প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৬
চাঁদপুর জেলা যুবদল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও আন্দোলন-সংগ্রামের চালচিত্র

চাঁদপুর মহকুমা থাকাকালীন সময়েই চাঁদপুর জেলা যুবদলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মরহুম হাবিবুল্লা চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা নিজামউদ্দিন, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক শাহজাহান ও মোজাম্মেল হোসেন খানের হাত ধরে চাঁদপুর জেলা যুবদলের ভিত রচিত হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমান যুবদল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চাঁদপুরের যুবনেতারা জেলা যুবদল গঠনের উদ্যোগ নেন।
১৯৭৯ সালে চাঁদপুর শহরের পালবাজারে হাবিবুল্লা চৌধুরীর বাসভবনে যুবদলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় চাঁদপুর মহকুমা বিএনপির সভাপতি ছিলেন ক্যাপ্টেন করিমউদ্দিন (বর্তমানে মরহুম) এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অ্যাডভোকেট শেখ মতিউর রহমান (বর্তমানে মরহুম)। ১৯৭৯ সালে চাঁদপুর টাউন হলে আয়োজিত সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। ওই সম্মেলনে হাবিবুল্লা চৌধুরী সভাপতি, সাখওয়াত হোসেন সহ-সভাপতি এবং অধ্যাপক শাহজাহান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত যুবমন্ত্রী আবুল কাশেম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ। পরবর্তীতে এই কমিটি ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এবং চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ও অনুমোদন দেয়।
পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সামরিক সরকার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দিলে, চাঁদপুরের একদল সাবেক ছাত্রনেতা ও যুবদল সদস্য চাঁদপুর সরকারি কলেজের বাস্কেটবল মাঠে বসে চাঁদপুর জেলা যুবদলের ১১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট এ কে এম সলিম উল্যা সেলিম। সদস্যরা হলেন—মুনির চৌধুরী, সফিকুর রহমান ভূঁইয়া, শহিদুল ইসলাম মুকু, মিজানুর রহমান পাটওয়ারী, দুলাল গাজী, হারুনুর রশিদ মোল্লা, মাহমুদ সফিক, হাবিবুর রহমান হাবু, মান্নান মন্টু ও জসিমউদ্দিন।
পরবর্তীতে জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি শেখ মতিউর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক শফিউদ্দিন আহমদের সুপারিশক্রমে, কেন্দ্রীয় যুবদলের দপ্তর সম্পাদক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় চাঁদপুর শহরের সরকারি কলেজ সংলগ্ন সাবেক আকবরী হোটেলে বসে ১৯৮৪ সালে এই আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেন। এরপর এই কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রস্তুত করা হয়।
তৎপরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে চাঁদপুর টাউন হলে সম্মেলনের মাধ্যমে অ্যাডভোকেট সলিম উল্যা সেলিমকে সভাপতি, মুনির চৌধুরীকে সিনিয়র সহ-সভাপতি, সফিকুর রহমান ভূঁইয়াকে সাধারণ সম্পাদক এবং শহিদুল ইসলাম মুকুকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ওই সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তখনকার সেই জেলা যুবদল কমিটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং ৭ দল ও ১৪ দলের যুব ঐক্য কমিটি গঠন করে। ওই ঐক্য কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট সলিম উল্যা সেলিম।
১৯৮৭ সালে খান দেলোয়ারকে আহ্বায়ক করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলে অ্যাডভোকেট সলিম উল্যা সেলিমকে সেটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চাঁদপুর জেলা যুবদলের কার্যক্রমকে সুচারুভাবে পরিচালনার স্বার্থে ১৯৮৯ সালে জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মুনির চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই কমিটির নেতৃত্বেই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ১৯৯৩ সালে চাঁদপুর শহিদ মিনার বালুর মাঠে যুবদলের পুনরায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন সাবেক সংস্থাপনমন্ত্রী মরহুম নুরুল হুদা, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। ওই সময়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটাভুটির মাধ্যমে মুনির চৌধুরী সভাপতি, সফিকুর রহমান ভূঁইয়া সাধারণ সম্পাদক এবং হুমায়ুন কবির প্রধান সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই কমিটির মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদিত হয়, যার মেয়াদ ছিলো ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত।
পরবর্তীতে সফিকুর রহমান ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয় এবং তাঁরাও প্রতিটি উপজেলায় কমিটি অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে সেই আহ্বায়ক কমিটি চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি হাইস্কুল মাঠে সম্মেলনের আয়োজন করে, যেখানে সফিকুর রহমান ভূঁইয়া সভাপতি এবং কাজী গোলাম মোস্তফা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই কমিটি ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে। এরপর সফিকুর রহমান ভূঁইয়া পুনরায় আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটি শাহজালাল মিশনকে সভাপতি, আফজাল হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক এবং মোফাজ্জল হোসেন চান্দুকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয়। এরপর ২০১৮ সালের ১৩ জুন কেন্দ্রীয় যুবদলের নেতৃবৃন্দ মোফাজ্জল হোসেন চান্দুকে সভাপতি, মানিকুর রহমান মানিককে সিনিয়র সহ-সভাপতি, অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশকে সাধারণ সম্পাদক, কামাল হোসেনকে যুগ্ম সম্পাদক এবং ফয়সাল আহমেদ বাহারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট শীর্ষ কমিটি অনুমোদন করেন। পরবর্তীতে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা যুবদলের নেতৃবৃন্দ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন।
রাজপথের লড়াকু সৈনিক ও জেলা যুবদলের সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন চান্দুর অকাল মৃত্যুর পর, ২০১৯ সালের ১৭ জুন থেকে সিনিয়র সহ-সভাপতি মানিকুর রহমান মানিক ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে মানিকুর রহমান মানিক সভাপতি, অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশ সাধারণ সম্পাদক এবং ফয়সাল আহমেদ বাহারের সাংগঠনিক নেতৃত্বে চাঁদপুর জেলা যুবদল অত্যন্ত গতিশীল ও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে চলেছে।
আজ ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি সংগঠনটির উত্তরোত্তর সাফল্য ও সফলতা কামনা করছি।
বি. দ্র. এই তথ্যগুলো জেলা যুবদলের সাবেক নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে সংগ্রহ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো সিনিয়র নেতার নাম কিংবা তথ্যে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে লেখকের প্রতি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি রাখবেন এবং আগামীতে জেলা যুবদলের যে কোনো ইতিহাস বা বিষয় নিয়ে সংশোধনের সুযোগ রাখবেন বলে বিশ্বাস করি।
লেখক : আইন বিষয়ক সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা যুবদল; সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি), চাঁদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত।






