বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৯

ইলিশের নদী, জেলের জীবন আর বাস্তবতার গল্প নিয়ে প্রশংসিত জসীম মেহেদীর ‘জলরূপালী’

কবির হোসেন মিজি
ইলিশের নদী, জেলের জীবন আর বাস্তবতার গল্প নিয়ে প্রশংসিত জসীম মেহেদীর ‘জলরূপালী’

চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে তখন নদীর গল্প। আলো-আঁধারির আবহে কখনো ভেসে আসে জেলেজীবনের দীর্ঘশ্বাস, কখনো রূপালী ইলিশের ঝলক, আবার কখনো জীবিকার তাগিদে নদীতে নামা মানুষের অসহায় সংগ্রামের ছবি। দর্শক সারিতে বসে থাকা মানুষগুলো যেন কিছুক্ষণের জন্য চলে যান চাঁদপুরের সেই চিরচেনা নদীপাড়ে।

চাঁদপুরকে বলা হয় ইলিশের বাড়ি। মেঘনা নদীর বুকজুড়ে রূপালী ইলিশের বিচরণ, জেলেদের নৌকা, মাছঘাটের কর্মব্যস্ততা এবং নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন এ জনপদের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। কিন্তু রূপালী ইলিশের এই গল্পের আড়ালে রয়েছে জেলেপরিবারের অভাব, অনিশ্চয়তা এবং জীবিকার জন্য প্রতিদিনের লড়াই। সেই না-বলা গল্পগুলোই নাটকের ভাষায় তুলে এনেছে কবি ও নাট্যকার জসীম মেহেদী রচিত এবং অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনা ‘জলরূপালী’।

নদীতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা যখন শুরু হয়, তখন একদিকে ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের সংসারের বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়। আইন আছে, নদী রক্ষার প্রয়োজন আছে, ইলিশ রক্ষারও প্রয়োজন আছে। কিন্তু যে মানুষটি প্রতিদিন নদীতে না নামলে তার পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে না, তার জীবনের গল্পটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বন্দ্ব, সংকট ও বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় ‘জলরূপালী’র কাহিনি।

দর্শকের কাছে এটি কোনো দূরের জনপদের গল্প নয়। চাঁদপুরের মানুষ নদীকে চেনে, ইলিশকে চেনে, জেলের জীবনকে চেনে। তাই মঞ্চে যখন সেই পরিচিত জীবন উঠে আসে, তখন নাটকের গল্পের সঙ্গে দর্শকের একধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি দেশজ আঙ্গিক, গান, কোরাস, নৃত্য এবং আবহসংগীত নাটকটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।

মঞ্চে শিল্পীরা অভিনয় করছিলেন, কিন্তু নাটকের ঘটনাগুলো যেন মঞ্চের বাইরের সমাজ থেকেই উঠে এসেছে। জীবিকার তাগিদে নদীতে নামা মানুষ, অসাধু ব্যবসার নানা চিত্র, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব—সব মিলিয়ে ‘জলরূপালী’ হয়ে উঠেছে সময় ও সমাজের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

নাট্যকার ও নির্দেশক জসীম মেহেদীর সৃজনশীল ভাবনায় নাটকটি দেশজ নাট্যরীতির আঙ্গিকে নির্মিত হয়েছে। লোকজ উপস্থাপনার সঙ্গে সমসাময়িক বাস্তবতার সংযোগ ঘটিয়ে তিনি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের জীবনসংগ্রামকে নাটকের প্রধান ভাষায় পরিণত করেছেন।

নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যে শিল্পীদের সম্মিলিত কোরাস, গায়েনের উপস্থিতি এবং সংগীতের ব্যবহার দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখে। চরিত্রগুলোর মাধ্যমে ফুটে ওঠে নদীকেন্দ্রিক সমাজের নানা শ্রেণি ও মানুষের জীবনবাস্তবতা। কখনো সেখানে আনন্দ, কখনো সংকট, আবার কখনো প্রতিবাদ ও অসহায়ত্বের চিত্র দর্শকদের ভাবিয়ে তোলে।

নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী নাট্যোৎসবের সমাপনী সন্ধ্যায় ‘জলরূপালী’র মঞ্চায়ন ছিল উৎসবের শেষ দিনের একটি অর্থবহ আয়োজন। ১০ দিনের নাট্যযাত্রার শেষ প্রহরে চাঁদপুরের নদী ও মানুষের গল্প নিয়ে নির্মিত এই নাটক যেন দর্শকদের সামনে রেখে গেল এক পরিচিত গল্প, কিন্তু নতুন করে দেখার মতো তাগিদ।

রূপালী ইলিশের জন্য পরিচিত চাঁদপুরের গল্প শুধু মাছের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর মানুষ, জেলেদের ঘাম, পরিবারের অপেক্ষা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সেই গল্পই শিল্পের ভাষায়, নাটকের আলোয় এবং শিল্পীদের সম্মিলিত অভিনয়ে নতুনভাবে উঠে এসেছে ‘জলরূপালী’তে।

নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭ উপলক্ষে চাঁদপুর থিয়েটার ফোরাম আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী নাট্যোৎসবের সমাপনী দিনে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বুধবার) সন্ধ্যায় চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে নাটকটির দ্বিতীয় সফল মঞ্চায়ন করে অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী। কবি, নাট্যকার ও নাট্যশিল্পী জসীম মেহেদীর রচনা ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ ‘জলরূপালী’ নাটকটি দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহ ও প্রশংসা কুড়ায়।

চাঁদপুরের নদী ও মানুষের বাস্তব জীবন থেকে নাটকের গল্প

‘জলরূপালী’ নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক জসীম মেহেদী বলেন, “দেশজ নাট্যরীতির আঙ্গিক নিয়ে নিজস্ব সৃজনশীলতার প্রয়াস থেকেই সত্যমূলক একটি কাহিনি মঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে। নাট্যশিল্পীরা মঞ্চে যা করছেন, তা কেবল অভিনয় হলেও এর বাস্তব ঘটনা প্রতিনিয়ত সমাজের চারপাশেই ঘটছে।”

নাটকের পটভূমি নদীমাতৃক জেলা ও ইলিশের বাড়ি হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরকে ঘিরে। ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণের স্বার্থে সরকার প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বছরে ২২ দিন এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য মাছ ধরা বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েন অসংখ্য জেলে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কর্মহীন জেলেদের জীবনসংগ্রাম, অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের ভূমিকা। এসব বাস্তব ঘটনাকে নাট্যরূপ দিয়েই মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে ‘জলরূপালী’।

নাটকটির মধ্য দিয়ে নদী ও ইলিশনির্ভর মানুষের জীবন, রাষ্ট্রীয় আইন বাস্তবায়ন এবং জীবিকার তাগিদে সংগ্রামরত জেলেপরিবারের নানা সংকট দর্শকদের সামনে ফুটে ওঠে।

শিল্পীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ নাটকে গায়েন চরিত্রে ছিলেন ফাতেমাতুজ জোহরা ও হৃদয় কর্মকার।

কোরাসে অংশগ্রহণ করেন প্রান্তিক দাস, শাহরিয়ার আবির, রোহান পাটোয়ারী, মহিন উদ্দিন, হাসিবুর রহমান, সাকিবুর রহমান রাফি, জিহাদ চৌধুরী, শুভ চন্দ্র, মো. আল রাফি, মো. আফনান আলিফ, রাবেয়া আক্তার, মহিমা আক্তার, রাফিয়া আক্তার ও হাজেরা আক্তার।

বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন শহীদ পাটোয়ারী, আয়শা সিদ্দিকী আভা, মো. আলমগীর হোসেন পাটোয়ারী, সীমা ইসলাম, জসীম মেহেদী, আখলাকুল ইসলাম লাকু, মানিক দাস, কামরুল ইসলাম, দীপক ভট্টাচার্য, শরীফুল ইসলাম, দুলাল সরকার, নজরুল ইসলাম, প্রান্তিক দাস, শাহরিয়ার আবির, হাসিবুর রহমান, জিহাদ চৌধুরী, মো. আল রাফি ও মো. আফনান আলিফ।

নাটকের মিউজিক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন কণ্ঠশিল্পী মৃণাল সরকার। সহযোগিতায় ছিলেন কাজী কাবীসা, জান্নাত, কানিজ ফাতেমা, সানজিদা আলম সান্জু, বীরেন সাহা, তবলাশিল্পী খোকন দাস ও শুভ।

মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন মো. আলমগীর হোসেন পাটোয়ারী ও মানিক দাস। আলোক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন অতিথি নাট্যকর্মী গোবিন্দ মণ্ডল ও মামুন হোসেন।

নাটকটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন হানিফ পাটোয়ারী, জয়রাম রায়, মোবারক হোসেন শিকদার, ফয়সাল ফরাজী, সাবিত্রী রাণী ঘোষ ও অ্যাডভোকেট চৌধুরী ইয়াসিন ইকরাম।

সমাপনী দিনের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় চাঁদপুর থিয়েটার ফোরামের ১০ দিনব্যাপী নাট্যোৎসব। আর উৎসবের শেষ সন্ধ্যায় ‘জলরূপালী’ চাঁদপুরের নদী, রূপালী ইলিশ এবং সেই নদীর সঙ্গে বেঁচে থাকা মানুষের সুখ-দুঃখ ও সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।

নাট্যোৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান। তিনি শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন এবং নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের হাতে শুভেচ্ছা স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজিদ, চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. এন. জামিউল হিকমা, জেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মুনিরা চৌধুরী এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের পরিচালক (অর্থ) রফিকউল্লাহ সেলিম।

চাঁদপুর থিয়েটার ফোরামের সভাপতি হাবিবুর রহমান পাটওয়ারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌধুরী এবং চাঁদপুর থিয়েটার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এম. আর. ইসলাম বাবু।

অনুষ্ঠানে নাট্যাঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নাট্যব্যক্তিত্ব ও নাট্যাভিনেতা মো. আক্রাম খান এবং মো. হানিফ পাটোয়ারীকে সংবর্ধনা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। এ সময় অংশগ্রহণকারী নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়