সোমবার, ০৩ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৬

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার

ছায়া শিকারি

মিজানুর রহমান রানা
ছায়া শিকারি

ছয়

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মানুষের জীবন মাঝে মাঝে রোবোটিক হয়ে যায়, যখন শাসকরা জনগণের ওপর স্টিমরোলার চাপিয়ে দেয়। তারা মনে করে এটাই সঠিক। কিন্তু বাস্তবতা তা মানে না। ধীরে ধীরে অন্যায় আচরণের জন্যে জনগণের তীব্র রোষানল বাড়তে থাকে, আর তা একদিন লাভার ন্যায় উদ্গিরণ হয়।

বৃষ্টি ভাবতে থাকে সে নিজে একসময় এক শব্দময় জগতের অংশ ছিলো। তার অতীত জুড়ে রয়েছে শব্দচর্চা। হয়তো সে ছিলো একজন সংগীতশিল্পী। কিন্তু সে তার কণ্ঠ হারিয়েছে সরকারি নিষেধাজ্ঞায়। এখন সে নিজেকে রক্ষা করতে চুপ থাকলেও তার চোখ আর ইশারাগুলো অনেক কথা বলে, ‘যা বলা যায় না, তা-ই হয়তো সবচেয়ে বেশি সত্য।’

বৃষ্টির সঙ্গে ইরফানের সম্পর্ক প্রথমে নিঃশব্দের বন্ধন। তারা চুপচাপ একে অপরকে পড়তে শেখে; ইরফানের কবিতা, বৃষ্টির চোখের ভাষা। তবে এই ভালোবাসা সহজ নয়; বৃষ্টি দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, সে কি ইরফানের সাথে বিপ্লবের জন্যে পাশে দাঁড়াবে, নাকি নিঃশব্দ থেকে যাবে প্রিয়জনকে রক্ষা করতে?

ইরফানের পথ কি তার নিজের নিষ্ঠাকে ধ্বংস করে? নাকি শাসকবর্গের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে মানুষকে শোষণের হাত থেকে মুক্তির কাতারে নেমে আসবে? এই ভাবনা আর টানাপোড়েনই তাকে করে তোলে জীবন্ত মানবী; সে ধীরে ধীরে অসাড়ের পথ থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলে।

সে যখন সিদ্ধান্ত নেয় আবার শব্দে ফিরতে, তখন সে একটি পুরোনো গান গুনগুনিয়ে তোলে, আর চারপাশ থমকে যায়। বৃষ্টি কেবল ইরফানের প্রেম নয়, বরং গল্পের নৈতিক কম্পাস। সে বারবার প্রশ্ন তোলে, “শব্দের অধিকার শুধু প্রতিবাদের জন্যে নয়, ভালোবাসার জন্যও কি নয়?”

বৃষ্টি, একা। বাতাসে শব্দ নেই। চোখে দীপ্তি ঝুলে আছে, কিন্তু মুখে নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে সে মনে মনে বলে, ‘আমি একটা সময় শব্দে বাস করতাম, আঙুলের টোকায় সুর উঠতো, বুকের গভীরে কাঁপন ধরাতো একেকটা স্বরলিপি। এখন আমি নীরব, কিন্তু তার মানে এই নয় আমি নিস্তব্ধ।’

তোমরা সবাই ভাবো, আমি কেবল অপেক্ষা করি ইরফানের জন্যে, বিপ্লবের জন্যে অথবা হয়তো নিজের কণ্ঠের জন্যে। কিন্তু সত্যি বলি? আমি অপেক্ষা করি সেই মুহূর্তটার জন্যে, যেটা শব্দ না হয়েও জেগে থাকে সবার ভেতর। আমি জানি, আমি গান গাইলে কেউ শুনবে না, কিন্তু তবু, একটা সুর আমার ভেতরে ফুসফুসের মতো ওঠে-নামে। যদি কখনো কেউ বলে, ‘চলো, শব্দ ফিরিয়ে আনি’, আমি তার পাশে হাঁটবো। যদি কেউ না বলে, তবু আমি হেঁটে যাবো। কারণ প্রতিটি প্রেমই এক ধরনের বিদ্রোহ। আর প্রতিটি বিদ্রোহই এক ধরনের কবিতা।

