সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৬

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

‘ম্যাথিউ এর কথা বলছিস? সে তো বিয়ে করেছে মনিকাকে। জানিস, ওদের দেশ ও কালচার ভিন্ন, পরিবার ভিন্ন, ভিন্ন তাদের ধর্ম তারপরও ওরা বিয়ে করেছে আর ওদের পরিবারও এটাতে অখুশি নয়। আমাদের এশিয়াতে বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশে এখনো সমাজে বৈষম্যভাবটা রয়ে গেছে। জাতিভেদ, কাস্ট, সাম্প্রদায়িক দূরত্ব ইত্যাদি নিয়েই আমাদের সমাজ ও সমাজে বসবাসকারীদের জীবনধারা। এখানেও এটা ছিল একসময় কিন্তু এখন সেটা নেই। ওরা দুজন দু রাষ্ট্রের হলেও এখানে অতটা সমস্যায় পড়তে হয় না যেটা আমাদের দেশে হয়ে যায়। সত্যি বলতে কী ধনী-দরিদ্র, সম্প্রদায়, বর্ণভেদ এগুলোর বাইরেও জীবনটা বহুদূর অথচ আমাদের ওখানকার সমাজ এখনো এগুলো থেকে বের হতে পারেনি তাই তাদের জীবন এতটা পিছিয়ে।’

‘তুমি কী জান না তোমার এসব কথাবার্তা কাকাবাবু আর আমি আমরা দুজনেই পছন্দ করি না। এখানকার মাটিতে তোমার সৃষ্টি তাই এটাই তোমার অস্তিত্ব।’

‘আমি অস্বীকার করেছি কখনো? তবে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে পারবি না। যা সত্যি তা মিথ্যের মোড়কে প্যাঁচিয়ে অস্বীকার করা যায় না। আমাদের মতো প্রবাসী যারা এখানে আছে আমরা আফসোস করি জানিস কারণ দেশটা আমারও আর এই দেশটার অগ্রগতি হলে আমারও বুকটা গর্বে ভরে ওঠে কিন্তু যখন দেখি জাতিভেদ বা সম্প্রদায়ের নামে মানুষের মনুষত্ব হারিয়ে যায় তখন ইচ্ছে হয় না নিজের দেশটাকে নিয়ে গর্ব করি। এগুলো নিঃশেষ হতে আরও কয়েক প্রজন্ম পার হবে কারণ সার্টিফিকেট তো আছে কিন্তু সুশিক্ষার অভাব আজও রয়ে গেছে সেখানে।’

আমি এখন রাখি, ভালো থেক।’

‘হঠাৎ এত তাড়া কীসের? তোর তো পড়াশোনা নেই এখন।’

‘বইমেলা থেকে কিছু নতুন লেখকদের বই কিনেছিলাম। বই পড়া আমার পছন্দের বিষয় এটা তো তোমার জানা আছে। তাই এখন কিছু সময় বই পড়ে শুয়ে পড়ব, আজ ফোন রাখলাম তাহলে।’

‘ঠিক আছে, ভালো থাকিস।’

আমি জানি সে আমার কথাগুলো সহজে মেনে নিতে পারছে না। ইচ্ছে ছিল আরও কিছুক্ষণ কথা বলি, আরও কিছুটা শুনি তাকে। দূরে থাকলে দেশের মানুষগুলোর কথা বেশ মনে পড়ে। বিশাখা আমার ছোট বেলার সঙ্গী তাই তার প্রতি মোহটা অন্যরকম। যেটা আমার কাছে বাস্তবতা ওর কাছে দৃষ্টিকটু তাই কখনো সেটা মেনে নেবে না। কথাগুলো বলতে চাই না যদিও তবু চলে আসে আর যখনই চলে আসে তখন সেগুলো ক্ষোভের রূপ নেয়। কী করব হাজার মাইল দূরে থাকলেও মনটা আজও বাংলাদেশী।

১৯.

