প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০২
আত্রাই তীরের কিউটি: এক বিষাদমাখা বিচ্ছেদ

আত্রাই নদীর পাড় ঘেঁষে আমাদের যে ভাড়া বাসাটি ছিলো, তা ছিলো সবুজে ঘেরা এক স্বর্গরাজ্য। চাকুরির সুবাদে সেখানে থাকতে শুরু করেছিলাম। বাসাটি ছিলো বেশ নিরিবিলি। সেখানেই আমাদের জীবনে আগমন ঘটলো কিউটির। ছোট ছোট তুলতুলে হাত-পা আর মায়াবী দুটি চোখ নিয়ে যখন ও প্রথম আমাদের ঘরে এলো, তখন কেউ ভাবেনি যে মাত্র ৫ মাসের ব্যবধানে ও আমাদের এতোটা আপন হয়ে উঠবে।
কিউটি আমাদের কাছে শুধু একটি পোষ্য বিড়াল ছিলো না, ও ছিলো আমার পরিবারের একজন সদস্য। আমার ছেলেমেয়েদের সাথে ওর বন্ধুত্ব ছিলো দেখার মতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাবাড়িজুড়ে চলতো ওদের খুনসুটি। কখনো ও খাটের নিচে লুকিয়ে থাকতো, আবার কখনো জানালার পর্দার আড়াল থেকে হঠাৎ লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসতো। শিশুরা যখন পড়াশোনা করতে বসতো, কিউটি তখন টেবিলের এক কোণায় চুপচাপ বসে থাকতো। মনে হতো ও সব কিছু বুঝতে পারছে, সবকিছু শুনছিলো।
চাকুরির দিনগুলো অনেক সময় ক্লান্তিকর হয়ে যেতো। কিন্তু বাসায় ফেরার সাথে সাথেই সেই ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যেতো। কলিংবেলের শব্দ হওয়া মাত্রই কিউটি দরজায় এসে হাজির হতো। ও এমনভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিলো যেনো ওর সারাদিনের সব কথা একবারে বলে ফেলবে। আমার সাথে ওর সখ্যতা ছিলো একটু অন্যরকম। সারাদিন বাইরে থাকলেও রাতের বেলাটা ছিলো আমাদের একান্ত সময়। ও ঠিক আমার কোল ঘেঁষে ঘুমাতো। ওর গায়ের সেই নরম ছোঁয়া আর মৃদু নিশ্বাসের শব্দ আমাকে প্রশান্তি দিতো। যতোই দুশ্চিন্তা থাকুক না কেন, কিউটির মাথায় হাত বোলালে সব কষ্ট হালকা হয়ে যেতো।
কিন্তু সুখের দিনগুলো বোধহয় খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। হঠাৎ করেই চাকুরির বদলির আদেশ এলো। আমাকে এমন এক দুর্গম এলাকায় যেতে হবে, যেখানে আবাসন ব্যবস্থা বিড়াল রাখার মতো নয়। চাকুরির নিয়মকানুন আর পারিপার্শ্বিকতার কারণে কিউটিকে সাথে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না। এই খবরটি যখন বাড়িতে জানালাম, তখন সবার চোখে জল। শিশুরা তো মানতেই চাইছিলো না। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমাদের পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশীর কাছে ওকে রেখে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্রতিবেশী সেই পরিবারটি খুব ভালো। তারা কথা দিয়েছে যে কিউটিকে তারা নিজেদের সন্তানের মতো আগলে রাখবে। কিন্তু আমার মন মানছিলো না। আমি বারবার ভাবছিলাম, তারা কি আমাদের মতো করে ওকে এতোটা আদর করতে পারবে? আমরা জানি কিউটি কখন ক্ষুধার্ত হয়, ও কখন খেলতে চায়, ওর মেজাজ কখন খারাপ থাকে। তারা কি ওর সেই সূক্ষ্ম ইশারাগুলো বুঝতে পারবে? আমাদের মতো শাসন আর আদরের সংমিশ্রণে ওকে কি বড় করতে পারবে? উত্তরটা জানা নেই, তবুও নিরুপায় হয়েই তাকে রেখে এলাম।
বিচ্ছেদের সেই মুহূর্তটি ছিলো অত্যন্ত বেদনাবিধুর। কিউটিকে যখন তাদের বাড়িতে দিয়ে আসছিলাম, ও তখন ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো ওর সেই চোখের ভাষায় হাজারো প্রশ্ন লুকানো। ও যেনো জানতে চাইছিলোÑ‘আমি কী কোনো ভুল করেছি? তোমরা আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছো?’ ওর সেই মায়াবী চাহনি আমার বুকটা বিদীর্ণ করে দিচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো জগতের সব মায়া যেনো ওই দুটি চোখে এসে ভিড় করেছে।
এখন নতুন জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আর বাড়িতে বসে বারবার কিউটির কথা ভাবছি। মনের আয়নায় ভেসে উঠছে ওর ছোট ছোট দুষ্টুমিগুলো। কখনো ও রান্নাঘরে ঢুকে দুধের বাটি নড়াচড়া করছিলো, কখনো বা আমার জুতো নিয়ে লুকোচুরি খেলছিলো। এই ৫ মাসের স্মৃতি এতোটাই গভীর যে তা মুছে ফেলা অসম্ভব। যতোদিন যাচ্ছে, ওর প্রতি মায়া ততোই বাড়ছে। ভাবছি, নতুন মালিকের কাছে ও কী ঠিকমতো খাচ্ছিলো? ওরা কি ওর ঘুমানোর জন্য সেই নরম বিছানাটা দিবে?
প্রতিটি মুহূর্তে ওর অভাব অনুভব করছি। আত্রাই নদীর সেই তীরে আমার হৃদয়ের একটা অংশ রেখে এসেছি। যতোদিন বাঁচবো, কিউটির কথা মনে থাকবে। জানি না নতুন পরিবেশে নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেবো, কিন্তু কিউটির সেই স্পর্শ আর ভালোবাসা আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সারাজীবন অমলিন হয়ে থাকবে। হয়তো সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে যাবে, কিন্তু ৫ মাসের সেই ছোট্ট বন্ধুটির কথা কখনো ভুলতে পারবো না।
কিউটি হয়তো এখন প্রতিবেশীর সেই বাড়িতে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে, হয়তো আমাদের ফেরার প্রতীক্ষা করছে। ওর এ অবুঝ মায়ার কোনো প্রতিদান আমি দিতে পারবো না। শুধু প্রার্থনা করি, ও যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, যেনো খুব ভালো থাকে। ওর জীবনটা যেনো সুখে কাটে। মায়ার এ টান চিরকাল অমলিন থাকুক।








