প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭
শিশু সাহিত্যিক নজরুল

শিশু জগতের সরল প্রাণ, কোমলমতি সত্তা। কিন্তু শিশু মনস্তত্ব ততটা সরল নয়। বরং কিছুটা জটিল ও কঠিন। শিশুর মনস্তত্ব বুঝতে গেলেই শিশু হতে হয়। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—শিশু হলো চির পুরাতন তবু চির নূতন। জগতের সব বড় লেখকের মতো কবি কাজী নজরুলও একজন বড় শিশু। নিজের শিশুকাল পেরিয়ে এসেও তাঁর শিশুপুত্রদের সুবাদে তিনি শিশুদের আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন অতি নিকট থেকে। তাদের কোমল মনের কথা, তাদের অনুভূতি, প্রাণের আকুতি, চাওয়া-পাওয়া—সমস্তই তিনি বিজ্ঞানীর মতো অনুসন্ধিৎসা দিয়ে অবহিত হয়েছেন। তাই কবি কাজী নজরুলকে বলা যায় শিশুর গোপন রাজ্যের অভিযাত্রী।
নিজের শৈশবে কবি নজরুল ছিলেন এক দূরন্ত ডানপিটে। পরের গাছের ফল পেড়ে খাওয়া থেকে শুরু করে গাছে চড়ে পাখির বাসা হতে পাখির ডিম পাড়া—কোনটাই তিনি বাদ রাখেননি। মধ্য দুপুরে পুকুরের জলে নিমগ্ন থাকা কিংবা গুলতি দিয়ে পাখি শিকার—কোনটা হতে তিনি দূরে ছিলেন? দিলখোলা হাসি আর নিরন্তর দূরন্তপনায় কাজী নজরুল যেন এক চির কিশোর।
মূলত: বড়দের কবি হলেও কাজী নজরুল তার বন্ধু কাজী হাবীবুল্লাহ বাহারের অনুরোধে শিশু সাহিত্য সৃষ্টিতে ব্রতী হন। তাঁর শিশু সাহিত্যের ভান্ডারও নেহায়েৎ কম নয়। যদিও তাতে কবিতা, ছড়ার প্রাধান্য বেশি। গল্প বা উপন্যাস নেই বললেই চলে। তবে কিছু কিছু শিশুতোষ গানের বাণী আছে। কাজী হাবীবুল্লাহ বাহারের ছোট বোন, লেখিকা শামসুন্নাহার মাহমুদ-এর বাচ্চা এবং ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ভ্রাতুষ্পুত্রী আশালতা সেনগুপ্ত ও তার ছোট কাকাত বোনের জন্যে এবং সর্বোপরি নিজের শিশুপুত্রদের কথা মাথায় রেখেও কবি কাজী নজরুল শিশু সাহিত্য রচনা করে গেছেন।
সিয়ার সোল রাজস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন স্কুলের কড়িকাঠে চড়ুই পাখির বাসা হতে একটি ছানা নিচে পড়ে যায়। বালক নজরুল সেই ছানা কুড়িয়ে নিয়ে মই দিয়ে উঠে তাকে বাসায় মায়ের কাছে ফেরৎ দেয়। পরবর্তীতে এই ঘটনাকে নিয়েই কিশোর নজরুল লেখেন একটি কবিতা ‘চড়ুই পাখির ছানা’। কবির কিশোর বয়সে, লিখা এই কবিতাটিতে তার জীবপ্রেম প্রকাশিত হয় হৃদয়স্পর্শী হয়ে। তিনি লেখেন—
মস্ত বড় দালান বাড়ির উই লাগা ঐ কড়ির ফাঁকে
ছোট একটি চড়ুই ছানা কেঁদে কেঁদে ডাকছে মাকে
চু’চা রবের আকুল কাঁদন যাচ্ছিল নে বসন বায়ে
মায়ের পরাণ ভাবলে বুঝি দুষ্টু ছেলে নিচ্ছে ছায়ে।
কবি নজরুলের জন্ম নেওয়া চার পুত্রের মধ্যে ছোট দুই পুত্র যাদের নাম কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ, তাদের দূরন্তপনার অন্ত ছিলো না শৈশবে। সব্যসাচীর ডাক নাম ছিলো সানি আর অনিরুদ্ধের ডাক নাম ছিলো নিনি। সানি-নিনির মামাবাড়ির মানিকগঞ্জের বিখ্যাত তেওতা জমিদার বাড়ি। ‘তেওতা’ গ্রামকে নিয়ে সানি-নিনির দৌরাত্ম্য চিত্রিত করে কবি নজরুল রচনা করেন অনবদ্য এক কবিতা ‘ছোট হিটলার’। নিজের ছোট দুই শিশুপুত্রের মামাবাড়ি মাতিয়ে বেড়ানোর মাঝে তিনি খুঁজে পান যেন হিটলারী কায়দা। তাইতো কৌতুকচ্ছলে তিনি চিত্রিত করেন তাদের দূরন্তপনা—
মাগো! আমি যুদ্ধে যাবো নিষেধ কি মা আর মানি
রাত্রিতে রোজ ঘুমের মাঝে ডাকে পোল্যান্ড-জার্মানি
ভয় করি না পোলিশদেরে জার্মানির ঐ ভাঁওতাকে
কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামাবাড়ি তেওতাকে।