আমরা সেদিন বসা ছিলাম ট্রেনের অপেক্ষায় চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে। কক্সবাজার থেকে সকালেই রওয়ানা দিয়ে চলে আসি। ঘোরাফেরা শেষে আর ভালো লাগছিল না। এদিকে পকেটের অবস্থাও অনেকটা টান টান তবুও দু একদিন চলে যেত কোনো মতে। কখন কোন সমস্যায় পড়ি তাই বয়সের বিবেচনায় পকেট পুরোপুরি খালি করিনি আমরা। ফিরে যেতে হবে সেজন্য সকলের মনটা কেমন যেন একটু বিচলিত। এই দিনগুলো ছিল একান্ত আমাদের যেখানে আমরা ছাড়া আর কোনো কিছুর স্থান ছিল না এমন কী আপনজনরাও না। হাসি-ঠাট্টা, আনন্দ দিয়ে কীভাবে যে সময়গুলো চলে গেল বুঝে উঠতে পারিনি। এই ট্যুরটা আমাদের আরেকটু আপন করে তুলেছে যেন একজন ছাড়া আমরা অন্যজন অচল। বলতে বলতে দিনগুলো কেটে যায় অনায়াসে আর পিটারের সমুদ্র দর্শন তখনো তাকে তৃপ্ত করেনি। ভোরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি সে শেষবারের জন্য সমুদ্র দেখে আসবে বলে বের হয়ে যায় তার সাথে বের হয় নরেন্দ্র দা। দুজনে দেড়ঘণ্টা পর ফিরে তারপর আমরা হালকা নাশতা সেরে বিদায় নেই কক্সবাজার থেকে। পথে জ্যাম থাকায় সময়টা তুলনামূলক বেশিই লাগে আসতে। লাঞ্চের পর কাউন্টার থেকে অনলাইনে কাটা টিকিট সংগ্রহ করে বসে গল্প করছি। সময় হয়ে আসছে অন্যান্য ট্রেনের তাই লোক সমাগম কিছু বাড়ছে। হঠাৎ পেছন থেকে এসে একজন বলছে।

‘আমাকে কী চিনেন আপনারা? বলতে পারেন আমি কে?’

আমরা সকলেই অবাক হয়ে তাকাই তার দিকে। লোকটার পড়নে সাধারণ পাঞ্চাবি-পায়জামা। সাদা চুলগুলো অগোছাল আর বয়সটা আনুমানিক পঁয়ষট্টির বেশি-কম হবে। এখন অপরিচিত মানুষকে বিশ্বাস করাটাও মুশকিল হয়ে গেছে কিন্তু লোকটার বয়সের বিবেচনায় সেরকম মনে হয় না তাছাড়া তাকে দেখে অসুস্থ্য মনে হয় না কিন্তু নিজের বিষয়ে নিজেই জানে না এটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমরা তাকে বসাই বেঞ্চিতে, জলের বোতলটা এগিয়ে দিতেই অনেকটা গিলে ফেলে।

‘খাবেন কিছু ক্ষুধা পেয়েছে আপনার? দুপুরে খেয়েছেন কিছু?

‘মনে নাই, তবে পেটে ক্ষুধা নেই। আচ্ছা বলুন না আমাকে চিনেন কী না? সাথে আমার স্ত্রী ছিল কিন্তু নামটা মনে পড়ছে না।

‘আপনি কী অসুস্থ্য? আপনার কবে থেকে কিছু মনে পড়ে না বলুন তো?

‘জানি না, তবে এটা মনে আছে আমার সাথে আমার স্ত্রী আছে কিন্তু কোথায় তা মনে নেই। রাস্তার ওপারে ছিলাম তারপর এপারে আসি আর তখনই ভুলে যাই। রেলস্টেশন দেখে ভাবলাম হয়তো আমরা কোথাও যাচ্ছি তাই এখানে আসি কিন্তু পরিচিত কাউকে দেখি না। আপনাদের বসে থাকতে দেখে ভাবলাম হয়তো আপনারা আমাকে চিনেন তাই জিজ্ঞেস করেছি অন্য কিছু ভাববেন না দয়া করে। আমি হারিয়ে গেছি এখন কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’

‘চলুন আপনাকে রেল পুলিশের কাছে নিয়ে যাই উনারা আপনার পরিচিতদের খুঁজে দিতে সাহায্য করবেন।’

আমরা উনাকে কিছু বিস্কুট খেতে দেই আর খাওয়া শেষ করার অপেক্ষা মাত্র তারপর উনাকে নিরাপত্তা ও অনুসন্ধান টিমের হাতে সোপার্দ করে দিলে হয়তো তারা তাদের প্রচেষ্ঠায় লোকটার পরিচিতদের খুঁজে দিতে পারবে। কিছু দূরে লক্ষ করে দেখি একজন মহিলা এদিক-সেদিক কী যেন খুঁজছেন আবার কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করছেন। বিষয়টা সারোয়ারও লক্ষ করল আর তখনি সে উঠে গিয়ে মহিলাকে কী যেন বলায় সে তড়িঘড়ি করে ছুঁটে এগিয়ে এসেছে। চোখ কান্নায় ডুবুডুবু আর চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ। কিছুটা কাছে আসতেই কান্না জড়ানো কণ্ঠে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।

‘আমি কী করি এই মানুষটাকে নিয়ে। তোমায় না বলেছি আমাকে না বলে কোথাও যাবে না, কোথায় গেলে?’

