শুক্রবার, ০২ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৯

শেষ বিদায় যেমন চাই

মুফতী মুহা.আবু বকর বিন ফারুক
শেষ বিদায় যেমন চাই

মানুষের দুনিয়ার সব অর্জন, সাফল্য, অবস্থান ও সম্মান এক সময় থেমে যায়। একটি স্থানে গিয়ে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। সেই সমাপ্তির নাম মৃত্যু। কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না, কেউ তা ঠেকাতে পারে না। কুরআনে আল্লাহ তায়াআলা ঘোষনা করেছেন। “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)।

“যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে ধরবেই।” (সূরা নিসা, আয়াত ৭৮) অতএব মৃত্যু প্রত্যেক মানুষের জন্য নিশ্চিত পথচলা। কিন্তু মৃত্যু কি কেবলই শেষ? ইসলাম বলে না। মৃত্যু কোনো সমাপ্তির শেষ বিন্দু নয়; বরং মৃত্যু হলো এক নতুন জীবনের প্রবেশদ্বার, আখিরাতের চিরন্তন জীবনের সূচনা। তাই একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তার মৃত্যু যেন কল্যাণকর হয়, তার শেষ বিদায় যেন শান্তিময় হয়, তার দাফন যেন সুন্নাহসম্মত হয় এবং তার আখিরাত যেন সফলতার দিকে যাত্রা শুরু করে। কুরআন ও সহীহ হাদিস আমাদেরকে সেই কল্যাণকর “শেষ বিদায়”-এর আদর্শ রূপ শিখিয়ে দিয়েছে। আমরা সেই আলোচনাই এখানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবো।

১. মৃত্যু অনিবার্য তাই মুসলিমকে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে, মৃত্যু যেহেতু নিশ্চিত, তাই একজন বুদ্ধিমান মানুষ সেই অনিবার্য যাত্রার প্রস্তুতি আগে থেকেই নেয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি চিন্তা করুক সে আগামী দিনের (আখিরাতের) জন্য কী প্রস্তুত করে পাঠাচ্ছে।” (সূরা হাশর, আয়াত ১৮)। অতএব সুন্দর মৃত্যুর জন্য জীবিত অবস্থায় প্রস্তুতি নেওয়া ফরজ দায়িত্বেরই অংশ। সেই প্রস্তুতির প্রধান দিকগুলো হলো

ক) বিশুদ্ধ ঈমান : ঈমান ছাড়া মৃত্যু সুন্দর হতে পারে না। যে ব্যক্তি আল্লাহ, তঁার রাসূল (সা.), কিয়ামত ও আখিরাতের উপর দৃঢ় ঈমান রাখবে তার মৃত্যুই শান্তিময় হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে বলতে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ মুসলিম)। অতএব শেষ বিদায় কল্যাণকর করতে হলে ঈমানকে বিশুদ্ধ রাখা আবশ্যক।

খ) নেক আমলের জীবন : কুরআনে আল্লাহ বলেন “যে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে সে সফলকাম।” অর্থাৎ জীবনের আমল যেমন হবে, মৃত্যুও তেমনই হবে। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে যেমন জীবন যাপন করে, তার মৃত্যু তেমনই হয়; আর যেভাবে মৃত্যু হয়, কিয়ামতে সে তেমনভাবেই ৎবংঁৎৎবপঃ হবে।” (হাদিসের অর্থবহ বয়ান)

গ) তাওবা ও ইস্তিগফার : মানুষ ভুল করবেই। কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া একজন মুমিনের গুণ। নিয়মিত তাওবা করলেই মৃত্যু মুহূর্ত সহজ হয়। নবী (সা.) নিজেও প্রতিদিন ইস্তিগফার করতেন; এটি আমাদের জন্য শিক্ষা।

ঘ) মৃত্যু স্মরণ : রাসূল (সা.)বলেছেন, “আনন্দ বিনাশকারী মৃত্যু অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।” (তিরমিজী) কারণ মৃত্যু স্মরণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, পাপ থেকে দূরে রাখে, আল্লাহ ভীরু করে এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

২. কোন মৃত্যু কল্যাণকর? ইসলাম কিছু মৃত্যুকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। যেমন : ঈমানের রূপে মৃত্যু, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে কালিমা পড়তে পারা, শহীদী মৃত্যু, প্লেগ/মহামারি আক্রান্ত হয়ে ধৈর্য সহ্য করে মৃত্যু, পানিতে ডুবে মৃত্যু, সন্তান প্রসবের কষ্টে মৃত্যু, শুক্রবার বা জুমার রাতে মৃত্যু, রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করতে করতে মৃত্যু বরণ করে সে সফল হয়।” (মুসনাদে আহমদ), তাই মৃত্যুপথযাত্রীকে জোর করে নয় বরং নরমভাবে কালিমা স্মরণ করিয়ে দেওয়া সুন্নাহ।

৩. মৃত্যু ঘটার পর প্রথম করণীয় ধৈর্য ও শরিয়ার নির্দেশ পালন : মৃত্যুর সংবাদ শুনে শরীয়াহ প্রথম যে নির্দেশ দেয় তা হলো ধৈর্য। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “যখন বিপদ আসে তখন তারা বলে আমরা আল্লাহর, এবং আমরা তঁার কাছেই ফিরে যাব।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৬)।

