প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৬
লাল জামার কবর

পরিচিত, মনভোলানো তীব্র এক সুবাসের টানে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে যখন রক্তরাঙা লাল কৃষ্ণচূড়া কিংবা গোলাপের দেখা মিলে, আমি আচমকা স্তব্ধ হয়ে যাই। ফুটন্ত তাজা গোলাপ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার লাল রং তখন আমার স্মৃতির নিষিদ্ধ, বদ্ধ দ্বারকে উন্মুক্ত করে দেয়। মেলে ধরে স্মৃতির পাতায় সেই ঝড়ের তাণ্ডবের হৃদয়কাঁপানো কালবৈশাখীর রাত। স্মৃতির মলিন হলদেটে পাতাগুলো হঠাৎই জীবন্ত হয়ে উঠল।
শুনতে পেলাম মায়ের ডাক, ‘শোন, তোর বড় বোন কোথায় দেখ, ডেকে নিয়ে আয়।’
আমি আর আমার বড় বোন পিঠাপিঠি ছিলাম। আমাদের একসঙ্গে বেড়ে ওঠা। আমাদের দুজনের সমস্ত জিনিসপত্রও প্রায় একই রকম ছিল। বড় বোন তার অবসর সময়টা পাশের বাড়িতেই কাটাত। আমি ছিলাম তখন মাত্র পাঁচ কিংবা ছয় বছরের, আমার মায়ের বাধ্য মেয়ে। তাই মা বলা মাত্রই দৌড়ে গিয়েছিলাম পাশের বাড়ি।
সময়টা ছিল পড়ন্ত বিকেল। গিয়ে দেখলাম, আপু তার সমবয়সী কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে ছোটদের জনপ্রিয় খেলায় মগ্ন। তারা খেলছিল একচালা একটি টিনের ঘরের দোরগোড়ায়। দরজার সামনের জায়গাটুকু খালি থাকায় আমি আপুকে ডাকতে গিয়ে সেখানেই বসে পড়ি। তাদের খেলা দেখার ধ্যানে আমিই ভুলে গিয়েছিলাম, আমি কেন এখানে এসেছিলাম।
সেই টিনের একচালার সামনে ছিল বিশাল বড় এক উঠোন। গ্রামের বুঝি এই এক সুবিধা, যেখানে বাচ্চাদের সারাদিন ছোটাছুটির দেখা মেলে।
খেলা থেকে আমার ধ্যান ভেঙে যায়, পিছনে কিছু একটার আওয়াজ শুনে। পিছন ফিরে দেখি, দরজা বরাবর কিছুটা সামনে হাঁস-মুরগির খাবারের বাটিতে মুখ দিয়েছে একটি কমলা রঙের কুকুর। আমরা বলতাম লাল কুকুর।
তখন কুকুরটিকে তেড়ে এসেছিলেন সেই বাড়ির কর্তা। আবছাভাবে দেখেছিলাম, বাড়ির কর্তার হাতে ছিল একটি রামদা। আমি ভ্রুক্ষেপ না করে খেলা দেখায় মন দিই।
তারপর, কিছু মুহূর্তের অপেক্ষা।
আমি অনুভব করেছি, কিছু একটা আমার পিঠে বিঁধে গেছে। কয়েকটা সেকেন্ডের জন্য আমি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। শুনতে পেয়েছি কারও ছুটে আসা জোরালো পায়ের পদশব্দ। সামনে থাকা আপু ও তার সহপাঠীদের ভাবলেশহীন মুখ, তারা কোনো এক কারণে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার পিঠ থেকে কেউ কিছু একটা খুবই ধীরে ধীরে বের করে নিচ্ছিল। দেখলাম, আমার গায়ে থাকা আমার পছন্দের লাল টুকটুকে জামাটি ভিজে যাচ্ছিল রক্তিম লাল রঙে। যার উৎস ছিল আমার পিঠে সদ্য হওয়া ক্ষত।
আমি শুনলাম আপুর আর্তচিৎকার। তার সহপাঠীদের অস্থির ছোটাছুটি।
মূলত, বাড়ির কর্তা কুকুরটি খাবারের বাটিতে মুখ দেওয়ায় তাঁর হাতে থাকা রামদাটি কুকুরটিকে ছুড়ে মারেন। কুকুরটি বিপদ টের পেয়ে সরে গিয়েছিল। ফলে দুর্ভাগ্যবশত, দরজার দোরগোড়ায় আমি বসার কারণে আমার সামনের কারও আঘাত লাগেনি; বরং রামদাটি আমার পিঠের বাম পাশে বিঁধে যায়।
এর পর কী হয়েছে জানি না। মনে পড়ে, সেই বাড়ির কর্তা আমার পিঠ চেপে ধরে ছুটে যাচ্ছেন দুই চাকার রিকশার খোঁজে। আবছা ভাসে চোখে, চারপাশের দোকানপাটের মানুষগুলোর অস্থির মুখ, চাওয়া-চাওয়ি। তাদের চোখে দেখেছি আমি হাজারটা প্রশ্ন।