এ সময় তাসফিয়া ঘুম থেকে জেগে ওঠে। তারপর তার মনে হয়, ইরফান এক কঠিন বিপদে আছে, তার পাশে দাঁড়ানো দরকার। বৃষ্টি তাকে হয়তো ভিন্নপথে নিয়ে যাবে, যে পথ আসলেই সঠিক নয়। সে দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। তারপর ইরফানের রুমে আসে। ইরফান বসে বসে গিটারে এক সুর তুলছিলো, সেই সুর কিছুক্ষণ শুনে তাসফিয়া তার গলা জড়িয়ে ধরে। ইরফান দ্রুত তাসফিয়ার দিকে ফেরে। তাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। তারপর তার চোখের ভাষায় কথা বলে— তুমি *কী চাও?

তাসফিয়াও তার চোখের ভাষায় উত্তর দেয়, ‘আমি একজন ইরফানকে চাই, যে ভয় পেতে জানে না। যে শুধু এই দেশের মানুষকে ভালোবাসার জন্যে, তাদেরকে নিঃশব্দের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে একাকী এসেছে, যার অন্য কোনো মানবিক পরিচয় নেই, সে শুধু মানুষকে দিয়েই যাবে নিঃশেষ হওয়ার জন্যে— যেমন মোমবাতি নিজে পুড়ে পুড়ে অন্যকে আলো বিলাতে বিলাতে নিঃশেষ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি।’

ইরফান বিষয়টি বুঝতে পারে, তারপর তার চোখের ভাষায় উত্তর দেয়, ‘আমার সামনে বৃষ্টি আর বিপ্লবের আগুন ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমার হৃদয় নেই, আমার মুখের ভাষা নেই। শুধু অবশিষ্ট চোখের ভাষাটা আছে। এই ভাষা দিয়েই আমি মোমবাতির শিখার মতো নিঃশেষ হয়ে যেতে চাই।’

এসব চোখের ভাষাও এখন তাসফিয়া বুঝতে পারে। তারপর ইরফানের দু চোখে চুমু খায়। ইরফান শিহরিত হয়। কিন্তু সে বুঝতে পারে না কোনটা আসল আর কোনটা মেকি— তাসফিয়া নাকি বৃষ্টি? তার হৃদয় মোচড় খায় কিন্তু হৃদয়ের মুভমেন্ট মস্তিষ্কের নিউরনে বাধা খেয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

এ সময়ই বৃষ্টি ইরফানের কামরায় প্রবেশ করে। তাসফিয়া ও ইরফানকে একত্রে দেখে ভড়কে যায় তার আত্মার শহর। সে তাসফিয়াকে প্রশ্ন করে, ‘তোমার চোখ বলে তুমি কিছু একটা খুঁজছ? তোমার হৃদয়ে কিসের ঘ্রাণ, যা আমি নিঃশব্দতার আড়ালে দেখতে পাই। যদি তুমি এসব বিষয় লুকিয়ে রাখো, তাহলে আমাদের বিপ্লব সার্থক হবে না। আমরা চাই, সবাই বিশ্বাসে ভরপুর হৃদয় নিয়ে একত্রে এগিয়ে যাব। তারপর এই দেশটাকে নরকের নিচ থেকে তুলে স্বর্গের এক ছায়াময় স্থানে রেখে যাব।’

তাসফিয়া ইরফানের দিকে তাকিয়ে হাসে। নিঃশব্দ হাসি। তারপর ইরফানকে কানে কানে ফিসফিস করে বলে, ‘হ্যাঁ, আমরা একটা ভালোবাসায় ভরপুর হৃদয় নিয়ে মৃত্যুকে উপেক্ষা করেই এই শহরের মানুষদের মুখের ভাষা ফিরিয়ে দিয়ে যাবো, যাতে তারা অনন্তকাল কথা বলতে পারে— কেউ তাদের থামিয়ে রাখবে না।’

