প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১১:১৯
উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তেÑকতোটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দঁাড়িয়ে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, মান-নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিলুপ্ত করে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি সম্ভাব্য নীতিগত রূপান্তর, যা দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের ভিত্তি হতে পারে।
প্রস্তাবিত কমিশনের র্যাংকিং ব্যবস্থা, মানোন্নয়নে তদারকি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও একাডেমিক কার্যক্রমে শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতাÑসবই একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে নির্দেশনা অমান্য করলে অর্থায়ন স্থগিত বা প্রোগ্রাম বাতিলের ক্ষমতা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছেÑএই ক্ষমতার প্রয়োগ কতোটা স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত থাকবে?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বদলে বিকেন্দ্রীভূত, স্বশাসিত ও বহুমাত্রিক কাঠামো কার্যকর হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত কমিশনকে কেবল ক্ষমতাবান করলেই চলবে না, বরং এটিকে হতে হবে স্বাধীন, ডেটা-নির্ভর এবং অংশীজন-সম্পৃক্ত। অন্যথায় এটি ইউজিসির মতোই আরেকটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑমানোন্নয়ন কেবল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন গবেষণা-উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তার। প্রস্তাবিত কমিশনের কাঠামোয় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
অতএব, উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন একটি সাহসী পদক্ষেপ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপরÑপ্রথমত, প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা; দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কার্যপ্রণালী এবং তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চায়, তবে এই রূপান্তরকে কাগুজে পরিকল্পনার বাইরে এনে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দিতে হবে।
দেলোয়ার জাহিদ : মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক।
ছবি-১১
শ্রমিক বঁাচলে দেশ বঁাচবে
মো. তাইয়্যেব হোসাইন
আজ মহান মে দিবস। এ দিবসের প্রেক্ষাপট অধিকাংশ মানুষেরই জানা আছে। তাই ইতিহাসে না গিয়ে আমি বলতে চাই এই দিবসের সূচনা যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে হয়েছিল, তা আজ কতোটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছরই বিভিন্ন সময় বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দিকে কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য শ্রমিক প্রাণ হারান। রানা প্লাজা ধসের কথা তো সবারই মনে আছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে আছেন, তাদের বর্তমান অবস্থা কী? তাদের জীবনযাত্রার মান কেমন? সরকার কতোটুকু দায়িত্ব পালন করেছে? আর আমরা তাদের পাশে কতোটা দঁাড়িয়েছি?
সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়—২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ারের কারখানায়
লুটপাটের পর গেট বন্ধ করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয় । ১৮২ জন শ্রমিক নিখেঁাজ হয়। এই কারখানা সাবেক সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন হওয়ার কারণে কারখানায় আগুন দেয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ১৮২ জন শ্রমিক তো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়। এই শ্রমিকদের পরিবারের বর্তমান অবস্থা কী? তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ কী হবে? এদের মধ্যে চঁাদপুরের শাহাতলীর একজন শ্রমিকও ছিলেন। আজও তার মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। রেখে গেছেন স্ত্রী, দু সন্তান, মা-বাবা। তাদের বর্তমান অবস্থা কী? তাদের ভবিষ্যৎ কী?
বিলস (ইওখঝ)-এর প্রতিবেদন (১ জানুয়ারি - ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪) মোট নিহতের সংখ্যা : ৮২০ জন শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা : ৭০৭ জন। নির্যাতনে মৃত্যু : ১১৩ জন। আহত : ২৯২ জন। (সূত্র : প্রথম আলো)
২০২৫ সালের বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা : সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির (ঝজঝ) জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে ৭১৩টি দুর্ঘটনায় ৮০২ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৮৫ জন পরিবহন খাতে এবং বাকিরা নির্মাণ, কৃষি, ও অন্যান্য খাতে নিহত হয়েছেন।
পরিবহন খাতে দুর্ঘটনা : ২০২৫ সালে শুধুমাত্র পরিবহন খাতেই ৪৩৯ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনা : বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, এমন দুর্ঘটনা বারবার কেন ঘটে ? কারখানায় আগুন লাগে কীভাবে? নিরাপত্তার ঘাটতি কেন থেকেই যায়?
মে দিবসের মূল লক্ষ্য ছিলো শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা—নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সম্মানজনক জীবন। কিন্তু আজও আমরা দেখি শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা যায় ,ভবন ধসে প্রাণ হারায়, কর্মস্থলে নির্যাতনের শিকার হয়, নারী-পুরুষ সমান পরিশ্রম করেও সমান মজুরি পায় না, ঈদের আগে বেতন-বোনাসের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়, বকেয়া বেতন আদায়ে মানববন্ধন করতে হয়, শ্রমিকদের পরিবারগুলোও বঞ্চিত হয় মৌলিক অধিকার থেকে। অর্থের অভাবে তাদের সন্তানেরা শিক্ষার সুযোগ পায় না। অথচ এই শ্রমিকরাই দেশের চালিকা শক্তি। তারা থেমে গেলে থেমে যাবে দেশের অর্থনীতি। তাহলে প্রশ্ন জাগে এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্রেণি এতো অবহেলিত কেন? কে নিশ্চিত করবে তাদের অধিকার? কে এগিয়ে আসবে তাদের পাশে? দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক সাময়িক সাহায্য দিয়ে কি একটি পরিবার সারাজীবন চলতে পারে? একটি দুর্ঘটনার ক্ষত কি টাকার মাধ্যমে পূরণ হয়?
আসুন, আমরা সবাই শ্রমিকদের পাশে দঁাড়াই। তাদের প্রতি সহমর্মী হই। একটি কথা খুবই প্রচলিত-’শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করতে হবে।’ কিন্তু আমরা কি আজও তা করতে পারছি?
এই প্রশ্নটি আমাদের সবার বিবেকের কাছে রয়ে গেল।








