বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১০:১৮

গাউসে জামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহ.) :

ইশক্ব, ইলম ও তাসাউফের এক মহান পথিকৃৎ

কাজী শামছুদ্দিন
ইশক্ব, ইলম ও তাসাউফের এক মহান পথিকৃৎ

বাংলাদেশে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইতিহাসে যেসব মহামনীষীর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন গাউসে জামান হযরত সৈয়দ তৈয়্যব শাহ (রহ.)। তিনি ছিলেন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রহ.)-এঁর সুযোগ্য শাহজাদা এবং শরিয়ত-তরিকতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাকে ভক্ত মুরিদানগণ 'গাউসে জামান' ও 'মুর্শিদে বরহক' উপাধিতে স্মরণ করেন।

১৯১৬ সালে তিনি পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরীফে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ও মাতা উভয় দিক থেকেই তিনি একজন সৈয়্যদজাদা। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিকতার বিশেষ নিদর্শন প্রকাশ পেতে থাকে। ইসলামী জ্ঞানচর্চা, কুরআন তিলাওয়াত, তাসাউফ এবং মানবসেবার প্রতি ছিলো তাঁর গভীর অনুরাগ।

বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত গভীর। ১৯৪২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো এ বাংলাদেশে আগমন করেন। সে সময় পবিত্র রমজান মাসে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লাহ শাহী জামে মসজিদে খতমে তারাবীতে তিনি ইমামতি করেন। তাঁর সুললিত কেরাআত, তাকওয়া এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

১৯৫৮ সাল ছিলো তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ বছর চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দিন বাজারে শেখ সৈয়্যদ ক্লথ স্টোরে অনুষ্ঠিত খতমে গাউসিয়া মাহফিলে তিনি খেলাফতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। একই সঙ্গে আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার সংবিধান সংশোধনী কমিটির প্রধান এবং সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে অধিষ্ঠিত হন।

১৯৩৭ সালে চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে যে শরিয়ত-তরিকতের প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো, তা তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, আধ্যাত্মিক প্রেরণা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে এক মহাস্রোতে পরিণত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আহলে সুন্নাতের দাওয়াত, শিক্ষা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি করা হয়।

তিনি ছিলেন ইলম, আমল, ইখলাস ও রাসূলপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর বক্তব্য, ওয়াজ-নসিহত ও রূহানী মজলিসে মানুষ শুধু ধর্মীয় জ্ঞানই অর্জন করতো না; বরং নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবকল্যাণের শিক্ষা লাভ করতো। তাঁর জীবনাদর্শের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এঁর মহব্বত।

১৫ জিলহজ ১৪১৩ হিজরি, ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ সোমবার সকালে দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরীফে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরদিন তাঁকে সেখানেই সমাহিত করা হয়। তাঁর ঐতিহাসিক জানাজায় তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরীফসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ওলামা-মাশায়েখ এবং লাখো ভক্ত-মুরিদান অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এমন এক দূরদর্শী রূহানী নেতা, যিনি শুধু খানকাহভিত্তিক আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং উম্মাহর ঈমান, আকিদা, চিন্তা ও সাংগঠনিক শক্তিকে পুনর্জাগরণের জন্যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এঁর জুলুছের মাধ্যমে তিনি ঝিমিয়ে পড়া উম্মাহকে উজ্জীবিত করার এক প্রাণবন্ত আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন উম্মাহর সেবায় নিবেদিত একটি আদর্শিক ও সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে। ঢাকা কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজধানীতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের এক সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। আর 'তরজুমান'-এর মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তরুণ লেখক, গবেষক ও চিন্তাশীল কর্মীদের এক উর্বর ক্ষেত্র, যা আহলে সুন্নাতের আকিদা ও আদর্শ প্রচারের এক বলিষ্ঠ মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত।

এসবের পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষা, সাংগঠনিক উন্নয়ন, আধ্যাত্মিক সংস্কার, যুবসমাজকে সম্পৃক্তকরণ এবং আহলে সুন্নাতের আকিদা সংরক্ষণ ও প্রচারে তাঁর অবদান ছিলো অসামান্য। তাঁর প্রতিটি উদ্যোগে ছিলো উম্মাহর কল্যাণ, ঈমানের সুরক্ষা এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এঁর মহব্বতকে মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা।

তাঁর এই তাজদীদী ও সংস্কারমূলক কর্মধারা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্যে প্রেরণার উৎস। তাই বলা যায়, আল্লামা হাফেজ কারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.)-এঁর কাছে আহলে সুন্নাত ও সমগ্র উম্মাহ চিরকৃতজ্ঞ ও ঋণী হয়ে থাকবে। আজও গাউসে জামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহ.)-এর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, সুন্নিয়তের খেদমত, ইলমী অবদান এবং রূহানী ফয়েজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর মাকাম আরও বুলন্দ করুন এবং তাঁর ফয়েজ ও বরকত আমাদেরকে নসিব করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, আল-আযহার ইউনিভার্সিটি, মিশর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়