শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯

মুক্ত ডানার ঠিকানা

শিকদার বাসির
মুক্ত ডানার ঠিকানা

শ্রাবণের এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা। আকাশজুড়ে কালচে মেঘ, টিনের চালের ওপর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ। বারান্দা থেকে ভেজা কাপড় তুলতে গিয়ে জাহানারা বেগম হঠাৎ থমকে দঁাড়ালেন। এক কোণে ভেজা পালক গুটিয়ে বসে আছে ছোট্ট একটি শালিকছানা। ক্ষীণ স্বরে ডাকছে, উড়তে চাইছে, কিন্তু একটি পা বেঁকে যাওয়ায় মাটিতেও ঠিকমতো ভর দিতে পারছে না।

Ñ“আম্মা, দেখো! একটা পাখি!”

সাত বছরের জাহিদ আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

জাহিদের বাবা মতিউর রহমান তিন বছর ধরে সৌদি আরবে, রিয়াদের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঘরে মা-ছেলের ছোট্ট সংসার; অপেক্ষাই যেন তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

জাহানারা প্রথমে ভেবেছিলেন, মা-শালিক নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কিন্তু রাত গভীর হলেও কেউ এল না। ছানাটি ভয়ে কঁাপছিল, ব্যথায় পা ছেঁায়ালেই শরীর সিঁটিয়ে যাচ্ছিল।

পাশের বাড়ির নাসিমা খালা বললেন,

Ñ“ফেলে দে গো! ঘরে বুনো পাখি রাখা ভালো না।”

জাহানারা কোনো উত্তর দিলেন না। অসহায় প্রাণটিকে ফেলে দিতে তঁার মন সায় দিল না।

সেই রাতেই তিনি পাখিটির পা পরিষ্কার করে ছোট্ট একটি কাঠি ও নরম কাপড়ের ফিতা দিয়ে আলতো করে স্থির করে দিলেন। পুরোনো গামছা দিয়ে বানালেন ছোট্ট একটি বাসা। নরম করে ভেজানো চাল আর সামান্য কলা চটকে ঠেঁাটের কাছে ধরলেন। প্রথম দিকে ছানাটি ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিত। কিন্তু মানুষটির ধৈর্য ফুরোল না। প্রতিদিন একই মমতায় খাওয়ানো, পা দেখে দেওয়া আর নরম স্বরে কথা বলাÑসব মিলিয়ে অচেনা মানুষটিই হয়ে উঠল তার নিরাপদ আশ্রয়।

পনেরো দিন পর বঁাধন খুলে দেখা গেল, হাড় জোড়া লেগেছে। পা পুরোপুরি সোজা হয়নি, তবু সে লাফিয়ে হঁাটতে পারে, বারান্দা থেকে উঠোন পর্যন্ত ছোট্ট উড়ালও দেয়। জাহিদ নাম দিলÑমনি।

দিনের পর দিন মনি যেন ঘরেরই একজন হয়ে উঠল। জাহানারা রান্নাঘরে গেলে সে পিছু নেয়। জাহিদ পড়তে বসলে জানালার ধারে এসে চুপচাপ বসে থাকে। আর সন্ধ্যায় স্বামীর কথা মনে পড়ে জাহানারার চোখ ভিজে উঠলে মনি তঁার কঁাধে এসে বসে ঠেঁাট দিয়ে আলতো ঠোকর দেয়। সেই ছোট্ট স্পর্শে যেন অদ্ভুত এক সান্ত্বনা লুকিয়ে থাকত।

একদিন বিকেলে পাশের আমগাছে এসে বসল একঝঁাক শালিক। সমস্বরে তাদের ডাক ভেসে এল। মনি অস্থির হয়ে উঠল। ডানা ঝাপটাতে লাগল, বারবার আকাশের দিকে তাকাতে লাগল। তার চোখে যেন ফিরে পাওয়া জীবনের টান।

সেই রাতে ভাত রঁাধতে রঁাধতে জাহানারার মনে পড়ল বহু বছর আগের কথা। প্রবাসে যাওয়ার আগে শাশুড়ি বলেছিলেন,

Ñ“যারে সত্যি ভালোবাসিস, তারে আটকে রাখিস না। ছেড়ে দিতে জানলেই ভালোবাসার পরীক্ষা হয়।”

কথাটি তখন বুঝতে পারেননি। আজ বুঝলেন।

পরদিন বিকেলে তিনি মনিকে কোলে তুলে নিলেন। পালকে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,

Ñ“যা, তোর আকাশ তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”

চোখ ভিজে উঠলেও জানালাটা পুরো খুলে দিলেন।

মনি কিছুক্ষণ রেলিংয়ে নিশ্চুপ বসে রইল। তারপর একবার জাহানারার মুখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটি ডাক দিল। মুহূর্ত পরেই বঁাকা পা নিয়েই উড়ে গেল আমগাছের দিকে, সেখান থেকে মিলিয়ে গেল নিজের ঝঁাকের ভেতর।

