বুধবার, ০৭ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৯

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(সাতচল্লিশতম পর্ব)

জন্ম-জনপদের ভাষাশৈলী : শ্রবণ-মননের সমৃদ্ধি-২

ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়া তাঁর আঞ্চলিক ভাষার ছড়াগ্রন্থে বেশকিছু বাগধারা এবং বাগধারাপ্রতিম শব্দের প্রয়োগ করেছেন। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম ‘কোয়াল খাইয়ে।’ বইয়ের নামটাই একটা বাগধারা। ‘কোয়াল খাইয়ে’ মানে হলো দুর্গতিতে ভোগা। কোয়াল শব্দের অর্থ হলো কপাল। ‘কোয়াল খাইয়ে’ মানে হলো দুর্ভাগ্য হানা দেওয়া। তিনি ‘নেতা’ নামের ছড়ায় ‘ফাল পাড়ে’ শব্দের অসাধারণ প্রয়োগ করেছেন। ‘ফাল পাড়ে’ মানে হলো অহেতুক হম্বিতম্বি করা যার কোনো ফল নেই। কিন্তু লোক দেখানোর জন্যে তারা কারণে-অকারণে হম্বিতম্বি করে। ‘ফাঁস’ নামের ছড়ায় তিনি ‘মাইয়ালার চিক্কর’ শব্দের ব্যবহার করেছেন। মাইয়ালা মানে হলো মহিলা। চিক্কর মানে হলো চিৎকার। মাইয়ালার চিক্কর বলতে সারা পাড়া মাতিয়ে তোলা বুঝায়। অর্থাৎ মহিলারা সাধারণত যে কোনো তুচ্ছ বিষয়কে চিৎকার-চেঁচামেচি করে বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে কলতলায় কিংবা পুকুরঘাটে। সুকুমার বড়ুয়া তাঁর ছড়ায় এ বিষয়টাকেই তুলে ধরতে ‘মাইয়ালার চিক্কর’ শব্দের অতি নান্দনিক ব্যবহার করেছেন। ঊনিশশো আটত্রিশের পাঁচ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া ছড়াশিল্পী দুহাজার ছাব্বিশের দুই জানুয়ারি পরলোকগমন করেন। এ লেখায় তাঁকে স্মরণ করে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

আমার দিদিমা মাঝে মাঝে রেগে গেলে তাঁর অনুগতদের বলতেন,’ পোঁদত নাই ত্যানা / মিডাদি ভাত খানা।’ মানে হলো, যার পরণে লজ্জা নিবারণের কাপড় নেই তার আবার দামি খাবার খাওয়া। এর কাছাকাছি আরেকটা কথা হলো,’ মঅনির ফোয়ার ফ্যাডফ্যাডি বাড়ি গিইয়্যে।’ এর মানে হলো যে মাগে বা ভিক্ষা করে, সেই ভিখারিণীর ছেলের ফুটানি বেড়ে যাওয়া। এগুলো তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হওয়ার চেয়ে রাগের প্রকাশ অর্থেই অধিক ব্যবহৃত হয়। আবার অতি লোক দেখানোপনা বোঝাতে ‘লাখ