আরাধ ছিলো নিঃশব্দ শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র, এক মানবিক চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া দানব, যাকে গড়ে তোলা হয়েছে শব্দবিহীন সমাজ রক্ষায়, কিন্তু সে নিজেই শব্দ ও তার স্মৃতি ধ্বংস করে দিতে চায়। এখন তার মুখে কোনো ভাষা নেই, শুধু এক বিদ্যুতায়িত নিঃশব্দতা, যা স্পন্দনের মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

অনেক বছর আগে, বিপ্লবের সময় এক কবি ছিলো, যার নাম ছিলো আহাত। তাকে বন্দি করে নিঃশব্দে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো। সে লিখেছিলো— সুবর্ণা, তুমি বলেছিলে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছ? এখন দেখো দেখি কী কাণ্ড! ফুরিয়ে গেছে সুদিন, আজ খালি হচ্ছে লতা-কাণ্ড! তুমি বলেছিলে : এবার আমরা আর কোনো ফ্যাসিস্ট চাই না, অথচ তোমার বুকের পাঁজরে এখনও গান গায় তোমারই ময়না, যখন তোমাদেরই লোক কেটেছে গাছের মগডাল, তখনই তোমাদের শুরু হয়েছে দুর্দিন মহাকাল (উৎস অনুযায়ী ‘মবকাল’ রয়েছে), তোমরা ছেড়ে দাওনি কাউরে—দিয়েছ জুতোর মালা, এবার বুঝে নিও এসে গেছে তোমাদেরই পালা। আজ দিগন্তের সীমায় তুমি পৌঁছে গেছো লাল-নীল, তোমাদেরই শকুন এবার তোমাদেরই খায়— হয়ে শঙ্খচিল।

কবি আহাতের ছিন্ন কণ্ঠ থেকে তৈরি হয় আরাধ। শব্দের বিপরীতে জন্ম নেওয়া নিঃশব্দতার প্রতিশোধ। তাই আরাধ শব্দকে ঘৃণা করে, কারণ শব্দ তাকে কষ্টের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সে চায় শহরের শেষ ছিন্ন কবিতাটুকুও হারিয়ে যাক। কিন্তু যখন সে বৃষ্টির চোখে কোনো এক পুরোনো সুরের ঝলক দেখে, তার ভেতরে এক অজানা দ্বিধা জন্ম নেয়। সে কি পারবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা মেনে চলতে? নাকি সে গোপনে বিপ্লবীদের দলে যোগ দেবে? সে কী করবে, তাই ভাবতে থাকে...।

এ সময় তার মেঘাকাশে বৃষ্টির স্মৃতির জানালা খুলে যায়। বৃষ্টিকে সে দেখে বৃষ্টি কাঁদছে না, বরং কথা বলছে। প্রতিটি ফোঁটা যেন এক হারিয়ে যাওয়া কবিতার পঙ্ক্তি, যা আরাধের ভেতরে কোথাও এক অচেনা সুরে ধাক্কা দেয়।

আরাধ স্থির দাঁড়িয়ে ছিলো। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার কাঁধে, মুখে, চোখে পড়ছিলো, কিন্তু সে নড়লো না। যেনো প্রতিটি ফোঁটা তার ভেতরে ঢুকে একেকটি স্মৃতির দরজা খুলে দিচ্ছিলো। সে জানতো না এই স্মৃতিগুলো তার নিজের, না সেই কবির, যার ছিন্ন কণ্ঠ থেকে তার জন্ম।

চারপাশে শহর নিঃশব্দ। কিন্তু তার ভেতরে শব্দের মতো কিছু একটা জেগে উঠছে। না, শব্দ নয়, বরং শব্দের অনুপস্থিতির ব্যথা। সে বুঝতে পারছিলো, তার অস্তিত্ব কেবল এক রাষ্ট্রীয় অস্ত্রের নয়। তার ভেতরে কিছু একটা আছে, যা রাষ্ট্রের প্রোগ্রামিং ছাপিয়ে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই কবির মুখ, যার কোনো শব্দ নেই, তবু ঠোঁট নড়ছে। আরাধ বুঝতে পারলো, এই নীরব ঠোঁটই তার জন্মের উৎস। এই নীরবতাই তার প্রথম শিক্ষা।