বারান্দা হঠাৎ অদ্ভুত ফঁাকা লাগল।

কিন্তু পরদিন সন্ধ্যায় পরিচিত সেই ডাক আবার শোনা গেল। জাহানারা বাইরে এসে দেখলেন, মনি রেলিংয়ে বসে আছে। হাতে তুলে দেওয়া চাল খেয়ে সে কিছুক্ষণ তঁার কঁাধে বসে রইল, তারপর আবার উড়ে গেল নিজের আকাশে।

এরপর যেন সেটাই নিয়ম হয়ে গেল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে আসে, একটু সময় কাটায়, আবার ফিরে যায় মুক্ত জীবনে। কোনো খঁাচা নেই, কোনো শিকল নেইÑতবু সম্পর্কটি অটুট।

শীতের শুরুতে মতিউর রহমান দেশে ফিরলেন। স্ত্রীর মুখে মনির গল্প শুনে তিনি মৃদু হেসে বললেন,

Ñ“তুমি মানুষকে যেমন আপন করো, পাখিও তোমাকে তেমনই আপন করে নেয়।”

জাহানারা জানালার বাইরে তাকালেন। ঠিক তখনই রেলিংয়ে এসে বসল মনি। একবার ডাক দিয়ে আবার ডানা মেলে আকাশে ভেসে গেল।

তঁার মনে হলো, দীর্ঘ প্রতীক্ষা মানুষকে শুধু অপেক্ষা করতে শেখায় না, সময়মতো ছেড়ে দিতেও শেখায়।

ভালোবাসা কখনো ডানা কেটে কাছে রাখে না; ডানা মেলে উড়তে শেখায়, তারপরও ফিরে আসার মতো একটি ঠিকানা হয়ে থাকে।

মেঘের দেশে নীলগিরি

সাদিয়া মজুমদার

আকাশটা সকাল থেকেই এক অদ্ভুত আলো-ছায়ার খেলায় মেতেছিল। শহর জীবনের যানজট আর কোলাহল পেছনে ফেলে রাতারাতি বাসে চেপে শেষমেশ যখন বান্দরবান পেঁৗছালাম, তখন ভোরের প্রথম আলো কেবল পাহাড়ি বঁাকগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। চারপাশের নিঃশব্দ নিরবতা আর ভেজা মাটির গন্ধ যেন শুরুতেই মনটাকে এক অজানা প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল।

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল নীলগিরি। জীপগাড়ি যখন অঁাকাবঁাকা পাহাড়ি পথ ধরে ওপরের দিকে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমরা রূপকথার কোনো জগতে প্রবেশ করছি। দু’পাশে উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড়, আর তার খঁাজে খঁাজে জমে থাকা ঘন সাদা মেঘ। জীপের জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন মেঘের নরম পরশ ছুঁয়ে যাওয়া যায়। পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে তাকালে সাঙ্গু নদীকে মনে হচ্ছিল সবুজ ক্যানভাসে এঁকে রাখা রূপালী এক সুতো।

বিকেলের দিকে আমরা গেলাম দেবতাকুম। ছমছমে নিস্তব্ধ পরিবেশ, দু’পাশে বিশাল দুটি পাথুরে পাহাড় খাড়া হয়ে দঁাড়িয়ে আছে, আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে একদম কাচের মতো স্বচ্ছ শীতল পানি। বঁাশের ভেলায় চড়ে যখন দেবতাকুমের ভেতরের দিকে এগোচ্ছিলাম, তখন মাথার ওপর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনার ছিটকে পড়া পানি আর গুহার ভেতরের প্রতিধ্বনি এক অলৌকিক আবহের সৃষ্টি করেছিল। প্রকৃতি যে কতটা নিখুঁত আর নীরবতার মাঝেও কত গভীর সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখতে পারে, তা সেখানে না গেলে বোঝা অসম্ভব।

সন্ধ্যায় নীলাচলের চূড়া থেকে সূর্যাস্ত দেখার মুহূর্তটি সারাজীবন মনে রাখার মতো। পশ্চিমের আকাশে লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের আবীর ছড়িয়ে সূর্যটা যখন পাহাড়ি দিগন্তের আড়ালে হারিয়ে গেল, পুরো বান্দরবান যেন হঠাৎ অন্য এক জাদুকরী রূপ ধারণ করল। নিচে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছোট ছোট পাড়াগুলোতে একে একে জ্বলে উঠল মিষ্টি আলোর প্রদীপ।

বান্দরবানের সৌন্দর্য কেবল তার উঁচু পাহাড় কিংবা মেঘের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার শান্ত পরিবেশ, পাহাড়ি ঝরনার সুর আর প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে এক হয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত অনুভূতিতে। শহরমুখী গাড়িতে ওঠার পরও সেই মেঘ, পাহাড় আর ঝরনার মায়া মন থেকে কিছুতেই মুছতে চাইছিল না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়