টেঁয়ার সদঅরি মারা’ কথাটিরও প্রয়োগ হয়। অর্থাৎ এমন বিলাসবহুলভাবে সে চলাফেরা করে, যেন তার লাখ টাকার সওদাগরি আছে বা লাখ টাকার ব্যবসা আছে। কেউ যখন অতি ধীরে কাজ করে তখন আমরা তাকে প্রমিত বাংলায় বলি শম্বুক গতিতে কাজ করা। এ কথাটিকেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রবাদে বলে : ‘ তুই আইতে আইতে ধেচ্ছুয়্যা রাজা হই যাইবু গই।’ মানে তুই এতো ধীরলয়ে আসছিস যে, ফিঙেও এ সময় রাজা হয়ে যেতে পারে।’ যারা অকারণে এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ায়, কথা চালাচালি করে, বাক্যবাদিতা করে, তাদেরকে ধমকাতে বলা হয়, ‘আইলা কথার দাইলা ন মারিস্।’ অর্থাৎ আইলা কথা মানে ফালতু কথা বা আলগা কথা। দাইলা মানে দাখিল করা বা পেশ করা। কেউ যখন অতিরিক্ত খবরদারি করে তখন তাকে থামিয়ে দিতে বলা হয়, ‘ তোরে ক্বনে চইদারি দিয়্যে দে।’ অর্থাৎ এ ব্যাপারে খবরদারি করার কর্তৃত্ব তোকে কে দিয়েছে? গ্রামদেশে স্বর্ণকারদের নিয়ে একটা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বলা হয়, বাইন্যা তার মা’র কানর সোনাত্তুনঅ সোনা চুরি গরে। অর্থাৎ স্বর্ণকার তার মায়ের কানের সোনা থেকেও স্বর্ণ চুরি করে সরিয়ে ফেলে। তার পেশাটাই হলো এমন লোক ঠকানি। কেউ অপচয় করলে বা অতিরিক্ত টাকা চাইলে তাকে শোনানো হয়,’ মোটরি আছে না?’ মানে হলো আমি কি গুপ্তধনের মটকা পেয়েছি যে অকাতরে খরচ করবো? গ্রামে মুরুব্বিরা গেলে যদি অনুজ কেউ নমস্কার না করে তবে তার নামে অভিযোগ আসে, অমুকের পোয়ার হাত ন নামে। মানে ওর ছেলের গুরুজনকে নমস্কার করার চর্চা নাই। আবার বাবা যখন ছেলেকে মারতে উদ্ধত হয় তখন দাদী তার ছেলেকে বলে, আঁর নাতির গা’ত হাত ন তুলিছ্।’ মানে আমার নাতিকে মারিস্ না। তৃতীয় পক্ষ যখন বিবদমান দু পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি লাগাতে চায় তখন বলে উঠে, ‘মার বদি আলম। তোরে মাইরলে তুইও মার। ন ফাইরল্যে ফাত্থর মার।’ যদি হাতে মারতে না পারিস্ তাহলে পাথর ছুড়ে মার। তবু তোকে ও মারলে তুইও তারে মার। আবার সংশয়ে থেকে কেউ যখন কোনো কাজ করে তখন সে নিজেকেই নিজে বলে, ‘ হইলে হউক নইলে নউক / নূরুল হক’। অর্থাৎ সফল হোক বা না হোক, কাজ তবু করে যাও। কেউ কেউ আছে স্থান-কাল-পাত্র বোঝে না। কখন কাকে কী বলতে হয় তা জানে না। এদের কথাকেই তুচ্ছ করতে আমরা বলি,’পঅল ছঅলে কী ক্বঅর’। অর্থাৎ, পাগল-ছাগলে কী না বলে! কেউ বেশি তাড়াহুড়া করলে বলা হয়, ‘তুই লন্ডন যঅর না?’ মানে এতো তাড়া কীসের? তুই তো আর লন্ডন যাবি না। তেমনি কেউ ধীরে-সুস্থে হাঁটলে তাকে বলা হয়, ‘বৈরাতি হাঁডা নো হাঁডিস।’ মানে হলো বরযাত্রীর মতো ধীরে-আস্তে হাঁটিস না। কেউ যখন অকারণ ফাঁপর নেয় তখন বলা হয়, ‘ দঅর দা’লি ন গরিছ্’। অর্থাৎ দালালি করিস্ না। শুকনা মুখে কেউ হন হন করে হাঁটলে তাকে লোকে জিজ্ঞেস করে,’ উয়াস-ক্বাআঁশ কডে যঅর?’ মানে না খেয়ে না দেয়ে কই যাস্? খুশিতে কেউ যখন প্রফুল্ল হয় তখন আমরা বলি,’ মুখ ফঅর হই গিইয়্যে’। মানে মুখ আলোকিত হয়ে গেছে। আর ‘মুখ ফঅর গরিছ্’ বললে বুঝা যায়, আমাদের মান রাখিস্, আমাদের মুখ উজ্জ্বল করিস্। কেউ কথা বেশি বললে তাকে শাঁসাতে বলা হয়, মুখত মেডা দে। মেডা মানে হলো ছিপি। আর কেউ কারণে-অকারণে বাতকরম করলে তাকে বলা হয়, পোন্দত মেডা দে।’ মানে এবার থাম। কেউ কেবল খেতেই থাকলে তাকে বলা হয়, ‘ মুখত ক্বঁঅইর লাগাই দিয়্যুম।’ ক্বঁঅইর মানে হলো গরুর মুখে আটকে দেওয়া বাঁশ বা বেতের আগল বিশেষ। এতে গরু আর খড়-বিচালি বা কারও খেতের ফসল খেতে পারে না। কেউ কারও প্রশংসা বেশি করলে বলা হয়, ‘তোতো ন বাজাইছ্।’ তোতো মানে হলো বাঁশি বা ট্রাম্পেট। আর কারও সাফল্য ঝলকে উঠলে বলা হয়, ‘ বঅটা উড়ের।’ বঅটা মানে পতাকা। অর্থাৎ তার পতাকা উড়ছে। মানে তার সাফল্য পৎ পৎ করছে। কেউ যাতে বেদিশা না চলে রাত-বিরেতে, সেজন্যে তাকে বলা হয়, ‘ আঁধাইরয্যা গোন্দাইরয্যা নো হাঁডিছ্।’ অর্থাৎ অন্ধকারে খানা-খন্দকে পড়িস্ না। মেজবানে-নিমন্ত্রণে কোনো অতিথিকে খাবার একটু বাড়িয়ে দিতে বললে বলতে হয়, ‘ইন্দি চ্বাবি দে।’ মানে এইদিকে চেপে দাও। অর্থাৎ বাড়িয়ে দাও। আর যদি কোনো দাওয়াতে গণহারে নিমন্ত্রণ করা হয় তখন বলা হয়, ‘ ছপ বাইট্যান দিয়ুম।’ মানে গণহারে সবাইকে বলবো।’ এটা ছপের স্থলে ছাপও অনেকেই বলেন। অর্থাৎ ছাপ বাইট্যান। বাইট্যান মানে বন্টন বা নিমন্ত্রণ অর্থে। কেউ যদি আবোল তাবোল কথা বলে তবে তাকে, ‘আধা মদা ছৈইদা ‘ বলা হয়। অর্থাৎ সৈয়দ নামের কেউ হয়তো আধ-পাগল ছিলেন। তার নামের সাথে সংশ্লিষ্ট করে কাউকে খেপানো হয় আধ-পাগল বলে। আর কেউ যদি গোল্লায় যায় বা কাউকে দিয়ে কিছু না হলে বলা হয়, ‘হিতি ফডৎ গিইয়্যে।’ মানে ও নষ্ট হয়ে গেছে। একে অনেকেই ‘ভোল গেইয়্যে’ও বলে। ভোল যাওয়া মানে ডিম নষ্ট হওয়া। ফাটানোর পর ডিম নষ্ট দেখলে বলা হয়, ভোল গেইয়্যে। চট্টগ্রামের ভাষায় একটা শ্লোক আছে। যেনতেনভাবে হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে সহজ-সরল মানুষকে ঠকানো হলে বলা হয়,’ সাত-পাঁচ চৈদ্দ, দুই টেঁয়া নইদ্যু।’ মানে হলো সাত টাকা আর পাঁচটাকা মিলে চৌদ্দ টাকা হয়েছে। ঠিক আছে আপনি দুটাকা কম দেন। অথচ সঠিক হিসেবে সাত টাকা আর পাঁচটাকায় বারো টাকা হয়। কিন্তু ক্রেতাকে অলীক একটা সুখ দিতে বলা হতো দু টাকা কম দিতে। এতে ক্রেতাও খুশি হয়ে বিক্রেতার ওপর সন্তুষ্ট থাকতো। কোনো ঘর কেউ আবর্জনাময় বানিয়ে রাখলে বলা হয়,’গরুর গোথাইল ন বানাইছ্। ‘ গরুর গোথাইল মানে গোয়াল। আর কাউকে মন্দভাগ্যে পেলে সে বলে, ‘প্যারাছেদায় ফাইয়্যে’। যদি কেউ নিজের বাড়িতে খাবার খেতে ইতস্তত করে কিংবা কোথায় কী আছে তা না জানে, তখন তাকে ভর্ৎসনা করে মা বলেন,’গরবা আইস্যছ না?’ গরবা মানে হলো মেহমান বা অতিথি। যেখানে সেখানে গিয়ে ভাত না খাওয়ার জন্যে সাবধান করে বলা হয়, ‘ যেডে হেডে পেট ন ফেলাইছ্।’ মানে পেট ন ফেলাইছ হলো অন্ন গ্রহণ না করা। ‘পেট ফাডি গিইয়্যে’ বললে বুঝায় পেট ভরতি হয়ে উপচে পড়া। যেমন : ভাত খাই পেট ফাডি গেইয়্যে। আবার হাইসতে হাইসতে পেট ফাডি গেইয়্যে বললে হাসির চোটে পেটে খিল ধরা বুঝায়। যখন কাউকে অসঙ্গত যৌনতা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়, তখন বলতে হয়, ‘পেডে পেডে ন লাগাইছ।’