কবি নজরুল শৈশবে ছিলেন লেটো দলের ব্যাঙাচি, কবিয়াল বাসুদেব সরকারের শিষ্য। শৈশব হতেই তার মধ্যে প্রগতিশীল জাগরণী চিন্তার বিকাশ ঘটেছিলো দারুন নান্দনিকতায়। এই প্রগতিশীল চিন্তা তিনি সঞ্চারিত করার নিবিড় চেষ্টা করেছেন শিশুদের মাঝে। তাঁর ‘খোকার সাধ’ কবিতাটি এমনই এক মানবিক অনিন্দ্য প্রয়াস যেখানে তিনি বলেছেন—
আমি হবো সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে
তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে।
শিশুদের মধ্যে তিনি জগৎকে জানার কঠিন সংকল্প তৈরির প্রয়াসে মগ্ন ছিলেন। কিশোরদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা তৈরি এবং নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডী ছেড়ে বৃহৎকে জানার যে আকাঙ্খা তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তা অনেকাংশেই সফল হয়েছে তার সংকল্প কবিতায়—
থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
কেবল যে অজানাকে জানার সংকল্প তৈরি করেছেন তাই-ই নয়, তিনি কিশোরদের মাঝে দৃঢ় মনোবলও তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। যত ঝড়-ঝঞ্ঝাই আসুকনা কেন, তিনি কিশোরকে অটল ও অটুট থাকতে বলেছেন। এমনকি বিরূপ পরিবেশ এবং বৈরি প্রকৃতির মধ্যেও কিশোরদের মধ্যে মনোবল সঞ্চারিত করে তিনি বলেছেন—
আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল
মোদের চরণতলায় মূর্চ্ছে তুফান
ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।
শিশুদের জন্যে গান রচনায়ও তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার গানের বাণীতে তিনি একদিকে যেমন শিল্পমনকে ফুটিয়ে তুলেছেন তেমনি অন্যদিকে প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যও বর্ণনাকেও এঁকেছেন চিত্ররূপময়তায়। মিশরের মমি ও মরুর সৌন্দর্যকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন তার গানে। ঘূর্ণি কিভাবে শুকনো পাতাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় কিংবা নদী কিভাবে তার আপন তরঙ্গে বয়ে যায় নিরবধি এ সবই নজরুল স্থান দিয়েছেন তার গানের বাণীতে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে। মনোরম সাজে সজ্জ্বিত খুকুকে ইরানী মেয়ের সাথে তুলনা করে কিংবা নূপুর পায়ে কিশোরীকে দেখে নজরুল গেয়ে উঠেন রুম ঝুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম গানটি শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে। শিশুদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার জন্যে কবি নজরুল রচনা করেন এক অনন্য কালজয়ী গান-’একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু বঙ্গ জননী। এই গানে শিশুমনে দেশের যে অপরূপ মায়াময় ছবি আঁকা হয়ে যায় তা পরবর্তীতে স্বদেশপ্রেম জাগ্রত করে তোলে নিঃসন্দেহে।
কিশোর ও শিশুদের জন্যে কবি নজরুল অনেক কবিতা রচনা করেছেন যার কিছু গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে এবং কিছু বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান উপলক্ষে রচিত। নজরুলের শিশুতোষ বইগুলো হচ্ছে—ঝিঙে ফুল, পুতুল বিয়ে, ফুলে ও ফসলে, তরুণের অভিযান, সাতভাই চম্পা, মটকু মাইতি, জাগো সুন্দর চির কিশোর এবং সঞ্চায়ন। এ ছাড়াও মক্তব সাহিত্য এবং লেটো দলের হয়ে গান রচনার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। নজরুলের কিশোর ও শিশুতোষ কবিতার বিষয়গুলো বৈচিত্র্যময়। কখনো কিশোরের দূরন্তপনা ও ডানপিটে স্বভাব আর কখনোবা রহস্য সন্ধানের আকাঙ্খা এই কবিতাগুলোয় ফুটে উঠেছে। শিশুতোষ কবিতায় নিদ্রা জাগরণ, দাদুর সাথে খুনসুটি কিংবা কাঠবেরালির দূরন্তপনা ইত্যাদি চিত্রিত হয়ে উঠেছে।
