শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১২:১৫

অপ্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
অপ্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ

বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ এক দুস্তর পারাবার। এত বিস্তৃত ও বিশাল সে ব্যাপ্তি, বাঙালির পক্ষে চাইলেও সে পারাবার পার হওয়া সম্ভব নয়। তাই রবীন্দ্রনাথ বাঙালির চিন্তারাজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন যাপন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই বিচরণ করেন অনায়াসে। যে বাঙালি ঘোরতর রবীন্দ্র-বিদ্বেষী সে-ও দিনে বেশ কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের নাম নিতে হয় মুখে মুখে। এই একবিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ এখনও সমান প্রাসঙ্গিক, যেমনটা প্রাসঙ্গিক ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীতেও। কিন্তু দিন যতো যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথকে না জেনে না বুঝে তার অহেতুক পিন্ডি চটকানোর ব্যায়ামেও মেতে উঠেছেন বেশ কয়েকটা গোষ্ঠী। তাদের এ রবীন্দ্র বিরোধিতা বা তাদের এ রবীন্দ্র পেষণের মূল কারণ কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ছোট করা নয়, বরং রবীন্দ্রনাথকে তুচ্ছ করার বালখিল্য দেখিয়ে নিজেকে বড়ো করে তোলার চটকদার প্রয়াস। হাটে-বাজারে-বন্দরে রবীন্দ্রনাথ এক আলোচ্য ব্যক্তিত্ব তাঁর অলোকসামান্য গুণাবলির জন্যে। কিন্তু কখনও কখনও রবীন্দ্রনাথ অপপ্রচারের নোংরায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে এসে পড়েন।

নতুন বৌঠান কাদম্বরীর সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো। দুজনেই ছিলেন কাছাকাছি বয়সী। রবির মা মারা যাওয়ার পর এবং কাদম্বিনী বউ হয়ে জোড়াসাঁকোতে আসার পর নিজেদের নিঃসঙ্গতায় দুজনে একে অপরের সহায় হয়ে ওঠেন। নতুন কিছু লিখলে রবির প্রথম পাঠক হতেন নতুন বৌঠান। আর নতুন বৌঠানও জ্যেতিরিন্দ্রনাথের নটী বিনোদিনীর প্রতি ঝুঁকে পড়ার অবকাশে কনিষ্ঠ দেবর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে নিজের সুখ-দুঃখের সখাকে খুঁজে পান। এ ছিলো নির্মল সখ্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে খুঁচিয়ে যারা রক্তাক্ত করতে চায়, যারা রবীন্দ্রনাথকে কাদম্বরীর আত্মহত্যার কারণ দেখিয়ে নিজেদের কৃতার্থ করতে চায় তাদের আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিকভাবেই রবীন্দ্রনাথ এসে পড়েন না চাইলেও।

যে সময়ে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন সে সময়ে সমাজে কিশোরী বিবাহপ্রথা হরদম চালু ছিলো। এ ধারা রবীন্দ্রনাথের বিয়ে ও তৎপরবর্তী তাঁর কন্যাদের বিয়ের ক্ষেত্রেও বর্তায়। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবেই রবীন্দ্র-বিদ্বেষীদের আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ এসে পড়েন নিজের বাল্যবিবাহ ও কন্যাদের বাল্যবিবাহের কারণে দোষী সাব্যস্ত হয়ে। এটা সত্যি যে বিবাহের সময় মৃণালিনী তথা ভবতারিণীর বয়স ছিলো নয় বছর নয় মাস দশ দিন। তবে বিয়ের সময় রবীন্দ্রনাথের বড়ো মেয়ে মাধুরীলতার বয়স ছিলো পনের বছর, মেজো মেয়ে রেণুকার বয়স ছিলো তেরো বছর এবং ছোট মেয়ে অতসীর বয়স ছিলো বাইশ বছর। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে না পারলেও রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের ক্ষেত্রে চেষ্টা করেছিলেন কিশোরী বয়স পার করে বিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু মেজো মেয়ের ক্ষেত্রে তার পড়াশুনায় অমনোযোগিতা কবিকে নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকতে দেয়নি।

