শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১০:৪৬

শিক্ষিত সন্তানের আড়ালে অমানবিকতার মুখ

নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের কী শেখায়?

উজ্জ্বল হোসাইন
নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের কী শেখায়?

সমাজে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা লালন করে আসছি শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, জ্ঞান মানুষকে মানবিক করে তোলে। আমরা বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত ও সমাজে সম্মানিত, সে নিশ্চয়ই নৈতিকতা ও মানবিকতার দিক থেকেও উন্নত। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চিত্র অনেক সময় এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যাওয়া নুরজাহান বেগমের মৃত্যু সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনে দিয়েছেÑশুধু শিক্ষিত হলেই কি মানুষ হওয়া যায়?

নুরজাহান বেগম, একজন মা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যে পরিণতির শিকার হয়েছেন তা শুধু একটি পরিবারের নয় বরং পুরো সমাজের জন্যে এক গভীর লজ্জা ও আত্মসমালোচনার বিষয়। সাত দিন পর একটি ফ্ল্যাট থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক বিষয় হলোÑতার সন্তানরা কেউই অশিক্ষিত বা অপ্রতিষ্ঠিত নয়। বরং তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষিত এবং সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের এক কঠিন সত্য উন্মোচিত হয়েছেÑশিক্ষা ও মানবিকতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে সেই শিক্ষা কখনোই মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে তুলতে পারে না।

নুরজাহান বেগমের সন্তানদের পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত ও সফল। একজন যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত, যিনি দীর্ঘদিন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। অন্য সন্তানেরাও বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত।

এই তথ্যগুলো একদিকে যেমন গর্বের, অন্যদিকে ঘটনাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে তা এক ভয়াবহ বৈপরীত্য তৈরি করে। প্রশ্ন জাগেÑএতো শিক্ষা, এতো সাফল্য, এতো সামাজিক অবস্থান থাকার পরও কীভাবে একজন মা অবহেলায় পড়ে থাকেন? কীভাবে তার মৃত্যুর সাত দিন পর্যন্ত কেউ খোঁজ নেয় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের বুঝতে হবেÑশিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো মানবিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা অর্জন করা। যখন শিক্ষা এই গুণগুলো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা কেবল একটি কাগুজে সনদে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের সমাজে পরিবারকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও ভালোবাসা আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। ‘মা’ শব্দটি আমাদের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রতীক।

কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনের কারণে পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সন্তানরা নিজেদের ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে যে, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ অনেক সময় উপেক্ষিত হয়ে যাচ্ছে। নুরজাহান বেগমের ঘটনাটি এই বাস্তবতারই এক নির্মম উদাহরণ। এখানে শুধু অবহেলা নয়, বরং একটি গভীর মানসিক দূরত্বের চিত্র ফুটে ওঠে। একজন মা, যিনি সন্তানদের বড়ো করতে জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন, সেই মা-ই জীবনের শেষ সময়ে একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন।এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সমাজের সামগ্রিক দায়বদ্ধতার অভাবকেও তুলে ধরে। একটি ফ্ল্যাটে একজন বৃদ্ধা সাত দিন ধরে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকেনÑএটি কি শুধু পরিবারের ব্যর্থতা? নাকি প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও কোনো দায়িত্ব রয়েছে?

আমাদের শহুরে জীবনে এখন মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, কী অবস্থায় আছেÑএসব জানার প্রয়োজনীয়তা আমরা আর অনুভব করি না। এই বিচ্ছিন্নতাই এমন ঘটনার জন্ম দেয়, যেখানে একজন মানুষ নিঃসঙ্গভাবে মৃত্যুবরণ করেন, আর কেউ তা টেরও পায় না। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত উন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা গঠনের বিষয়টি অনেকাংশে উপেক্ষিত। ফলে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, কিন্তু মানবিকভাবে দুর্বল।

নুরজাহান বেগমের সন্তানেরা এর একটি উদাহরণ। তারা শিক্ষিত, সফল, কিন্তু তাদের মধ্যে সেই মৌলিক মানবিকতা কোথায়, যা একজন সন্তানের মধ্যে থাকা উচিত?

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে দোষ কি শুধু ব্যক্তির, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও? যদি শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল ও মানবিক না করে, তবে সেই শিক্ষার উদ্দেশ্য কী?

মা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি অনুভূতি, একটি আশ্রয়, একটি নির্ভরতার জায়গা। একটি শিশু জন্মের পর থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপে মায়ের ভালোবাসা ও ত্যাগের ওপর নির্ভর করে বড়ো হয়। সেই মা-ই যখন জীবনের শেষ সময়ে অবহেলার শিকার হন, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং মানবতার পরাজয়। আমাদের সমাজে প্রায়ই বলা হয় “মা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে আপনজন।” কিন্তু এই কথাটি কি আমরা বাস্তবে পালন করি? নাকি এটি শুধু একটি আবেগপ্রবণ বাক্য হিসেবেই রয়ে গেছে?

নুরজাহান বেগমের ঘটনা আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই ধরনের ঘটনার পর সাধারণত আমরা আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলি। সত্যিই, যদি কোনো ধরনের অবহেলা বা অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু শুধুমাত্র আইন দিয়ে কি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব?

আইন মানুষকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু তাকে মানবিক করতে পারে না। এজন্যে প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতা।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের জন্যে একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনার মাধ্যমে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারি।

প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারে পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধ জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, সমাজে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে।

চতুর্থত, বৃদ্ধদের প্রতি যত্ন ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি একটি আয়নাÑযেখানে আমরা আমাদের সমাজের প্রকৃত চেহারা দেখতে পাই। এই আয়নায় আমরা দেখি, আমাদের শিক্ষা, আমাদের সাফল্য, আমাদের আধুনিকতাÑসবকিছুই অর্থহীন হয়ে যায়, যদি আমরা মানবিকতা হারিয়ে ফেলি।

প্রকৃত মানুষ হওয়া মানে শুধু সফল হওয়া নয়, বরং দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও মানবিক হওয়া। একজন মা যেন আর কখনো এমন অবহেলার শিকার না হনÑএটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

আসুন, আমরা শুধু শিক্ষিত না হয়ে প্রকৃত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি।

লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়