করা হয় না তারপরও কিছু সহপাটি জোগাড় করেছেন যাদের সাথে সময় কাটাতে পারেন। উনার এই ব্যাচের কারণে আমরাও অনেকটা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারি।’

‘আচ্ছা বাবা কবে নাগাদ ফিরছেন কিছু কী জানিয়েছেন তোমায়?’

‘না সেরকম কিছুই বলেননি তবে বলেছেন ট্যুর শেষে ফিরতে প্রায় সপ্তাহখানেক লাগতে পারে।’

‘সপ্তাহ কেন আরও বেশিদিন থাকলেও সমস্যা নেই কারণ উনি উনার সমবয়েসিদের সাথে বেশ আছেন। নিজের মতো করে বাকি দিনগুলো কাটাচ্ছেন আর আমরাও নিশ্চিন্ত একপ্রকার।’

‘তা ট্যুরে যাওয়ার পর বাবার সাথে কথা হয়েছে তোমার।’

‘না এখনো ফোন দেইনি। ভাবলাম উনারা ট্যুরে গিয়েছেন আর নিজের মতো থাকছেন যেহেতু তাহলে অযথা বিরক্ত করে লাভ কী?’

‘তারপরও তোমার খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বাবার একটু অসুস্থ্যতায় তোমরা যে যার কাজ কর্ম ফেলে চলে গিয়েছিলে খেয়াল আছে। ছেলে বলে কথা তাই বাবার খোঁজ-খবর নেওয়া বেশ প্রয়োজন।’

‘ঠিকই বলেছ। কাল ভোরে অফিস যাওয়ার সময় কল দিব। চল শুয়ে পড়ি কাল আবার অফিস আছে।’

সূপর্ণা খোঁচা মেরে কথা বললেও কথাটা সত্যি। বাবা অসুস্থ্য এটা শুনেই আমরা সকলে ছুটে গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে কী মায়ের মৃত্যুর পর বাবাকে এভাবে রেখে আসাটায় আমাদের মধ্যে একটা অপরাধবোধও কাজ করছিল আর সে জন্যই তড়িঘড়ি করে ছুটে গিয়ে বাবার মতের পরোয়া না করেই নিয়ে আসি। সুযোগ থাকলে জীবনের ভুলগুলোকে যথাসম্ভব সুধরে নেওয়া উচিত নতুবা সময় ফুরিয়ে গেলে কিছুই থাকে না আফসোস ছাড়া।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়