যাকে ‘মিছা কথার গাট্টি’ বলে বকা দেওয়া হয়, বুঝতে হবে ঐ লোক প্রচুর মিথ্যে কথা বলে। এটা কখনও কখনও কাউকে আদর করেও খেপাতে বলা হয়। আবার যখন কাউকে ‘গুইট্যাচালি ন গরিছ্’ বলে শাঁসানো হয় তখন বুঝতে হয়, আদেশ দানকারী চান না ঐ লোক আর গুটি চালাচালি করুক; কূটনীতি বা ষড়যন্ত্র করুক। যে ‘ভাইল মারে’ সে আসলে তেল মারে বা ভাঁজ দিয়ে চলে। যে ‘থঁউর চুঁয়া’ সে হলো ঠুঁটো জগন্নাথ। থঁউ মানে তামাক আর চুঁয়া মানে হুক্কার নল। হুক্কার নলের ধোঁয়া বহন ছাড়া কোনো কাজ নেই। যে ‘গপর চুঁয়া’ ছাড়ে সে আসলে আষাঢ়ে গল্প বলে। অর্থাৎ ঢপবাজ। সে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে। ‘হোঁশ ঠিক মাথা খরাপ’ মানে হলো জাতে মাতাল তালে ঠিক। সে ভান ধরে খারাপের কিন্তু আসলে সে ভালই আছে। যার পেটে ক্ষুধা সে জানে পেটে কী চলছে। সে যখন বলে, “ভোগে পেডর ভিতর ভূঁইচাল ধা’র” তার মানে বুঝতে হয়, অতি ক্ষুধায় পেটে ভূমিকম্প চলছে। কেউ যখন খাই খাই বাই দেখায় তার মা তখন রাগ হয়ে বলতেই পারে, ‘এক পেট খাই এক পেরগুয়্যা নো হাগিছ্।’ অর্থাৎ ভরপেট খাবে আর বেশি পরিমাণে মলত্যাগ করবে। এ ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কোনো প্রাপ্তি কপালে থাকলে তা যে কোনো উপায়েই হোক আসবে। এটা বুঝাতে বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, ‘ ক্বোয়ালত থাইলি পোঁদর তলদি হইলেও আইবু।’ আর যে কেবল নিজের রক্ত সম্পর্কীয় আপনজনের প্রতি পক্ষপাত দেখায়, তাকে ইঙ্গিত করে লোকে বলে, ‘ আঁশে আঁশ টানে কোদালে বুক টানে।’ যে বাঁচাল তাকে হেয় করতে বলতে হয়, ‘ ক্বুরার পোঁদরি খাইয়্যে।’ ক্বুরা মানে মুরগি আর পোঁদরি মানে মলদ্বার। মনে হয় মুরগি ঘন ঘন মলত্যাগ করে, তাই তার মলদ্বারের সাথে বাঁচালের মুখের মিল পাওয়া যায়। কেউ কেউ আলঙ্কারিক প্রয়োগে অনুরাগ দেখাতে বলেন, ‘ ক্বাইনতি ক্বাইনতি চউগর পানি হাঁইছত ধা’র’। অর্থাৎ প্রিয়জনের জন্যে কান্নার তীব্রতায় চোখের জলে ঘরের দাওয়ায় বান জেগেছে। কেউ কারও জন্যে অতিরিক্ত মায়া দেখাতে গেলে তাকে শুনতে হয়,’ তুই ক্যায়া তলা পুড়ি খোলা হলি?’ অর্থাৎ মাটির খোলা বা খোরায় কিছু ভাজলে খাদ্যদ্রব্য পুড়ে যাওয়ার আগে খোরার তলা পোড়ে। কারও কারও অভ্যাস আছে, কোনো বেদনার স্মৃতিকে মনে করে কষ্ট পাওয়া। এদের জন্যে বলা হয়,