সে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে হাঁটতে শুরু করলো। পেছনে পড়ে রইলো গুহা, যেখানে সাঈদের রক্তমাখা শার্ট এখনো পড়ে আছে। সামনে শহর, এক নিঃশব্দ কারাগার, যেখানে প্রতিটি মানুষ শব্দহীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা।

আরাধ জানে, সে এই শহরের রক্ষক। তার কাজ সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো শব্দ, সুর, কবিতা, গল্প—সব ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু এখন, এই বৃষ্টির ভেতর দাঁড়িয়ে, সে বুঝতে পারছে, ধ্বংস নয়, সে নিজেই ধ্বংস হতে চলেছে।

তার ভেতরে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রের নির্দেশনা আর কবির স্মৃতি, দু বিপরীত মেরুতে টানছে তাকে। সে জানে, এই দ্বন্দ্ব তাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু সে এটাও জানে, এই দ্বন্দ্বই তাকে মানুষ করে তুলছে।

একটি পুরোনো ভবনের ছাদে উঠে সে শহরের দিকে তাকায়। নিচে মানুষ হাঁটছে, মুখে মুখোশ, চোখে শূন্যতা। তারা জানে না, তাদের রক্ষক এখন নিজেই প্রশ্ন তুলছে।

আরাধ চোখ বন্ধ করে। তার ভেতরে এখন আর নিঃশব্দতা নেই। সেখানে এক অদৃশ্য শব্দ জন্ম নিচ্ছে— ‘বৃষ্টি আমার জীবন-কবিতার খাতা।’

এটা কী ভাবছে যে, নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে। এখন তার সামনে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ইরফান আর বৃষ্টিকে দেখে সে। দুজন তাসফিয়ার সাথে কথা বলছে।

হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেলো, হ্যাঁ আমার নিশানা তো এটাই, এটাই তো আমাকে টার্গেটে রাখতে বলা হয়েছিলো। তাহলে আমি ভুলে গেলাম কীভাবে?

রাতে আরাধ বাইরে আসে। বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। এ সময় কলেজের সামনের বারান্দায় একটা জটলা দেখতে পায়। ধীরে ধীরে সে সেদিকে এগিয়ে যায়, তারপর দেখে সেখানে মৃত পড়ে আছে তাদেরই ক্লাসমেট শিশির। হঠাৎ করে দমকা বাতাসের মতোই খুব কাছ থেকে হাজির হয় জামশেদের বাহিনী। তারপর আরাধকে শিশিরের মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করে, ‘তাহলে তুমিই খুনি।’

আরাধ হাসে। তারপর প্রশ্ন করে, ‘কেউ কি আমাকে খুন করতে দেখেছে? আমার হাতে কোনো অস্ত্র আছে? নাকি আমি গলা টিপে আমারই ভাইকে মেরে ফেলেছি? রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাহলে কী করছে? একের পর এক ক্লাসমেট প্রতি রাতে মারা যাচ্ছে, আর দোষটা বিনা প্রমাণে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে? প্রমাণ থাকলে আমাকে গ্রেপ্তার করুন। আর প্রমাণ না থাকলে এখান থেকে দূর হয়ে যান।’

জামশেদ হাসে, তারপর বলে, ‘প্রমাণ একদিন অবশ্যই হাতে আসবে। তারপর তোমাদের সব ক’টাকে কীভাবে ধরে পাছা লাল করে দিতে হয় সেটা আমার জানা আছে। সবক’টাকে ধরে কারুনের ভাতের হোটেলে চালান করে দেব। তারপর গুপ্ত স্থানে থাকতে থাকতে বাইরের আলো আর চোখে পড়বে না।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়