প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩২
বাবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলা তাপস, সাফল্যের দিনে পাশে নেই সেই বাবা

বাবার হাত ধরে পথচলা শুরু, তাঁর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, আর মুখের কথাকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে এগিয়ে যাওয়া। সেই স্বপ্ন সত্যি হলেও পাশে নেই প্রিয় মানুষটি—এমন গল্প শুনতে হৃদয়ে এক বেদনাময় অনুভূতি জাগায়। অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের জীবনও তেমনই এক বেদনামিশ্রিত সাফল্যের গল্প। শৈশবে মাতৃহীন তাপস জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ কুমিল্লা আদালতের একজন সফল আইনজীবী। তবে যে বাবা সন্তানকে আইনজীবীর পোশাকে দেখার স্বপ্ন বুনেছিলেন, তিনি দেখে যেতে পারেননি স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তবুও কুমিল্লা আদালত প্রাঙ্গণে অ্যাডভোকেট তাপসের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন অদ্যাপি বেঁচে আছেন তাঁর বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার।
|আরো খবর
১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন তাপস চন্দ্র সরকার। তাঁর পৈত্রিক ভিটা চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার লামচরী উকিল বাড়ি। শিশুকালেই মাতৃহীন হওয়া তাপস মায়ের স্নেহের শূন্যতা বুকে নিয়েই বড় হয়েছেন। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় নানা প্রতিকূলতা পেরোলেও তাঁর আসল প্রেরণা ছিলেন বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার। কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির প্রবীণ সদস্য নিখিল চন্দ্র স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন আইনজীবী হবে।
বাবার এই প্রত্যাশাই তাপসের পথচলার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ভাগ্য বড় নির্মম; সন্তান যখন বাবার স্বপ্নপূরণের চূড়ান্ত ধাপে, ঠিক তখনই ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ইহলোকের মায়ামমতা ত্যাগ করেন নিখিল চন্দ্র সরকার।
বাবার বিয়োগের পর সেই স্বপ্নকেই সংকল্প বানিয়ে এগিয়ে যান তাপস। অবশেষে অর্জিত হয় বহু কাঙ্ক্ষিত সাফল্য—তিনি হন আইনজীবী। তবে সাফল্যের এই আনন্দের দিনে পাশে ছিলেন না মূল কাণ্ডারি।
শিক্ষাজীবনে তাপস চন্দ্র সরকার ১৯৯৫ সালে মতলব উত্তর উপজেলার ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৯৭ সালে কুমিল্লা অজিত গুহ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি এবং ২০০০ সালে নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে কুমিল্লা আইন কলেজ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন।
শুধু সনদ লাভেই থমকে থাকেননি তিনি। কুমিল্লার সাবেক জেলা পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান লিটনের কাছে ফৌজদারি এবং সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ নূরুল আমিন ভূইয়ার অধীনে দেওয়ানি মামলার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০১৬ সালের ১৪ মে বার কাউন্সিলের সনদ পেয়ে ওই বছরই ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দেন তাপস।
আইন পেশায় আসার আগে দীর্ঘদিন তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সাংবাদিকতার সেই অভিজ্ঞতা তাঁর বর্তমান পেশাগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী রিতা রাণী মজুমদার, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কুমিল্লা শহরের কালিয়াজুরীতে বসবাস করছেন তাপস। আইন পেশার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে থাকে সন্তানের কর্মে। কুমিল্লা আদালতের আঙিনায় তাপস চন্দ্র সরকারের প্রতিটি অর্জন যেন বাবার প্রতি তাঁর এক নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি। সন্তান হিসেবে পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করে তিনি আজ সফল, যা অনুপ্রেরণা যোগায় হাজারও তরুণকে।








