প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:২৩
ফরিদগঞ্জে ধানের শীষের দুর্গে চিংড়ির হানা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়ো পরিবর্তন এসেছে। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ্ব এমএ হান্নান চিংড়ি প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
|আরো খবর
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত এ আসনটি বরাবরই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজয়ের নজির ছিলো না বললেই চলে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙ্গে গেছে।
এ আসনে মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএ হান্নান (চিংড়ি), বিএনপি মনোনীত প্রার্থী লায়ন মো. হারুনুর রশীদ (ধানের শীষ) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বিল্লাল হোসেন মিয়াজী (দাঁড়িপাল্লা)-এর মধ্যে।
স্থানীয় প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভোট বিভাজনই ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। ধানের শীষের দলীয় প্রার্থী থাকলেও সাবেক উপজেলা আহ্বায়ক এমএ হান্নানের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণে দলীয় ভোট দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মাঠ পর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও স্পষ্টভাবে দু শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
স্থানীয় একাধিক নেতার মতে, ভোটের আগেই বোঝা যাচ্ছিলো বিএনপির ভোট ভাগ হবে। এই বিভাজনই শেষ পর্যন্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
সাধারণ ভোটারদের অনেকে মনে করেন, এমএ হান্নান দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে দলীয় প্রতীক না থাকলেও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তাঁর পক্ষে কাজ করেছে।
ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার এক প্রবীণ ভোটার জহিরুল ইসলাম বলেন, তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় প্রতীক না থাকলেও মানুষ ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করেছে। অপরদিকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী লায়ন মো. হারুনুর রশীদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার একক আধিপত্যের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত ছিলো। দলীয় সিদ্ধান্ত ও মাঠ পর্যায়ের সমন্বয় ঘাটতির কারণে অনেক নেতা-কর্মীর মাঝে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের ধারণা, এই অসন্তোষ সংগঠনের ভেতরে নীরব প্রভাব ফেলেছে, যা ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
নির্বাচনের আগে এমএ হান্নানের নির্বাচনী প্রচারণায়ও চিংড়ির সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনাও ভোটারদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়। তার 'শেষবারের মতো নির্বাচনে অংশ নেয়ার’ ঘোষণাও এক ধরনের আবেগঘন আবেদন তৈরি করে। এ বিষয়গুলো সাধারণ ভোটারদের মনে প্রভাব ফেলেছে এবং সহানুভূতির ঢেউ তৈরি করেছে।
নির্বাচনের ফলাফলে এমএ হান্নান ৭৪ হাজার ১৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লায়ন মো. হারুনুর রশীদ পান ৬৯ হাজার ১৫৫ ভোট। ব্যবধান দাঁড়ায় ৫ হাজার ২০ ভোট। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বিল্লাল হোসেন মিয়াজী পান ৬৬ হাজার ৬৯২ ভোট। আট প্রার্থীর মধ্যে অপর পাঁচজন প্রয়োজনীয় ভোটের এক অষ্টমাংশ অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ফরিদগঞ্জের রাজনীতিতে এই ফলাফলকে ‘পরিবর্তনের বার্তা’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। দীর্ঘদিনের একটি শক্ত রাজনৈতিক ঘাঁটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এ ফলাফল দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক সংহতি ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্ব নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনের এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সংগঠন ও ভোট ব্যবস্থাপনা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।