মায়ের সাথে নজরুলের সম্পর্ক খুব রহস্যময়। অথচ মা জাহেদা খাতুন নজরুলকে কোলে পাওয়ার জন্যে কত মানত-সিদ্ধি করেছেন। শৈশবে মায়ের কাছে আবদার-আহ্লাদ করলেও পিতার মৃত্যুর পর নজরুল সেই যে মাকে ছাড়লেন, শেষে ‘অবেলার ডাক’ এ এসে মাকে স্মরণ করেন অশ্রুধারায়। শৈশবে মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পছন্দ করেনি এমন শিশু বিরল। কবি নজরুলও তার শৈশবকে মনে করে, মায়ের মমতাময়ী কোলকে মনে করেই বড় হয়ে লিখেন-
হেরিলে মায়ের মুখ
দূর হয় সকল দুখ
মায়ের কোলেতে শুয়ে
জুড়ায় পরাণ।
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কতনা সোহাগে মাতা
বুকটি ভরান।
জীবনের প্রতিষ্ঠাকালে এসে অভিমানী কবি মায়ের স্মৃতি মনে করে তুমুল অশ্রুপাতে ‘অবেলার ডাক’ এ মাকে ডাক দিয়ে লেখেন—
অনেক করে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে,
আজ অবেলায় তারেই কেন পড়ছে মনে বারে
বারে।
শিশু সাহিত্যিক নজরুল অন্য অনেকের চেয়ে অনেক বেশি কুশলী পর্যবেক্ষক। শিশুরা তার কাছে ঝিঙে ফুলের মতোই সতেজ, সম্ভাবনাময়। হলুদ ঝিঙে ফুলের সপ্রাণ হাসি যেমন মানুষের ক্লান্ত দৃষ্টিকে প্রাণ ফিরিয়ে দেয় তেমনি শিশুরাও কবির ভাবনাকে নতুনের ঘ্রাণে প্রাঞ্জল করে তোলে। শ্যামল বাংলার প্রকৃতির কোলে ঝিঙেফুল যেমন নান্দনিক তেমনি শ্যামা মায়ের কোলে শিশুও শাশ্বত নান্দনিক। এ রকম খুকুকে পেয়ে কবির কলম ফিরে পায় শব্দের ঝর্ণাধারা—
শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকুরে,
আলুথালু ঘুমু যাও রোদে-গলা দুকুরে।
প্রজাপতি ডেকে যায়—
বোঁটা ছিড়ে চলে আয়
আসমানে তারা চায়
চলে আয় এ অকূল
ঝিঙে ফুল।
শিশু চির নূতন। শিশু নতুন পথের পথিক। নতুন পথের এই পথিকের কাছে কবির অনেক প্রত্যাশা। তাদের ভরসায় কবি নতুন দিনের প্রতীক্ষায় থাকেন। কবির এই প্রতীক্ষা নির্বাক থাকে না। বরং উচ্চ স্বরে সবাক হয়ে উঠে—
নতুন দিনের মানুষ তোরা
আয় শিশুরা আয়
নতুন চোখে নতুন লোকের
নতুন ভরসায়।
‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে-এই বিজ্ঞ বাক্য কবি নজরুল মনের গহনে লালন করতেন সর্বদা। তিনি যেন নিজেই বাবার শাসনে অতিষ্ট হয়ে বাবা হয়ে মুক্তি পেতে চাইতেন। প্রতিটি শিশুই কোন না কোন সময়ে একবার হলেও মনের মাঝে এই কথাটি ভেবেছে। আর এরই ফলপ্রশ্রুতিতে খুব সহজেই কবি নজরুল শৈশবের সবার মনের কথাটি বলে ফেলতে পেরেছেন—
আমি যদি বাবা হতুম
বাবা হতো খোকা
না হলে তার নামতা পড়া
মারতুম মাথায় টোকা।
বালিকাদের দেশি ফলের প্রতি আকর্ষণ তীব্র। বিশেষ করে নিজের বাড়িতে যদি পেয়ারা গাছ থাকে তার সেই পেয়ারা যদি ভাসা ভাসা হয় তবে তো সব খুকুরই সেই পেয়ারা চাই-ই চাই। কিন্তু মমতাহীন কাঠবেরালি কী নির্মমতায় কেবল নিজেই গাছের মগডালে চড়ে পেয়ারা ভোজ সারে। দেখে খুকুর দারুণ লোভ লাগে। এরকম লোভ লেগেছিলো বুঝি কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেগুপ্তের বাড়িতে আশালতা সেনগুপ্ত ও তার ছোট কাকাত বোনটির। কাঠবেরালির পেয়ারা খাওয়া দেখে এই দুই বালিকার মনে যে আকাঙ্ক্ষা ও পরবর্তীতে না পেয়ে হতাশা তৈরি হয় তা’ মুহূর্তেই কলমের ক্যামেরায় দৃশ্যায়ন করেন কবি। কবির কলমে তাই ফুটে উঠে—
কাঠবেরালি বাঁদরীমুখী মারবো ছুঁড়ে কিল
দেখবি তবে রাঙ্গাদাকে ডাকবো! দেবে ঢিল?
