রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৪

ইকরাম চৌধুরীর স্মৃতি হোক অনির্বাণ

অনলাইন ডেস্ক
ইকরাম চৌধুরীর স্মৃতি হোক অনির্বাণ

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কর্মের আলো নিভে যায় না। সময়ের স্রোত তাঁদের শরীরকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, কিন্তু তাঁদের আদর্শ, সততা, সাহস ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে যায় পরবর্তী প্রজন্মের পথচলার অনুপ্রেরণা হয়ে। সাংবাদিক নেতা, দৈনিক চাঁদপুর দর্পণের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক এবং চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরাম চৌধুরী তেমনই এক স্মরণীয় নাম। গতকাল ছিলো তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আমরা স্মরণ করছি এই নির্ভীক সাংবাদিককে।

২০২০ সালের ৮ আগস্ট ভোরে দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে ইকরাম চৌধুরী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিলো মাত্র ৫৩ বছর ৯ মাস ২৩ দিন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন স্বামী, পিতা, ভাই ও স্বজনদের আপনজন; আর বৃহত্তর পরিসরে তিনি ছিলেন চাঁদপুরের সাংবাদিক সমাজের একজন পরিচিত মুখ ও নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর অকালপ্রয়াণ শুধু তাঁর পরিবারকে নয়, চাঁদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনকেও অনেক শূন্য করে দিয়েছিলো।

একজন সাংবাদিকের প্রকৃত মূল্য কেবল তাঁর লেখা সংবাদে নয়; তিনি সাংবাদিকতাকে কীভাবে ধারণ করেছেন, মানুষের কথা বলার সাহস কতোটা দেখিয়েছেন এবং পেশাটিকে কতোটা মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে নিয়েছেন—তার মধ্যেই নিহিত থাকে তাঁর উত্তরাধিকার। ইকরাম চৌধুরীর জীবন সেই অর্থে মূল্যায়নের দাবি রাখে। স্থানীয় সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ প্রতিষ্ঠা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি অঞ্চলের মানুষের কথা বলার মঞ্চ তৈরি করা, জনস্বার্থের প্রশ্ন সামনে আনা এবং সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরার দায়িত্ব।

চাঁদপুরের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর নেতৃত্বও স্মরণযোগ্য। চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও ঐক্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সাংবাদিকতা যখন নানা চ্যালেঞ্জ, চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে, তখন একজন নেতার দায়িত্ব কেবল সাংগঠনিক পদে থাকা নয়; বরং সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, পেশার মর্যাদা রক্ষা করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। ইকরাম চৌধুরীর কর্মজীবন সেই দায়িত্ববোধের স্মারক হয়ে আছে। চাঁদপুর প্রেস ক্লাবকে অনৈক্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর অনেক ছাড় দেওয়া ও অসামান্য উদারতা সপ্রশংস অভিব্যক্তিতে বারবার উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে সাংবাদিকদের স্বার্থে অনেক বেশি দায়িত্ববোধের পরিচায়ক।

তাঁর মৃত্যুর সময়টি ছিলো এক কঠিন বাস্তবতার। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং পরবর্তী সময়ে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া তাঁকে শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিলো। তার ওপর ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে চিকিৎসার নানা সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছিলো। জীবনের শেষ দিনগুলোতে চিকিৎসার জন্যে তাঁর যে সংগ্রাম, তা ছিলো অত্যন্ত বেদনাবিধুর। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার ছয় বছর পর আজ তাঁর শারীরিক কষ্ট নয়, বরং তাঁর কর্ম ও অবদানই আমাদের স্মরণে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

মৃত্যু মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু আদর্শের নয়। তাই কোনো প্রয়াত সাংবাদিককে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় কেবল মিলাদ, দোয়া কিংবা স্মরণসভায় সীমাবদ্ধ থাকা নয়; তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবোধকে ধারণ করা। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, পেশাগত শৃঙ্খলা, সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা এবং মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতাই হতে পারে ইকরাম চৌধুরীর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

ইকরাম চৌধুরী আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কলমের সত্য, একজন সংগঠকের নেতৃত্ব এবং একজন মানুষের মানবিকতার যে স্মৃতি তিনি রেখে গেছেন, তা যেন বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়। চাঁদপুরের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষিত হোক, নতুন প্রজন্ম তাঁর কর্মজীবন থেকে শিক্ষা নিক—এই হোক আজকের প্রত্যাশা। মানুষ চলে যায়, কর্ম থেকে যায়। ইকরাম চৌধুরীর কর্মময় স্মৃতি তাই হোক অনির্বাণ-প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়