‘খুঁডাই খুঁডাই ঘা ন গরিছ্।’ অনেকেই আছে পুরানো কোনো ক্ষতকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বড় ঘা করে ফেলে। যাতে পুরানো বেদনাকে এ রকম খোঁচানো না হয়।

‘কথার ফেঁডা গালঅরদে না’ বললে বুঝায়, একথা-সেকথা বলে কথা আদায় করা। অনেকের স্বভাব আছে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কথা জিজ্ঞেস করা। এটাকে বলে কথার পেঁটা গালা। যেমন মাছ কুটলে পেটের নাড়িভুরি বের করতে হয়, সেরকম। ‘ খাইত ন ফাইরলি জুদা খা’ মানে হলো সম্প্রীতিতে একসাথে থাকতে না পারলে পৃথক হয়ে যাওয়া। তবুও যেন তারা ভালো থাকে। আরেকটা শ্লোক আছে যাতে বলা হয়,

‘বুড়াবুড়ি ক্বুরার ঠ্যাং

গরবা আইলি ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ’। অর্থাৎ বুড়োবুড়ির কোনো কাজ নেই। মুরগির পায়ের মতোই তারা অস্থিচর্মসার। কিন্তু ঘরে মেহমান আসলেই বকবক করে। একসময় যৌবনকালে যারা সংসারের ঘানি টেনে গেছে, তারাই আজ বার্ধক্যে অপাংক্তেয়।