এটাই একজন মুসলিমের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত। বিলাপ, আর্তনাদ নিষিদ্ধ, রাসূল (সা.) বলেছেন “যে বিলাপ করে, বুক পেটায়, কাপড় ছিঁড়ে চিৎকার করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (বুখারী)।

অতএব অতিরিক্ত শোক, চিৎকার, হৈচৈ করা ইসলামে হারাম। দ্রুত দাফনের নির্দেশ, সহীহ হাদিসে এসেছে

“তোমরা মৃত ব্যক্তির দাফন দ্রুত সম্পন্ন করো।” (বুখারী, মুসলিম)।

৪. গোসল, কাফন ও জানাজা শেষে বিদায়ের প্রধান স্তম্ভ

১) গোসল : মৃতের গোসল দেওয়া ফরজে কিফায়া। গোসলের সময় পর্দা রক্ষা করতে হবে, দেহের সম্মান রক্ষা করতে হবে, অযথা শরীর প্রকাশ করা যাবে না।

২) কাফন : সাদা কাপড় কাফনের জন্য উত্তম। বিলাসবহুল, রঙিন, অলংকারযুক্ত কাফন ইসলাম সম্মত নয়। রাসূল (সা:) সাধারণ কাফন ব্যবহার করতেন।

৩) জানাজা : এটি মৃতের জন্য সর্বোত্তম দোয়া। হাদিসে এসেছে “যদি একদল মুসলিম কারো জানাজায় দঁাড়িয়ে দোয়া করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।” (আবু দাউদ)।

আরো এসেছে “যে জানাজায় অংশ নিয়ে দাফন পর্যন্ত থাকে সে উহুদ পাহাড় সমান সওয়াব পায়।” (বুখারী, মুসলিম) অতএব জানাজায় অংশ নেওয়া বড় ইবাদত।

৫. দাফন শেষে শয্যার মর্যাদা : কবর খনন যথেষ্ট গভীর, নিরাপদ ও সম্মানজনক হওয়া জরুরি। কবর দেয়ার সময় দোয়া করা মুস্তাহাব। দাফনের পর কিছুক্ষণ দঁাড়িয়ে দোয়া করাও সুন্নাহ।

৬. দাফনের পর করণীয় : দোয়া করা। রাসূল (সা:) বলেন “তোমরা তোমাদের মৃত ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।” (আবু দাউদ)।

ইসালে সওয়াব হাদিসে প্রমাণ আছে সন্তানের দোয়া মৃতের উপকারে আসে, সদকা সওয়াব পেঁৗছায়, নেক আমল করে সওয়াব পেঁৗছানো যায়, তবে নির্দিষ্ট দিনে বেঁধে দেওয়া উচিত নয়।

৭. সুন্দর শেষ বিদায়ের উপাদান : ঈমানের উপর মৃত্যু, কালিমা পাঠ, সুন্নাহসম্মত দাফন, জানাজায় দোয়া, পরিবারের দোয়া ও সদকা, কুসংস্কার মুক্ত শোক, কুরআনে আল্লাহ বলেন, “যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য সুসংবাদ আছে।”

৮. পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব : জানাজায় অংশ নেওয়া, দাফনে সহযোগিতা, পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া, অযথা ব্যয় না করা।

৯. মৃত্যু যেন ভয় নয় বরং শান্তি : কুরআনে আল্লাহ বলেন “নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের জন্য কোনো ভয় নেই, দুঃখও নেই।” (সূরা ইউনুস, আয়াত ৬২)

অতএব ঈমানদারদের মৃত্যু শান্তিময় হয়।

১০. সুন্দর মৃত্যুর প্রস্তুতি : পঁাচ ওয়াক্ত নামাজ, সুন্নাহর অনুসরণ, গুনাহ থেকে বঁাচা, মানুষের হক আদায়, সন্তানের সঠিক শিক্ষা, নিয়মিত তাওবা, রাসূল (সা.) দোয়া শিখিয়েছেন “হে আল্লাহ! আমাদের মৃত্যু দাও ঈমানের সাথে, ইসলামের উপর।”

উপসংহার : মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মৃত্যু কেমন হবে তা নির্ভর করে জীবনের উপর। যে জীবন চলে ঈমান ও তাকওয়ার আলোকে তার শেষ বিদায় হয় সম্মানজনক ও শান্তিময়। যে জীবন কাটে পাপ, গাফলত, বিদআতে তার শেষ বিদায় হয়ে ওঠে কষ্টকর।

একজন মুসলিমের কাঙ্ক্ষিত “শেষ বিদায়” হলো। ঈমানভরা মৃত্যু, কালিমার শিহরণ, সুন্নাহসম্মত দাফন, মুসলিম সমাজের দোয়া, কবরের শান্তি, পরিবারের অব্যাহত দোয়া।

শেষ কথা যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জীবন কাটায়, তার শেষ বিদায় হয় কল্যাণময়, আল্লাহ আমাদের সকলকে শান্তিময়, ঈমান ভরা শেষ বিদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়