বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ০৬:২২

ক্ষমতার দম্ভ, মজলুমের অশ্রু ও মহাকালের অমোঘ আদালত!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
ক্ষমতার দম্ভ, মজলুমের অশ্রু ও মহাকালের অমোঘ আদালত!
ছবি : প্রতীকী

"আমাকে কষ্ট দিয়ে খোদার কাছে সুখ চাও? খোদা কিন্তু আমারও।"— উর্দূ সাহিত্যের বরপুত্র মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিবের এই একটিমাত্র অমর পঙক্তি কেবল কাব্যের অলঙ্কার নয়, বরং তা অবিনশ্বর এক মহাজাগতিক সত্যের নির্মম দর্পণ। সম্প্রতি ডিজিটাল পর্দার আলো-ছায়ায় এক টুকরো জীবনদর্শনে যখন এই অমোঘ বাণীটি নতুন করে প্রতিধ্বনিত হলো, তখন তা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক ও সুবিধাবাদী সমাজ মনস্তত্ত্বের মর্মমূলে এক তীব্র চপেটাঘাত হেনেছে। প্রাত্যহিক যাপিত জীবনে একদল মানুষ কত অবলীলায়, কত নিষ্ঠুরভাবে অন্যের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, অথচ নিজের জন্য ঠিকই পরম সুখ ও ঐশ্বরিক কল্যাণের প্রার্থনা করে! কিন্তু এই মহাবিশ্বের এক অলঙ্ঘনীয় নিয়ম রয়েছে, যেখানে প্রতিটি অন্যায়ের পেছনে জমা হয় এক অদৃশ্য প্রতিধ্বনি

ক্ষমতার দম্ভ ও নিয়তি:
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এই সত্য বারবার প্রমাণিত হয় যে, অত্যাচারীর রাজদণ্ড যতই শক্তিশালী হোক না কেন, নিপীড়িত ও সর্বস্বান্ত মানুষের চোখের জলের কাছে তা শেষ পর্যন্ত খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই জনপদেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এক অলৌকিক নিয়তি। বছরের পর বছর ধরে চলা অবর্ণনীয় জুলুম, রূঢ় অন্যায় আর জুলুমের যাতাকলে পিষ্ট মানুষের বুক চেরা আর্তনাদ যখন আরশের দিকে ধাবিত হয়েছিল, তখন সেই পরম সৃষ্টিকর্তাই অহংকারী অত্যাচারীদের দুর্ভেদ্য ক্ষমতার মসনদ ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন। ৫ আগস্টের সেই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল না; তা ছিল মূলত অধিকারবঞ্চিত ও নিগৃহীত জনতার পুঞ্জীভূত কান্নার জবাবে প্রকৃতির এক অমোঘ এবং চূড়ান্ত আদালত।

মহাকালের চিরায়ত নিয়ম:
লৌকিকতার এই চকমকে ও স্বার্থան্ধ দুনিয়ায় ক্ষমতার অন্ধমোহে মত্ত একদল মানুষ ভাবেন, গোপনে কাউকে কাঁদিয়ে বা কারও সরল বিশ্বাসকে পদদলিত করে পার পেয়ে যাওয়া বুঝি খুব সহজ। চতুরতার জোরে তারা সাময়িক বিজয়ের অট্টহাসি হাসেন। কিন্তু যারা ভাবছেন ৫ আগস্টের পর ইতিহাস থমকে গেছে, তারা এক পরম ভ্রান্তির মধ্যে বাস করছেন। যে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা সেদিন ক্ষমতার দম্ভে নিষ্পেষিত আর্তমানবতার কান্নার জবাবে পরাক্রমশালী অত্যাচারীদের পতন ঘটিয়েছিলেন, সেই একই সৃষ্টিকর্তা আজও বর্তমান আছেন—তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হন না, বিস্মৃতও হন না। আজ যারা ক্ষমতার নতুন দম্ভে অন্ধ হয়ে, ডানে-বামে পুনরায় সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের স্টিমরোলার চালাচ্ছেন, নতুন রূপে মানুষের অধিকার হরণ করছেন, তাদের ভবিষ্যৎও যে একই রকম করুণ ও অনিবার্য পতনের পর্যবসিত হবে—তা তো মহাকালের চিরায়ত নিয়ম।

ঐশ্বরিক বিচার ও সত্য:
বাস্তবতা হলো, স্রষ্টা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শাসকের একক সম্পত্তি নন। তিনি যেমন লৌকিক বিজয়ের হর্ষধ্বনি শোনেন, তার চেয়ে অনেক বেশি শোনেন অন্যায়-অবিচারের শিকার হওয়া কণ্ঠহীন মানুষের বুক চেরা দীর্ঘশ্বাস। যখন কোনো নিরপরাধ মানুষের হৃদয় অন্যায়ভাবে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়, তখন তার ভেতরের গুমরে কাঁদা হাহাকার জাগতিক সব বাধা উপড়ে ফেলে সরাসরি আরশে গিয়ে আঘাত করে। আমরা অনেকেই মনে করি, ঐশ্বরিক বিচার কেবল হাত তুলে করা আনুষ্ঠানিক মোনাজাত বা প্রার্থনার শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রকৃত সত্য বড়ই গভীর ও রহস্যময়; পরম বিচারকের সূক্ষ্ম বিচার লুকিয়ে থাকে প্রতিটি ভাঙা বিশ্বাসের অন্তরালে, প্রতিটি নিগৃহীত মানুষের স্তব্ধতার মাঝে।

প্রকৃতির অমোঘ রায়:
কারও রাতকে চিরতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিয়ে, নিজের সকালকে কখনো আলোয় রাঙানো যায় না। অন্যের বিশ্বাস আর ভরসার ভিত ধূলিসাৎ করে নিজের জীবনে কখনোই স্থায়ী শান্তির প্রাসাদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ওষ্ঠাধরের উচ্চারিত উচ্চস্বরের ভণ্ড প্রার্থনার চেয়ে, স্রষ্টার দরবারে একটি ভাঙা হৃদয়ের নীরব আর্তনাদ অনেক বেশি দ্রুত পৌঁছায়। নতুন হোক কিংবা পুরাতন—সব স্বৈরাচার ও অত্যাচারীর জন্যই প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়ম প্রযোজ্য। জীবনের এই ঘূর্ণাবর্তে আমরা যদি কাউকে সুখ দিতে নাও পারি, অন্তত যেন কারও দুঃখের कारण না হই। কারণ, দুনিয়ার আদালতে যার কোনো সাক্ষী থাকে না, প্রকৃতির আদালতে তার জন্য স্বয়ং স্রষ্টাই বিচারক হিসেবে দাঁড়িয়ে যান। আর সেই আদালতের রায় যখন কার্যকর হয়, তখন তা খণ্ডানোর সাধ্য কোনো দম্ভেরই থাকে না।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়