কিছু কিছু বাগধারা জাতীয় শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়, যেগুলোর অর্থের ব্যাপ্তি ও সৌন্দর্য চমৎকার। যেমন : কেউ যদি শুভংকরের ফাঁকি দেয় তবে তাকে বলে টোনটো মদন। মহিমর বিশ্বাস নাই। খাবাইবার বেলাত হিতি টোনটো মদন। অর্থাৎ মহিমকে বিশ্বাস করা চলে না। খাওয়ানোর কথা তুললেই সে বুড়ো আঙুল দেখায়। মানে ফাঁকি দেয়। আবার কেউ যখন ঠাট্টা করতে করতে অতিরিক্ত করে ফেলে, তখন তাকে থামাতে বলা হয়, ‘ অডা, মদা’ই ন গরিছ্।’ মানে পাগলামো করিস্ না। কাউকে অতিরিক্ত কালো বলে প্রকাশ করতে গেলে বলতে হয়, চোরক কালা। কেউ যদি বলে, ইবা কী বিয়া গরলি? এক্কেবারে চোরক কালা।’ তার মানে হলো, এটা কী বিয়ে করলি? এক্কেবারে মিশকালো। ঘোর সন্ধ্যাবেলা বুঝাতে স্থানীয়রা বলে, মহা আঁজইন্যা। বিনালাভে বেগার না খাটা বুঝাতে হলে বলতে হয়, ‘মতঅর খাঁ ন খাডিছ্’। কেউ অপ্রিয় কথা বললে তাকে থামিয়ে দিতে বলতে হয়, ‘আফোয়াইদ্যা কথা ন ক্বইছ্’। আফোয়াইদ্যা মানে হলো বিস্বাদ। কেউ বেশি আওয়াজ করলে বা ধস্তাধস্তি করলে তাকে ধমকে বলা হয়,’ বেশি ন মইচালাইছ্।’ মানে অতিরিক্ত নড়াচড়া বা আওয়াজ কোরো না। যদি কোনো কিছু বেশি তেতো হয় তবে বুড়োবুড়িকে বলতে শুনি, জখর তিতা। খাবার খেতে গিয়ে কারও মুখে আর ইচ্ছে না করলে বলা হয় ‘মুখ মারি আইয়্যের।’ কাউকে তাড়াতাড়ি আসার জন্যে বলা হলে বলতে হয়, ‘ ট্বঅর গরি আয়।’ কারও গায়ে যদি তীব্র জ্বর আসে তবে লোকে বলে, ‘ আথাম থাম জ্বর।’ যখন তীব্র ঝড় হয়, কোনো দিকদিশা পায় না তখন বলা হয়, ‘ উয়ালাচা ঝড়’। কেউ কোনো জিনিস হাতড়ে ধরে রাখতে না পারলে তাকে খেপিয়ে বলা হয়, ‘ কই মাছ ন ধরিছ্’। কই মাছ ধরা আসলেই খুব কঠিন। তাড়াতাড়ি হাঁটার দরকার হলে বলতে হয়, ‘গডগডাই হাঁট।’ মানে গট গট করে হোঁটে আয়। ‘চড়চড়াই নাম’ বললে বুঝতে হয়, তাড়াতাড়ি নামতে বলা হয়েছে। তেমনি ‘তড়তড়াই আয়’ মানে হলো তাড়াতাড়ি আয়। ‘বেশি ন ফরফরাইছ্’ বললে বুঝতে হয়, অতিরিক্ত পট পট করতে বারণ করা হয়েছে। কেউ কেউ আছেন, যারা সবকিছুতেই ফর্ ফর্ করে। একথা তাদের উদ্দেশ্যেই বলা। “খরখরাই রা’ন” যদি কাউকে বলা হয় তবে বুঝতে হবে, কম তেলে ভাজি করার কথা বলা হয়েছে। কাউকে ‘কড়কড় ন গরিছ্’ বলা হলে বুঝতে হবে, তাকে বাঁচালতা পরিহার করতে বলা হয়েছে। “ঝরঝরাই ফু’য়া” বলা হলে বুঝতে হবে শুকিয়ে ঝরঝরে করতে বলা হয়েছে। কেউ ঝুলে থাকলে তাকে বলা হয়, ‘ ন লড়করাইছ্’। কারও কারও শাড়ি বা পরিধেয় মাটিতে ঝুলে থাকে। এতে ধুলাবালি ও ময়লা লাগে অহেতুক। এজন্যেই এদের বলা হয়,’ ক্বঅড় ন লড়খরাইছ্।’ মানে কাপড় মাটিতে লড়খড় করিস্ না। কেউ কারও পিছে যাতে না লাগে, বিরক্ত না করে, এজন্যে বলতে হয়, ‘ পোঁদত দাড়া ন দিছ্’। দাড়া মানে চিকন কাঠি। অর্থাৎ মলপথে কাউকে কাঠি দিয়ে গুঁতালে যেমন বিরক্ত লাগে তেমনি করে কাউকে যেন বিরক্ত না করে। অন্যকথায় কাউকে খুঁচিয়ে বিরক্ত না করার কথা বলা হয়েছে। তরকারিতে অতিরিক্ত ঝোল দিয়ে টলটলে করলে বলা হয় “ঢল’র পানি”। ঢল’র পানি মানে জোয়ারের অঢেল জল বা প্লাবনের স্রোতের পানি। সস্তা ধরনের। এটা একধরনের রসিকতাও বটে। আবার কেউ যখন কারণে অকারণে কারও কথায় সায় দিয়ে তাকে অস্থির করে তোলে তখন বলতে হয়, ‘ তোঁওক ন মারিছ্’। তোঁওক মারা মানে হলো অঘটন ঘটাতে কারও মতে সায় দেওয়া।

ভাষা হলো বটগাছের মতো। বটের যেমন ঝুরি হয়, তেমনি ভাষারও ঝুরি হয়। ভাষা বহমান। ভাষার প্রাণ আছে। আমার জন্ম-জনপদের ভাষা আঘনের কনক ধানের মতোই সমৃদ্ধ। তার বর্ণে বর্ণে শেকড়ের ঘ্রাণ। এই ভাষায় মিশে আছে অগ্রজের ঘাম, পূর্বপুরুষের রক্তের টান। ভাষা একশব্দ থেকে আরেক শব্দে রূপ লাভ করে। আমার পূর্বপুরুষের ভাষার মাঝে অনন্য সমৃদ্ধি লুকিয়ে আছে। সেই সমৃদ্ধি আমাকে প্রতিনিয়ত নির্মাণ করে চলেছে খণ্ড খণ্ড করে অখণ্ড জীবনের রূপ দিয়ে। ( চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়