প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ০০:২২
মাদকের ভয়াবহতায় ভেঙ্গে পড়ছে সমাজ ব্যবস্থা
ফরিদগঞ্জে ছয় মাসেই মাদক মামলার সংখ্যা দ্বিগুণ

শিক্ষার্থীদের মাদকের বিষয়ে সচেতনতা ও মাদকের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া তাঁর কাছে আসা সম্প্রতি এক হতভাগ্য ভুক্তভোগী পিতার করুণ কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি জানান, তিন ছেলের পিতা হিসেবে গর্বিত থাকলেও বর্তমানে তিনি বড়ো ধরনের অশান্তিতে রয়েছেন। বড়ো ছেলে প্রবাসে এবং ছোট ছেলে ঢাকায় অবস্থান করায় তাদের নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সকল সুখ-শান্তি ধূলোয় মিশে গেছে মেজো ছেলেকে নিয়ে। এতোদিন ভালো থাকলেও গত দুমাস ধরে সে মাদকাসক্ত। মাদকের টাকার জন্যে সে পিতামাতাকে মারধর করছে। আর অত্যাচার সইতে না পেরে ইউএনও'র কাছে প্রতিকারের প্রত্যাশায় এসেছেন।
|আরো খবর
শুধু এই কাহিনীই নয়, উপজেলার বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের সকদি রামপুর এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সোহেল বেপারী নামে এক মাদক ব্যবসায়ী খুনের শিকার হন। ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার কাছিয়াড়া গ্রামে মাদকাসক্ত যুবক রিয়াজ উদ্দিন মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সুবিদপুর পূর্ব ইউনিয়নে মাদকের টাকার জন্যে এক যুবক মা-বাবাকে নির্যাতন করলে তারা বাড়িঘর থেকে পালিয়ে যান। উপজেলার চরদুঃখিয়া পূর্ব ইউনিয়নের সন্তোষপুর গ্রামে মাদকসেবীদের হামলায় নিরীহ জনগণ আহত হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছে। এ রকম অসংখ্য ঘটনা ফরিদগঞ্জের।
এভাবেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অসংখ্য পরিবার, ভেঙ্গে পড়ছে সামাজিক বন্ধন। প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মাদকের ভয়াল থাবায় কিশোর ও যুবসমাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। যার ফলে সমাজ ব্যবস্থায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
ফরিদগঞ্জ থানার তথ্য সূত্র মতে, ২০২৫ সালে উপজেলায় মাদক সংক্রান্ত মোট ৯৭টি মামলা দায়ের করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে ১৪৯ জন আসামিকে আটক করে পুলিশ। এই সংখ্যা ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২টি এবং আটক হয়েছে ১৭৩ জন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হলেও একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও সেবনের প্রবণতাও বেড়েছে। পুলিশ প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার করছে। পাশাপাশি একাধিক স্থানে আবাদকৃত গাঁজার গাছও জব্দ করা হয়েছে।
একই পরিবারের প্রায় সকলেই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার ঘটনাও রয়েছে। উপজেলা সদরে দুই সহোদরের ১১বার এবং তাদের পিতার একবার মাদকের কারণে জেলে যেতে হয়েছে। বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের একটি পরিবারের সকলে মাদকের সাথে জড়িত এমন অভিযোগ এনে থানার সামনে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাদকবিরোধী সভা-সমাবেশ হচ্ছে। পাশাপাশি রাতের বেলায় এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে আটক মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগর মাধ্যমেই মাদকের ভয়াবহতা মোকাবিলা করা সম্ভব। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদকাসক্তির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পারিবারিক কলহ, অশান্তি ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে অহরহ। মাদকাসক্ত সন্তানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে প্রায়শই পিতা-মাতাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হতে দেখা গেছে।
সচেতন মহলের দাবি, মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অনেক আসামি আটকের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, উপজেলায় মাদকের প্রবণতা বেড়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। তবে প্রশাসনের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। জনগণকে নিজেদের ঘর থেকেই মাদক নির্মূল অভিযান শুরু করতে হবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, মাদকের ভয়াল থাবায় সামাজিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোররা মাদকে ঝুঁকছে, যা আতঙ্কের বিষয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, গত বেশ কিছুদিন ধরে মাদকের ভয়াবহতা রোধে জনগণকে সচেতন হতে দেখছি, যা আশাব্যঞ্জক। এর সাথে মাদকের ছোবলে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








