প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০
রহিম বাদশার এমন সফর আঞ্চলিক পত্রিকার জন্যে খুবই মর্যাদাপূর্ণ

একটি আঞ্চলিক পত্রিকার সম্পাদক যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মতো বিশ্বমঞ্চের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব নিয়ে দেশের বাইরে যান, তখন সেটি নিছক একজন সাংবাদিকের বিদেশ সফরের খবর থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একটি অঞ্চলের গণমাধ্যমের মর্যাদা, আঞ্চলিক সাংবাদিকতার সক্ষমতা এবং সর্বোপরি দেশের সংবাদপত্র শিল্পের বহুমাত্রিক শক্তির পরিচয়। দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও বাংলাভিশনের চাঁদপুর প্রতিনিধি রহিম বাদশার দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সংবাদ সংগ্রহে নিউইয়র্ক সফর তাই চাঁদপুরের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি দেশের আঞ্চলিক সংবাদপত্রের জন্যও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ঘটনা।
রহিম বাদশার এই সফরের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এটি তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার ধারাবাহিক স্বীকৃতি। ১৯৯৭ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এই সাংবাদিক এর আগে ২০২৩ সালে জাতিসংঘের ৭৮তম সাধারণ অধিবেশনের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। তারও আগে জাপানে রাষ্ট্রীয় সফর, কানাডায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন, ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কো ও বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন, তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা এক দিনের বা আকস্মিক কোনো অর্জন নয়; এটি দীর্ঘ পেশাগত পথচলার ফল।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—সাংবাদিকতার যোগ্যতা ও সক্ষমতার মূল্যায়ন কি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বড় একটি অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন চ্যানেল ও বড় অনলাইন সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশের প্রধান কার্যালয় রাজধানীতে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় পর্যায়ের পরিচিতি ও সুযোগের বড় অংশও রাজধানীকেন্দ্রিক গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে যায়। কিন্তু দেশের সাংবাদিকতার বাস্তব চিত্র এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে এমন অনেক সম্পাদক ও সাংবাদিক রয়েছেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে সংবাদপত্র প্রকাশ, সংবাদ সংগ্রহ, সাংবাদিক সংগঠন পরিচালনা এবং জনস্বার্থের নানা বিষয় তুলে ধরার কাজ করে আসছেন। তাঁদের অনেকে যোগ্যতায় জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সম্পাদক বা সাংবাদিকদের সমতুল্য। কারও কারও অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের কাজের ব্যাপ্তি হয়তো আরও বিস্তৃত। কিন্তু তাঁদের পরিচিতি অনেক সময় তাঁদের কর্মক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে জাতীয় আলোচনায় যথেষ্ট জায়গা করে নিতে পারে না।
রহিম বাদশার এই সফর সেই প্রচলিত ধারণার সামনে একটি বাস্তব উদাহরণ হাজির করেছে। চাঁদপুরের একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হয়েও তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনের সংবাদ সংগ্রহ করছেন। এটি প্রমাণ করে, সংবাদপত্রের ভৌগোলিক পরিসর একজন সম্পাদকের পেশাগত সামর্থ্যের সীমা নির্ধারণ করে না।
আঞ্চলিক সাংবাদিকতার ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। কুমিল্লার সাপ্তাহিক আমোদ-এর সম্পাদক ফজলে রাব্বী রাষ্ট্রীয় সফরে গণমাধ্যম প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়ে আঞ্চলিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সক্ষমতাকে জাতীয় পরিসরে দৃশ্যমান করেছিলেন। তাঁর মতো সাংবাদিকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশগ্রহণের ঘটনা দেখিয়েছে—আঞ্চলিক গণমাধ্যমে কাজ করা মানেই পেশাগত সক্ষমতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা নয়। বরং বাস্তবতা হলো, একটি আঞ্চলিক পত্রিকা চালানো অনেক ক্ষেত্রেই একজন সম্পাদককে একসঙ্গে বহু দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করে। তাঁকে সংবাদ নির্বাচন করতে হয়, সম্পাদনা করতে হয়, মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়, পাঠকের চাহিদা বুঝতে হয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের নানা স্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয় এবং সীমিত সম্পদে একটি প্রকাশনা টিকিয়ে রাখতে হয়। এই অভিজ্ঞতা একজন সম্পাদককে বহুমাত্রিকভাবে দক্ষ করে তুলতে পারে।
রহিম বাদশার বর্তমান সফর তাই শুধু ‘চাঁদপুর প্রবাহ’-এর সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংবাদপত্রগুলোর জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা। রাজধানীর বাইরে থেকেও একজন সাংবাদিক আন্তর্জাতিক সংবাদ কাভারেজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন—এই বাস্তবতাটি আরও দৃশ্যমান হলো তাঁর মাধ্যমে। তবে এই অর্জনকে ব্যক্তিগত গৌরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর তাৎপর্য কমে যাবে। বরং এটি থেকে আমাদের সংবাদমাধ্যমের নীতিনির্ধারক, সম্পাদকীয় নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বিষয় নতুন করে ভাবা দরকার—আঞ্চলিক গণমাধ্যমের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা যায় কীভাবে।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু জাতীয় সাংবাদিকতার শক্তি কেবল রাজধানীর সংবাদকক্ষ দিয়ে তৈরি হয় না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন যে অসংখ্য সংবাদ, মানুষের কথা, স্থানীয় বাস্তবতা ও জনজীবনের চিত্র উঠে আসে, সেগুলোও জাতীয় সাংবাদিকতার ভিত্তি নির্মাণ করে। সেই ভিত্তি নির্মাণে আঞ্চলিক সম্পাদক ও সাংবাদিকদের অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।
রহিম বাদশা দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর এই সফর সফল হোক—এটি যেমন প্রত্যাশা, তেমনি তাঁর পেশাগত অর্জন থেকে আঞ্চলিক সাংবাদিকতার বৃহত্তর সম্ভাবনাকে সামনে আনার উদ্যোগও প্রয়োজন।
আঞ্চলিক সংবাদপত্রের সম্পাদক মানেই কেবল একটি জেলা বা অঞ্চলের সংবাদপত্রের সম্পাদক—এই সীমিত ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত সততা ও কাজের স্বীকৃতিই হওয়া উচিত একজন সাংবাদিকের পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। রহিম বাদশার নিউইয়র্ক সফর সেই সত্যটিই আবারও মনে করিয়ে দিল।
আঞ্চলিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের অনেকেই যোগ্যতায় জাতীয় গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সমতুল্য—কেউ কেউ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও কাজের পরিধিতে আরও এগিয়েও থাকতে পারেন। প্রয়োজন শুধু সেই যোগ্যতার যথাযথ স্বীকৃতি ও বৃহত্তর পরিসরে কাজের সুযোগ। রহিম বাদশার এমন সফর তাই আঞ্চলিক পত্রিকার জন্য সত্যিই খুবই মর্যাদাপূর্ণ।