আর আপু, এক পলক দেখেছিলাম তাকে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়িতে ছুটতে, মাকে জানাতে।
আমার স্মৃতি বলে, সেই বাড়ির কর্তা আমায় নিয়ে ছুটেছিলেন অখ্যাত এক হাসপাতালের দিকে। স্মৃতির পাতায় ভাসে, চারপাশে ছিল ঘন ঝোপঝাড়, বিশাল লম্বা লম্বা কালো গাছ, আকাশে কালচে মেঘেদের অজানা কোনো কারণে অস্থির ছোটাছুটি। তাদের বিচলিত অবস্থা আমায় অজানা শঙ্কায় আতঙ্কিত করেছিল। আকাশের বুক চিরে ভেসে ওঠা বিজলির রেখা নজর এড়ায়নি।
বুঝিনি, সেদিন ছিল কালবৈশাখীর কালো রাত।
এরপর, যখন চোখ মেলে তাকাই, নিজেকে আবিষ্কার করলাম পুরনো এক হাসপাতালের বেডে। জানালা দিয়ে আসছিল ভারী বৃষ্টিপাতের বিরামহীন একঘেয়ে আওয়াজ। বজ্রপাতের কান ফাটানো শব্দে কেঁপে উঠতে গিয়ে পিঠে ক্ষতের ব্যথা অনুভব করলাম।
মায়ের আদর মাখা করুণ ডাকে আমার ঘোর কেটে গেল। মায়ের টলমল চোখ আমায় সব মনে করিয়ে দিল। পাশে ছিল আপু, ছোট খালামনি ও আব্বু। আব্বুর দিকে তাকাতে পারছিলাম না। গত কয়েক ঘণ্টায় কী হয়েছিল, তাদের ফোলা চোখ দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম।
তারপর, ধীরে ধীরে তারা জানায়, আমার অচেতন অবস্থায় ঘটা কালবৈশাখীর সেই রাতে তাদের অসহায়ত্বের কথা।
আপু মাকে জানানোর পর মা রান্না রেখে দৌড়ে গিয়েছিলেন আব্বুর কাজের স্থানে। তারপর দুজন মিলে সেই ঝড়ের রাতে কীভাবে করেছিলেন আমার অপারেশনের ব্যবস্থা, কীভাবে করেছিলেন ইমার্জেন্সি রক্তের ব্যবস্থা। এবং সেই সঙ্গে তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন আল্লাহর বিশেষ এক রহমতের কারণে।
সেদিন ঝড়ের রাতে হাসপাতালে পরিদর্শনে এসেছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত একজন বিদেশি ডাক্তার। পরদিনই তাঁর ফ্লাইট ছিল। সৌভাগ্যবশত, সেই ডাক্তার আমার অপারেশন করেছিলেন।
ডাক্তার জানান, আল্লাহর রহমত যে দা পিঠের হাড়ের পাশ দিয়ে চলে যাওয়ায় মেজর কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ক্ষত এতই গভীর ছিল যে সাতটি সেলাই লেগেছিল।
আমি যখন ঝড়ের রাতে বাবা-মায়ের বাড়ি-হাসপাতালে অস্থির ছোটাছুটির কল্পনায় ডুবে, ঠিক তখনই শুনতে পাই বাইরে একদল লোকের জোরালো বুটের পদশব্দ। পিঠের ব্যথা আবার অচেতন করে দিল।
ঘুম ভাঙে জানালা দিয়ে আসা সূর্যের মিষ্টি আলোয়। জানালার পাট খুলে দেওয়া হলো। আকাশে কোনো মেঘ ছিল না। ছিল না তীব্র হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ। নিজেকে হালকা লাগছিল। ভুলে গেলাম পিঠের ব্যথা।
উঠে বসলাম বেডে। নিজের দিকে তাকালাম। হয়তোবা গায়ে ছিল হাসপাতালের সাদা পোশাক। পাশে বসে থাকা বড় আপু, ছোট খালামনি, পরিশেষে এক পাশে বসে থাকা মায়ের দিকে করুণভাবে তাকালাম।
মা হয়তো বুঝলেন। আগে ফ্রেশ হতে সাহায্য করলেন, কোনো রকম হালকা নাস্তা করলাম। তারপর তিনি আমার হাত ধরে নিয়ে গেলেন বাইরে।
বাইরে গিয়ে আমি ভিন্ন কিছু আবিষ্কার করলাম। আর্মি, পুলিশে গিজগিজ করছিল পুরো হাসপাতালের চারদিক।