ঘুমকাতুরে খুকীটাকে নিয়ে কবি মহা বিপদে পড়েছেন। কিছুতেই তাকে ঘুম থেকে জাগানো যায় না। অলস এই মেয়েটাকে সকালে ঘুম থেকে জাগানোর যে কী কসরত মায়ের! কতো সাধ্য-সাধনা। খুকু তবু চোখ খুলে না ঘুম হতে। শেষমেষ কবি নিজেই ছুটে আসেন ঘুম কাতুরে খুকীর ঘুম ভাঙ্গাতে। কবি আশায় বুক বেঁধে বলেন—
খুলি হাল তুলিপাল
ওই তরী চললো
এইবার এইবার
খুকু চোখ খুললো।
ছোট বেলায় মামার বিয়ে সব শিশুর জন্যেই এক মহা উৎসব। এতো আনন্দ, এতো খুশি-সে যেন বর্ণনার ঊর্ধ্বে। বুড়ো শিশু কবিও যেন অবুঝ খোকাটি হয়ে মামার বিয়ের উল্লাসে বসে ফেলেন—
মামী মা আসলে এ ঘর
মোদেরও করবে আদর
ব্যস্ কি মজার খবর!
মামার বিয়ে যেমন উৎসবের, তেমনি দিদির বিয়ে আরও উল্লাসের। সাত ভাই চম্পার একটি মাত্র ভাই। কবি বুঝি এমন খোকার জন্যেই লিখেছেন—
সাত ভাই চম্পা জাগো
পারুলদি ডাকলে না গো?
দাদুর সাথে শিশুর সম্পর্ক যেন পিঠেপিঠে ভাইয়ের মতো। মানুষ বুড়ো হলে শিশু হয়ে যায়। শিশু তখন বুড়ো দাদুর মাঝে খুঁজে পায় নিজের খেলার সাথী। মা’র কাছে কচি শিশু আর ধেড়ে শিশুর ঝগড়া তখন উপাদেয় হয়ে উঠে—
দাদু বুঝি চীনাম্যান মা,
নাম বুঝি চ্যাং চু,
তাই বুঝি ওঁর মুখটা অমন
চ্যাপ্টা সুধাংশু।
জীবনের বহু চড়াই উৎরাই পার হওয়া নজরুল একজন উচুঁমানের শিশু মনস্তাত্বিক। একদিকে সাহিত্যিক আর অন্যদিকে মনস্তাত্বিক হওয়ার সুবাধে তিনি খুব সহজে খোকার বোকামীকে বা অপটুক বুদ্ধিকে হাসতে মজার ছলে বানিয়ে তোলেন পদ্য—
সাত লাঠিতে ফড়িং মারেন এমনি পালোয়ান।
দাঁত দিয়ে সে ছিঁড়লে সেদিন আস্ত আলোয়ান।
বীর পুরুষ খোকার গল্প রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন অনেক আগেই। এ রকম এক গল্প বলিয়ে খোকাকে আমাদের সামনে এনেছেন শিশুদের নূরুদা। নজরুলের খোকা গল্প বলতে গিয়ে মাকে হাসিয়ে পেটে খিল ধরিয়ে দেয়। কারণ খোকার গল্পে বিভ্রাটজনিত কারণে হয়ে যায়-’একদা এক হাড়ের গলায় বাঘ ফুটিয়াছিল’।
আজকের এসএমএস এর যুগে চিঠি অচল। অথচ কবির শৈশবে চিঠিই ছিলো দূরের কাউকে নিজের আবেগ প্রকাশের বড় বাহন। খোকা দূরে থাকে বলেই ছোট বোন খুকী তাকে লেখে কাঁচা হাতে এক পত্র। বোনের পত্রের উত্তর দিতে গিয়ে খোকা লিখে—
ছোট বোন লক্ষ্মী/ভো ‘জটায়ূ পক্ষী’
য়্যাব্বড় তিনচ্ছত্র/পেয়েছি তোর পত্র।
মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে শোনা ঘুম পাড়ানি গানগুলো এখনও কানে বাজে জীবন্ত হয়ে। বড়ো হয়েও কবি সেই গানের সুর ভোলেননি। তিনি নিজেই আজকের শিশুদের জন্যে গেয়ে গেছেন ঘুমপাড়ানি গান—
ঘুম পাড়ানি মাসী-পিসি ঘুম দিয়ে যেও
বাটা ভরে পান দেব গাল ভরে খেয়ো।
কৈশোরে দুষ্টু ছেলের দল একে অন্যকে বিভিন্ন বানানো নামে ডাকে। বানানো নামে ডেকে ক্ষেপিয়ে গরম করে তোলার বিষয়টি অতি সাধারণ। একে অন্যকে নাম ভাঙ্গিয়ে ডেকে রাগানোর এই বিষয়টি কবির শিশুতোষ কবিতায় উঠে এসেছে অসাধারণ হয়ে। কবিও ধেড়ে শিশু হয়ে ‘পিলে পটকা’ বলে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেয়েছেন আজকের শিশুদের—
উটঁমুখো সে সুটঁকো হাশিম,
পেট যেন ঠিক ভুঁটকো কাছিম।
চুলগুলো সব বাবুই দড়ি
ঘুসকো জ্বরে কাবুয় পড়ি!
কৈশোর মানেই দূরন্তপনা, ডানপিটে দুপুর আর চটুল বিকেল। কৈশোর মানেই প্রতিবেশির গাছের ফল পেড়ে খাওয়া, বিধি-নিষেধের বেড়া ডিঙ্গিয়ে গাছে চড়া। এমনই দূরন্তপনার ছবি কবি এঁকে তুলেছেন ‘লিচুচোর’ কবিতাটিতে। ‘লিচুচোর’ কবিতাটি রচনার সময় কবির বয়স তখনও কুড়ির বেশি নয়। সত্যিকার অর্থেই ‘লিচুচোর’ যেনো কৈশোরের দূরন্তপনার এক জীবন্ত চলচ্চিত্র। ফল চুরি করতে গিয়ে কুকুরের তাড়া খাওয়া প্রতিটি গ্রামীণ কিশোরের জীবনে এক স্বর্ণালী অধ্যায়। প্রতিটি শিশুই আজকের চারা, আগামী দিনের মহীরুহ। শিশুর মাঝেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের কর্নধার। শিশু হলো অমিত সম্ভাবনা, শিশু হলো অনন্ত শক্তির আধার। তাই দিলখোলা ধেড়ে শিশু নজর আলী অজয় নদের পাড় পেরিয়ে শিশুদের অপার্থিব অবদান রূপে তুলে ধরেন বিশ্বমঞ্চে—
তুমি নও শিশু দুর্বল, তুমি মহৎ ও মহীয়ান
জাগো দুর্বার, বিপুল বিরাট অমৃতের সন্তান।
কবি নজরুল বড়দের কবি হয়েও একজন উৎকৃষ্ট শিশু সাহিত্যিক। সাম্যবাদ আর অসাম্প্রদায়িকতার কবির কলমে শিশুরাও পেয়েছে অধিকতর গুরুত্ব। কবির কল্পনার, নান্দনিক লেখনীতে ‘শিশু’ নামক রাজ্যটি উন্মোচিত হয়েছে দারুন আলোক প্রভার। চির নূতন অথচ চির পুরাতন শিশু রাজ্যটি লেটো গানের ভ্রমর কবির হাতে, কবিয়াল বাসুদেব সরকারের ব্যাঙাচির লেখায় বার বার আবিষ্কৃত হয়েছে অনন্য রোমাঞ্চে।








