শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪১

প্রাণবন্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিশুদের আইস ব্রেকিং

রাশেদা আতিক রোজী
প্রাণবন্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিশুদের আইস ব্রেকিং

অপরিচিত বা আড়ষ্ট একটি পরিবেশে দুই বা ততধিক মানুষের মধ্যে প্রাথমিক সংকোচ দূর করার জন্য যে সব খেলা, কার্যক্রম বা কথাবার্তা বলা হয়, তাকেই আইস ব্রেকিং বলা হয়। আর এই কাজে ব্যবহৃত পদ্ধতি বা কৌশলগুলোকে বলা হয় আইস ব্রেকার। আক্ষরিক অর্থ হলো “বরফ ভাঙা”। তবে রূপক অর্থে বা শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় এর অর্থ হলোÑ মানসিক জড়তা, নীরবতা, ভয় বা সংকোচের অনমনীয় বরফ গলিয়ে একটি উষ্ণ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করা। নতুন ক্লাসে বা পাঠের শুরুতে শিশুরা শিক্ষক কিংবা সহপাঠীদের সামনে কথা বলতে সংকুচিত বোধ করতে পারে। আইস ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে সেই ভীতি নিমেষেই কেটে যায়।

মনোযোগ ধরে রাখা: শিশুদের চঞ্চল মনকে ক্লাসের শুরুতে অন্য চিন্তা থেকে সরিয়ে মূল পাঠের দিকে ফিরিয়ে আনার এটি একটি দারুণ উপায়।

সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব তৈরি: এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরস্পরের সাথে মেলামেশা শুরু করে, দলগত মনোভাব (টিম স্পিরিট) গড়ে ওঠে এবং তারা নিজেদের মধ্যকার তফাত বা লজ্জা ভুলে এক হয়ে যায়।

মুক্ত ও আনন্দময় পরিবেশ: এটি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ভুল করার কোনো ভয় থাকে না, ফলে শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্ন করতে ও অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত হয়।

একটি উদাহরণ দিয়ে দেখা যাক: ধরুন, আপনি ক্লাসে ঢুকেই যদি সরাসরি কঠিন কোনো পড়া শুরু করেন, তাহলে শিশুরা মানসিকভাবে প্রস্তুত না-ও থাকতে পারে। কিন্তু পড়া শুরুর আগে যদি ৩ মিনিটের জন্য বলেন:

“সবাই সোজা হয়ে বসো! আমি যখন বলব ‘বৃষ্টি’, তখন সবাই টেবিলে আঙুল দিয়ে টুপুর-টুপুর টোকা দেবে; আর যখন বলব ‘ঝড়’, তখন দু-হাত তুলে বাতাসে দোলাবে!”

এই ছোট্ট খেলাটিই হলো আইস ব্রেকিং। এর ফলে শিশুরা হাসিখুশি হয়ে উঠবে, তাদের শরীরের জড়তা কাটবে এবং তারা শিক্ষক ও পাঠের প্রতি শতভাগ মনোযোগী হয়ে উঠবে।

আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাসের শুরুতে যে গল্প বলেন, গান গান, হাততালি দিয়ে রিদম তৈরি করেন বা হালকা কুশল বিনিময় করেনÑসেগুলো আদতে আইস ব্রেকার। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিভাষাটির সাথে পরিচিত না থাকায় অনেকে এটিকে আলাদা কোনো গুরুত্ব না দিয়ে কেবল ‘পড়া শুরু করার আগের টাইম পাস’ বা হট্টগোল থামানোর উপায় হিসেবে দেখেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে যখন শিশুরা নতুন কোনো পাঠে প্রবেশ করে বা প্রতিদিন সকালে ক্লাসে আসে, তখন তাদের মন বিক্ষিপ্ত থাকে কিংবা নতুন পরিবেশের কারণে তারা আড়ষ্ট থাকে। শিক্ষক ক্লাসের শুরুতেই পড়াশোনায় না গিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থাকে শিখন-উপযোগী বা সাবলীল করার জন্য যে আনন্দদায়ক, হালকা এবং আকর্ষণীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তাকেই মূলত আইস ব্রেকার অ্যাক্টিভিটি বলা হয়ে থাকে। এটি মূলত একটি মানসিক সেতু, যা ভীতি ও আনন্দের দূরত্ব কমায়।

কেন এর সচেতন প্রয়োগ জরুরি?

