শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৯

শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতাই জরুরি

উজ্জ্বল হোসাইন
শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতাই জরুরি

সমাজের সবচেয়ে কোমল, নিষ্পাপ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাতা হলো শিশুরা। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার মান নির্ভর করে সেই দেশের শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের উপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শিশু রামিসা ধর্ষণ এবং চাঁদপুরে কিশোর ইয়াছিন হত্যার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে এর প্রকৃতি ও বিস্তার এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। শিশু রামিসার ধর্ষণের ঘটনা সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একটি কোমলমতি শিশুর ওপর এমন পাশবিকতা শুধু একজন অপরাধীর নয়, পুরো সমাজের মানবিকতার প্রশ্ন তোলে।

একইভাবে চাঁদপুরে কিশোর ইয়াছিন হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—শিশুরা আজ কতটা অনিরাপদ। পরিবার, বিদ্যালয় কিংবা সমাজ—কোথাও যেন তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নেই।

এই ধরনের অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। একসময় পরিবার ছিল নৈতিক শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই বন্ধন অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকদের যোগাযোগ কমে গেছে, যার ফলে শিশুরা একাকিত্বে ভোগে এবং নানা ঝুঁকিতে পড়ে। অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যম ও প্রযুক্তির অপব্যবহারও শিশুদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনিরাপদ যোগাযোগ, অশ্লীল কনটেন্ট এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের সহজ প্রবেশাধিকার শিশুদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

শিশু সুরক্ষার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব পরিবারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নন। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে এসব বিষয়ে নজরদারির অভাব রয়েছে। অনেক সময় শিশু নির্যাতনের ঘটনা পরিবার থেকেই শুরু হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও উদ্বেগজনক। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে তারা কোনো সমস্যায় পড়লে সহজেই তা জানাতে পারে। শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি।

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও এর সঠিক প্রয়োগ অনেক সময় দেখা যায় না। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়।

শিশু রামিসা ও ইয়াছিন হত্যার মতো ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে। বিদ্যালয় শুধু শিক্ষার স্থান নয়, বরং শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্র। কিন্তু অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকদেরও শিশু সুরক্ষা বিষয়ে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

স্কুলে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।

শিশু সুরক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক তথ্য প্রচার, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান এবং অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচনের মাধ্যমে গণমাধ্যম সমাজকে সচেতন করতে পারে। এছাড়া সামাজিক সংগঠন, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করে নিয়মিত তদারকি করা যেতে পারে।

করণীয় ও সুপারিশ :

১. পরিবারে শিশুদের প্রতি বাড়তি নজরদারি ও মানসিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

২. শিশুদের যৌন শিক্ষা ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে।

৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

৪. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

৫. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৬. সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

৭. প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

শিশু রামিসা ধর্ষণ ও কিশোর ইয়াছিন হত্যার মতো ঘটনা আমাদের সমাজের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, আমরা আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। একটি সভ্য সমাজে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ—তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এজন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা। সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাহলে হয়তো একদিন আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে কোনো রামিসা ধর্ষণের শিকার হবে না, কোনো ইয়াছিন নির্মম হত্যার শিকার হবে না—বরং প্রতিটি শিশু নিরাপদ, সুন্দর ও স্বপ্নময় শৈশব পাবে। লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়