রবীন্দ্রনাথের আরেক দোষ তিনি নাকি তাঁর রচনায় ও জীবনে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যে কোনো লেখা লেখেননি কিংবা কোনো সংযোগও রাখেননি। তাঁকে এখনও হিন্দু বলেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে গালাগাল শুনতে হয়। অথচ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সনাতন নয়, ব্রাহ্ম। নিরাকার ঈশ্বরবাদী। ঊনিশশো ছত্রিশ সালের সাতাশ ফেব্রুয়ারিতে ঈদুল ফিতরের এক শুভেচ্ছা বাণীতে তিনি নবীজীকে মহোত্তমদের মধ্যে অন্যতম বলে সম্বোধন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি তাঁর মুসলিম প্রজাদের মধ্যে একজনকে ট্রাক্টর চালানোর জন্যে প্রশিক্ষিত করে তোলেন। এমনকি তিনি এও বলেন, সাহা আর শেখদের মধ্যে কোনো ব্যবধান যেন না থাকে। তিনি রাখী বন্ধনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সুদৃঢ়তায় মনোযোগী ছিলেন। তিনি তাঁর হেঁশেলে নূরু মিয়া তথা গেদু মিয়াকে স্থান দিয়ে ব্রাহ্মণ পাচকদের কাছ থেকে এ তথ্য আড়ালে রাখেন যাতে নূরু মিয়ার কোনো ঝামেলা না হয়। পেটের ব্যামো হতে মুক্তি পেতে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেগরীর পাচক নূরুকে তিনি তাঁর হেঁশেলে নিয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারিতে মুসলিম প্রজাদের খাজনাও মওকুফ করেছিলেন। অথচ অপ্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে আজও গালমন্দ শুনতে হয় মুসলিম-বিদ্বেষী বলে।

রবীন্দ্রনাথ অপ্রাসঙ্গিকভাবে আবারো এসে পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বিষয়ক বিতর্কে। তাঁকে যারা দুচোখে দেখতে পারে না তারা বরাবরই বলে এসেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধী ছিলেন। অথচ যে সভার কথা বলা হয় তিনি সে সভায় সেদিন কলকাতাতেই ছিলেন না, তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। এ কথা রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পালের লেখায় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে। ঠিকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রনাথকে অতিথি হিসেবে নিয়ে যায় এবং ডিলিট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে। তিনি একে একে দুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি হন এবং 'দ্য রুল অব দ্য জায়ান্ট' ও 'দ্য মিনিং অব আর্ট বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। উপরন্তু ঊনিশশো চব্বিশ সালে নিজে চারু বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে তৎকালীন উপাচার্য পি. জে. হার্টগের কাছে সুপারিশ করে পাঠান ভালো বাংলা জানে বলে যাতে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চাকরি দেওয়া হয়। তারপরও তাঁকে অপছন্দকারীরা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় অলীক যুক্তিতে আর গায়ের জোর দিয়ে।

রবীন্দ্রনাথ অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার আরেকটা বড়ো ক্ষেত্র হলো রবীন্দ্র-নজরুলের অবাস্তব তুলনায়। অনেক অপোগণ্ড বাঙালি মনে করে নজরুলকে তিলে তিলে স্লো পয়জনিং করেই তবে রবীন্দ্রনাথ নিজের নোবেল পুরস্কার বাগিয়ে নেন। আর হাল আমলের নবীন এক সংসদ সদস্য তো বলেই ফেললেন, রবীন্দ্রনাথ নাকি বৃটিশদের তোষণ করে নোবেল বাগিয়ে নেন। অথচ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করে রবীন্দ্রনাথ ঊনিশশো ঊনিশ সালের এপ্রিলে বৃটিশদের নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। তাদের এসব অপ্রাসঙ্গিকতায় এটাই প্রমাণ হয়, যতোই মেঘ দিয়ে ঢাকা হোক না কেন, রবির কিরণ সে তো শাশ্বত। রবি জ্বলবেই তাঁর আপন মহিমায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়