শিক্ষকরা অবচেতনভাবেই এই কৌশলগুলো ব্যবহার করেন, তবে এটিকে ‘আইস ব্রেকার’ হিসেবে জেনে সচেতনভাবে প্রয়োগ করলে কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। নিচে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:

শিক্ষার্থীদের জড়তা ও ভয় দূর করতে: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের (বিশেষ করে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির) মনে নতুন পরিবেশ ও শিক্ষকের প্রতি একধরনের ভয় বা ভীতি কাজ করতে পারে। আইস ব্রেকার এই মানসিক বাধা ভেঙে তাদের হাসিখুশি ও সাবলীল করে তোলে। উদাহরণ: শিক্ষক ক্লাসে ঢুকেই গম্ভীর না হয়ে যদি সবাইকে নিয়ে হাসির কোনো ছোট খেলা বা হাততালি দেওয়ার রিদম শুরু করেন, তবে শিশুদের ভেতরের জড়তা নিমিষেই কেটে যায়।

মনোযোগ আকর্ষণ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়াতে: ছোট শিশুরা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পছন্দ করে না। ক্লাসের শুরুতে একটু নড়াচড়া বা মজার অ্যাক্টিভিটি তাদের শরীর ও মনকে চাঙ্গা করে তোলে। উদাহরণ: শিক্ষক বলতে পারেন, “সবাই আমার মতো হাত ওপরে তোলো, এবার দুই পাশে ঝঁাকাও এবং বলো ‘গুড মর্নিং!’”। এই ছোট্ট শারীরিক ও মানসিক নড়াচড়া তাদের ঝিমিয়ে পড়া ভাব দূর করে এবং পরবর্তী পাঠে মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহাদর্য বৃদ্ধি করতে: প্রাথমিক স্তরে শিশুরা শেখে কীভাবে একে অপরের সাথে মিশতে হয়। আইস ব্রেকার কার্যক্রমের মাধ্যমে সহপাঠীদের নাম জানা বা একসাথে ছোট দলগত কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়, যা তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলে। উদাহরণ: “টার্ন অ্যান্ড টক” পদ্ধতিতে শিক্ষক বলতে পারেন, “পাশের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তার একটি ভালো গুণ বা তার পছন্দের খাবার সম্পর্কে এক মিনিট কথা বলো।” এতে শিশুরা একে অপরের কাছাকাছি আসে।

শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে আনন্দদায়ক করা: খেলায় খেলায় শেখা/খেলাভিত্তিক শিখন প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি। আইস ব্রেকার পড়াশোনাকে ভয়ের বিষয় না বানিয়ে বরং আনন্দের উৎস হিসেবে তুলে ধরে। উদাহরণ: বর্ণমালা বা সংখ্যা শেখানোর আগে যদি শিক্ষক সেগুলোর সাথে মিল রেখে কোনো মজার অঙ্গভঙ্গি বা ছড়ার গেম খেলেন, তবে শিশুরা আনন্দের সাথে পাঠে অংশ নেয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাছে আইস ব্রেকার হলো একটি চাবিকাঠি, যা দিয়ে ক্লাসের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের মন জয় করা যায় এবং একটি ইতিবাচক শিখন পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়। তাই আজ থেকে আমাদের শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ হোক প্রাণবন্ত, ছড়ায়, গানে, গল্পে মশগুল থাকুক আমাদের শিশুরা।

রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), চঁাদপুর সদর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়