সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১২:১৬

আমার ইব্বি, আমার সুপার হিরো

গালিবাহ্ মেহরাব খান
আমার ইব্বি, আমার সুপার হিরো

আজকে অনেক কথা বলবো আমার ইব্বিকে নিয়ে।

আমি সবসময় বিশ্বাস করি, একজন বাবা হয় একজন মানুষের চরিত্র গড়ে দেন, নয়তো নিজের সন্তানদের জীবনে এমন কিছু ক্ষত তৈরি করে যান, যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। আমার কাছে একজন ভালো বাবা হওয়ার প্রথম শর্ত হলো একজন ভালো স্বামী হওয়া। একজন খারাপ স্বামী কখনোই একজন ভালো বাবা হতে পারে না। অবশ্যই এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। তাই আমার মনে হয়, প্রতিটি মেয়ের নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ অনেকটাই, এর ওপর নির্ভর করে তার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে কীভাবে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টা এমন।

এই জায়গায় আমার মা অসাধারণ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্যই সৃষ্টিকর্তার ইশারা ছাড়া এমনটা সম্ভব নয়, তবে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে নিজের বিবেক আর বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করার সুযোগও দিয়েছেন।

যাই হোক, এবার বলি কেন আমি আমার মায়ের সেই সিদ্ধান্তকে এতো দারুণ বলছি।

আমার ইব্বি সম্পর্কে মা সবসময় বলে, “তোর বাপটা না একটা অদ্ভুত লোক।”

সত্যিই, লোকটা অদ্ভুত।

এই মানুষটার মতো আশাবাদী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তার সামনে পৃথিবীর কারও সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা যায় না। তার মতে, দুনিয়ার সব মানুষই ভালো। নিঃশব্দে মানুষের জন্যে করে যাওয়া একটা মানুষ। কোনোদিন কারও উপকার করলে তার মুখ থেকে সে কথা শোনা যায় না। আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি, আমার ইব্বি কোনোদিন কোনো মানুষের অপকার করেননি—অন্তত নিজের জানামতে বা সজ্ঞানে নয়, যতোদিন আমি তাকে দেখেছি।

নিজের রোগীদেরও তিনি মা-বাবা ছাড়া অন্য কিছু বলে ডাকেন না।

আমি এই মানুষটার ভালো মনটা খুব কাছ থেকে দেখেছি, বিশেষ করে তার চেম্বারে। যেভাবে তার রোগীরা তাকে ভালোবাসে, সেটা একবার নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মানুষের সঙ্গে তার ব্যবহার এতোটাই অমায়িক, অথচ নিজের ব্যক্তিত্বটাও তিনি সুন্দরভাবে ধরে রাখতে জানেন।

আমরা দুই ভাইবোনের মধ্যে কোনোদিন কোনো পার্থক্য করেননি তিনি। জানি, এই সময়ে এসে এমন কথা বলা হয়তো হাস্যকর শোনায়। অনেকে বলবে, এখন আর ছেলে-মেয়ের মধ্যে কে ভেদাভেদ করে?

হয়তো সত্যিই করে না।

কিন্তু আমার জন্যে আমার ইব্বি কী করেছে, সেটা আমি জানি, আর আমার আল্লাহ জানেন।

লোকটা আমার জন্য সত্যি সত্যি জীবন দিয়ে দিতে পারবে—আল্লাহ এমন দিন কখনও না আনুক।

ছোটবেলা থেকে আমরা সবাই মায়ের সান্নিধ্যে বড়ো হই বলে মায়ের কষ্টগুলো খুব কাছ থেকে দেখতে পাই। আর সত্যিই, মায়ের ত্যাগের কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু যতো বড়ো হচ্ছি, ততো বেশি ইব্বিকে বুঝতে শিখছি। কীভাবে পাখির ডানার নিচে আগলে রাখার মতো করে আমাদের সব ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করেছে, সেটা এখন একটু হলেও উপলব্ধি করতে পারি।

আমার ইব্বির অনেক গুণ আছে, সত্যিই।

সমাজের চোখে তিনি একজন ভালো চিকিৎসক, একজন ভালো মানুষ, একজন অমায়িক ব্যক্তি, একজন ভালো বন্ধু, একজন ভালো বাবা।

তবে তার অসংখ্য গুণের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় গুণ হলো—তিনি আমার মাকে যেভাবে ভালোবাসেন, যেভাবে সম্মান করেন।

আমি গর্ব করে বলতে পারি, এমন দিন যদি কখনো আসে—আল্লাহ মাফ করুন—যেদিন ইব্বিকে তার সন্তান আর তার স্ত্রীর মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে, তাহলে তিনি চোখ বন্ধ করে তার স্ত্রীকেই বেছে নেবেন।

একদিন ইব্বি আমাকে বলেছিল, “তোমার আর আমার সম্পর্ক তখনই ভালো থাকবে, মা, যখন তোমার আর তোমার মায়ের সম্পর্ক ভালো থাকবে। মায়ের সঙ্গে কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করো না, আব্বা। মা যতোই ভুল বলুক না কেন। তোমার বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসে, কিন্তু এটা তোমার বাবা কোনোদিন মেনে নেবে না। মাকে সবসময় সম্মান করবে।”

আমি জানি, ইব্বি মনে করে আমি আর ইলহাম আমাদের মাকে বেশি ভালোবাসি।

হয়তো সত্যিই তাই।

আর সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, এতে সে খুব খুশি।

কিন্তু ইব্বি, তোমাকেও আমরা অনেক ভালোবাসি।

তুমি হয়তো সেটা বুঝতে পারো, হয়তো পারো না। কিন্তু তোমার জন্য আমরা সত্যিই জীবন দিয়ে দিতে পারবো।

একদিন তোমাকে গর্বিত করতে আমি আমার সর্বোচ্চটা করবো, ইব্বি।

তুমি যেমন বাবা, যেমন স্বামী, যেমন মানুষ—সেটা নিয়ে আমরা সত্যিই গর্বিত।

ইলহামের সামনে তুমি যেভাবে একজন স্বামী এবং একজন বাবার আদর্শ তৈরি করে দিচ্ছো, সেটা আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে।

কেউ একজন ঠিকই বলেছিল, সব সুপার হিরো চাদর পরে না।

শুভ বাবা দিবস, আমার সুপার হিরো!

পুনশ্চ: লোকটা আবার দারুণ পরিপাটি করে পোশাকও পরে। তার স্টাইলের জুড়ি নেই!

গালিবাহ্ মেহরাব খান : ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটিতে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি পর্যায়ের সফোমোর (দ্বিতীয় বর্ষের) শিক্ষার্থী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়