বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৭

অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সেতুবন্ধন: চাঁদপুরের নতুন স্বপ্ন!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সেতুবন্ধন: চাঁদপুরের নতুন স্বপ্ন!

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় এবং তার সামগ্রিক অগ্রগতির সবচেয়ে টেকসই ও নৈর্ব্যক্তিক পরিমাপক হলো তার উচ্চশিক্ষার গভীরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সন্ধিক্ষণে, প্রথাগত তত্ত্বীয় শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রায়োগিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশই জাতীয় টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। এই মহোত্তম লক্ষ্যকে ধারণ করেই মেঘনা-ডাকাতিয়া-পদ্মার পললবিধৌত ও ঐতিহ্যের স্মারক চাঁদপুরের বুকে সগৌরবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ (চাঁবিপ্রবি)। প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই এই বিদ্যাপীঠকে ঘিরে চাঁদপুরবাসীর লালিত স্বপ্নের ক্যানভাসটি অত্যন্ত সুবিশাল। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির নীতিনির্ধারণী, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ চূড়া—‘সিন্ডিকেটে’ চাঁদপুর-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ এবং চাঁদপুর-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মোঃ জালাল উদ্দিন-এর অন্তর্ভুক্তি সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার আঙিনায় এক নব্য ও গতিশীল মাত্রা যোগ করেছে।

জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার কর্তৃক প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী এই দুই বরেণ্য গণপ্রতিনিধিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে মনোনয়ন প্রদানের সিদ্ধান্তটি কেবল সময়োপযোগীই নয়, बल्कि চাঁবিপ্রবি’র ভবিষ্যৎ রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে একটি মাইলফলক বা 'টার্নিং পয়েন্ট' হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

নীতিনির্ধারণী পর্ষদে গণপ্রতিনিধিত্ব: প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও লোকায়ত সংযোগের রাসায়নিক রূপান্তর

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, প্রশাসনিক গতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ অর্জনের সর্বোচ্চ ভরসাস্থল এবং নীতিনির্ধারণের সুতিকাগার হলো তার সিন্ডিকেট সভা। অ্যাকাডেমিক নীতি নির্ধারণ, বার্ষিক বাজেট অনুমোদন এবং সামগ্রিক শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুভার ন্যস্ত থাকে এই মহতী পরিষদের ওপর। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রায়শই দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী সংস্থায় কেবল প্রথাগত অ্যাকাডেমিক ব্যক্তিত্ব কিংবা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর একমুখী প্রাধান্য বজায় থাকে। ফলশ্রুতিতে, প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময়ই স্থানীয় বাস্তবতা, মাটির টান এবং জনমানুষের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একপ্রকার শীতল দ্বীপে পরিণত হয়। কিন্তু একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনো নির্দিষ্ট জনপদে গড়ে ওঠে, তখন সেই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের প্রধান অনুঘটক হিসেবে তাকে কাজ করতে হয়। আর ঠিক এখানেই অপরিহার্য হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী গণ-নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

জনআকাঙ্ক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন: স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ প্রতিনিয়ত জনগণের হৃদস্পন্দন ও প্রান্তিক চাহিদার মুখোমুখি হন। চাঁদপুর অঞ্চলের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজের আধুনিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, চরাঞ্চল ও নদীকূলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার আধুনিকীকরণ এবং প্রায়োগিক গবেষণার মেলবন্ধন কীভাবে ঘটানো সম্ভব—তা এই বরেণ্য জনপ্রতিনিধিদ্বয়ের চেয়ে নিবিড়ভাবে আর কারো অনুধাবন করার কথা নয়।

অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক বৃত্তচ্ছেদ: যেকোনো নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম ও প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ হলো ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ। এই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াগুলোকে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করতে রাজনৈতিক ওজন ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় নীতিনির্ধারণী মহলে এই দুই হেভিওয়েট সংসদ সদস্যের কার্যকর তৎপরতা ও তদবির বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত নির্মাণকে অভাবিত গতি দেবে。

সামাজিক অংশীদারিত্বের নবদিগন্ত: বিশ্ববিদ্যালয় যেন কেবল শ্রেণিকক্ষ আর ল্যাবরেটরির চারদেয়ালে বন্দি না থাকে, বরং তা যেন চাঁদপুরের আপামর সাধারণ মানুষের নিজস্ব আবেগ ও স্বাধিকারের জায়গায় পরিণত হয়, সেই সামাজিক মালিকানা ও মেলবন্ধন রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্বটি এখন এই দুই কৃতি ব্যক্তিত্বের কাঁধে অর্পিত হলো।

উচ্চশিক্ষার মহত্তম লক্ষ্য কেবল কিছু দক্ষ প্রযুক্তিবিদ বা গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়, বরং এমন এক সংবেদনশীল, দেশপ্রেমিক ও মননশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা—যারা আগামী দিনে রাষ্ট্রকে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেবে। চাঁবিপ্রবি’র নবগঠিত এই সিন্ডিকেট সেই সুনাগরিক তৈরির প্রধান সূতিকাগার হবে।

আগামীর প্রত্যাশা: আমাদের যৌক্তিক দাবি ও স্বপ্নের রূপরেখা

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা কেবল সনাতনী সনদ বিতরণের কোনো প্রাণহীন কারখানা হিসেবে দেখতে চাই না। আমরা একে দেখতে চাই আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম এক অনন্য জ্ঞানকোষ ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে। এই শুভক্ষণে নব মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্যদ্বয়ের কাছে চাঁদপুরবাসীর গভীর ও যৌক্তিক কিছু প্রত্যাশা রয়েছে:

১. স্মার্ট ও আন্তর্জাতিক মানের গ্রিন ক্যাম্পাস: চাঁবিপ্রবি’র প্রস্তাবিত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব বা গাফিলতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করা। শতভাগ স্বচ্ছতা ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলী বজায় রেখে একে একটি পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ হিসেবে গড়ে তোলার রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা।

২. চাঁদপুরের ভৌগোলিক গুরুত্ব ও ফলিত গবেষণা: চাঁদপুরের অনন্য ভৌগোলিক আবহকে কাজে লাগিয়ে নদীভাঙন রোধে সিভিল ও হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আধুনিক গবেষণা, রূপালি ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষায়িত জেনেটিক্যাল মৎস্য গবেষণা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করবে এমন আধুনিক প্রযুক্তিগত গবেষণা উইং বা 'সেন্টার অব এক্সেলেন্স' প্রতিষ্ঠায় সুদূরপ্রসারী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

৩. শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ (Industry-Academia Linkage): বৈশ্বিক জব মার্কেটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কারিকুলাম উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সরাসরি ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সংযোগ স্থাপনে নীতিনির্ধারণী স্তরে সহযোগিতা প্রদান।

উপসংহার

শিক্ষা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এই অনন্য যুগলবন্দি ‘চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২০’-এর মূল আত্মাকে আরও শক্তিশালী ও সংহত করবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নব মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ এবং জনাব মোঃ জালাল উদ্দিনের যৌথ মেধা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং মাটির প্রতি পরম দায়বদ্ধতা চাঁবিপ্রবি-কে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষা মানচিত্রে এক অনন্য ও ঈর্ষণীয় মর্যাদার আসনে আসীন করবে। মেঘনাপাড়ের প্রতিটি মানুষের এই বিশ্বাস আজ ধ্রুব ও অটল।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়