মা আমায় এক পাশে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, আমার প্রিয় লাল জামাটা কবর দেওয়া হয়েছে। জামাটা দ্বিগুণ রক্তিম লাল রঙে রঙিন হওয়ায় এবং রামদা জামাটিকে ভেদ করে আমার পিঠকে বিদ্ধ করায় তা আমার থেকে লুকাতে এই ব্যবস্থা।
আমি পলকহীন যখন তাকিয়েছিলাম, আর্মিদের জোরালো জিজ্ঞাসাবাদে আমার ঘোর কাটে। তারা আব্বুকে ঘিরে ছিলেন। গত দুদিন থেকেই জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল। তাদের প্রশ্ন একটাই, ভিক্টিমের পরিচয় তারা জানতে চায়।
কিন্তু আব্বু বলতে নারাজ। তিনি বারবার বলছিলেন, কেউ অনিচ্ছায় করেছে। তাই আব্বু অভিযোগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আব্বু ঝামেলা পছন্দ করতেন না।
তাদের প্রশ্ন একটাই, সেই প্রতিবেশীর পরিচয় তারা জানতে চায়। কিন্তু আব্বু বলতে নারাজ। তিনি বারবার বলছিলেন, কেউ অনিচ্ছায় করেছে। তাই আব্বু অভিযোগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আব্বু ঝামেলা পছন্দ করতেন না।
প্রতিবেশীর হয়রানির কথা চিন্তা করে আব্বু সেই বাড়ির কর্তার অনুরোধ রেখেছিলেন। আইনের লোকদের কাছে কিছুই জানাননি।
তবে আজকের আমার আক্ষেপ, কেন সেদিন আমি নিশ্চুপ ছিলাম। কেননা সেদিনের পর থেকে আর কখনোই সেই বাড়ির কর্তা আমার কোনো খোঁজখবর নেননি। অথচ সেই ক্ষতের যত্ন আজও আমায় নিতে হয়।
দীর্ঘ এক যুগের পুরনো এই ক্ষত আজও সেই বাড়ির কর্তাকে অভিসম্পাত দেয়, কেননা যথাসামান্য খাবারে মুখ দেওয়ার জন্য বাকহীন জীবটির প্রতি তার সেই আক্রোশের জন্য আমায় বাকিটা সময় সার্ভাইব করতে হবে।
যাই হোক, আব্বুর অপারগতার জন্য তারা বাধ্য হয়ে চলে যান। তবে তারা জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান যে, যেকোনো প্রয়োজনে তারা আমাদের পাশে থাকবেন।
আইনি ঝামেলা চুকে গেলে আপুর সঙ্গে শুরু হয় আমার খুনসুটি। রিলিজ পাই হাসপাতাল থেকে। ধীরে ধীরে সবার যত্নে সুস্থ হয়ে উঠা।
তারপর, মাঝে মাঝেই ফোন স্ক্রিনে পিঠের সেলাইগুলোর ভাঁজে চোখ ভুলাই। হারিয়ে যাই সেই কালবৈশাখীর ঘন অন্ধকার ঝড়ের রাতে।
যখন হৃদয়কাঁপানো বিজলীরা ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো ডেকে ওঠে, যখন কালো মেঘে ধরণী তলিয়ে যায় গভীর অন্ধকারে, আমার প্রিয় লাল জামাটা আমায় তখন ডাকে।
তার জড় দেহ কথা বলে ওঠে। সে জানায়, সে বন্দি হয়ে আছে হাজার বছর ধরে মাটির গভীরে। সে জানায়, সে আমায় এক পলক দেখতে চায়। সে জানায়, আমি যেন ঝড়ের রাতে তার কাছে ছুটে যাই।
সে আরও আকুতি জানায়, আমার প্রিয় রং হয় যেন রক্তিম লাল।
সে জানে না, লাল রং এখন আমার সহ্য হয় না। লাল রক্ত দেখলে আমি শিউরে উঠি।
এখন আমার প্রিয় রং কালো। যে কালো রাতে আমার প্রিয় রং হারিয়ে গিয়েছিল, সেই কালোকেই আমি প্রিয় করেছি। তবে আপন করে নিতে পারিনি। তাই তো এখনো কালো ঝড়ের রাতে বিছানায় নিজেকে গুটিয়ে নিই।
চারপাশ থেকে কালো ভয়েরা তখন আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। মায়ের আঁচলের আশ্রয়ের তীব্র অভাব বোধ করি।
অস্পষ্ট, অস্ফুট আর্তনাদে ফোলা চোখে ঘুম ভাঙে।
অতঃপর, স্মৃতির হলদেটে মলিন পাতায় আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে আমার প্রিয় লাল জামাটা, কথা বলে ওঠে আমার লাল জামাটার আবছা ধূসর কবর।