‘আমার মনে পড়েছে এর নাম রওশন আরা, সে আমার স্ত্রী। আমি বলেছিলাম না সাথে আমার স্ত্রী আছে। তখন নামটা মনে ছিল না এখন দেখা মাত্রই মনে পড়েছে।’

‘উনার কী কোনো সমস্যা আছে? মানে আমাদের কাছে এসে উনি উনার নামটুকু বলতে পারেননি আর পরিচয়ও ভুলে গেলেন। এমন ভুলে যাওয়া মানুষ কখনো নজরে আসেনি তাই একটু বিচলিত হয়েছিলাম।’

‘তুমি ওখানে বস চুপটি করে আমি আসছি। এই নাও পেপার, এটা পড় গিয়ে।’

‘উনি থাক না এখানে সমস্যা কোথায়?’

‘আছে সমস্যা আছে। উনি কাছে থাকলে আমি আপনাদের কথার জবাব দিতে পারব না ভাই। উনার নাম আশরাফুল ইসলাম, একটা সময় বেশ সুস্থ্যই ছিলেন উনি। চাকরি করতেন একটা প্রাইভেট ফার্মে আর শেষ বয়সে যখন চাকরি থেকে অবসর দিয়ে দিল তখন জমানো টাকায় চলতে থাকে আমাদের সংসার। চাকরি নেই তাই মাস শেষে বেতনও নেই। সারাজীবন কামাই রোজগার করে সঞ্চয় তেমন একটা করতে পারেননি। যতটুকু ছিল একমাত্র ছেলে নওশাদকে গড়ে তুলতে পুরোটা ব্যয় হয়। ছেলে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে একটা প্রাইভেট ফার্মে জব করছিল। চাকরি পাওয়ার কিছুদিন পর তার বিয়ে হয়, যদিও মেয়েটা তার পছন্দের ছিল আর একমাত্র ছেলের পছন্দ তাছাড়া মেয়টা দেখতে সুশ্রী ও মানানসই তাই মেয়ে দেখার পর না করতে পারিনি। আমাদের ছোট্ট সংসার হাসি-আনন্দে কেটে যাচ্ছিল তারপর ২০২০ সালের ভয়াবহ করোনার কাল থাবা আমার একমাত্র ছেলে ও তার স্ত্রী সন্তানসহ সকলকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহর কাছে কত ফরিয়াদ করেছিলাম কিন্তু রাব্বুল আল-আমীনের সেটাই মর্জি ছিল। লাশটাও দাফন করতে পারিনি নিজেরা গিয়ে। প্রশাসনের লোকজন এসে লাশ নিয়ে যায় তারপর একটা জানাযা শেষে দাফন করে দেয় ঝটপট। সমস্যাটা তখন থেকেই শুরু হয় আর সে সময় থেকে উনার মনে রাখার ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হারাতে থাকে। আমরা ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন শেষে যখন বাসা থেকে বের হই তখন উনাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়। করোনার প্রভাব না কাটায় হাসপাতালগুলোতে ডাক্তাররা বেশি একটা আসতেন না আর চেম্বার করাটাও ছিল নগন্য। পরবর্তীতে ডাক্তার দেখার পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বুঝতে পারেন উনি অ্যালঝাইমা (ডিমেনসিয়া) রোগী যা কখনই স্বাভাবিক হওয়ার নয়, ওষুধ যতদিন চলে উনি স্বাভাবিক থাকবেন। বর্তমানে আমাদের অবস্থা এতটাই বেগতিক যেকোনো রকম পেট চালিয়ে যাওয়া মুশকিল তাতে ওষুধ কিনব কীভাবে? এ শহরে আমাদের এক আত্মীয়ের বাসায় ভরসা করে এসেছি কোনো কাজ যদি জুটিয়ে দিতে পারেন। বেশ কিছুদিন হয় অথচ এ বিষয়ে উনাদের কোনো সাড়া পাই না। তারপর একদিন তারা বেশ বিরক্তি প্রকাশ করায় আমরা বের হয়ে চলে আসি। এতবড় দুনিয়ায় আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই। একমাত্র ছেলে তার বউ-সন্তান মারা গেছে অথচ এই লোকটা কিছুই বলতে পারছে না এখন।

‘আপনারা তাহলে থাকেন কোথায়?

‘পাশের এলাকায় একটা বস্তি আছে সেখানে তিনশত টাকা ভাড়া দিয়ে একটা ছাপড়া পাই সেখানে থাকি। বস্তির ছেলে-মেয়েরা পড়তে আসে তাই তাদের কাছ থেকে যা পাই সেটা দিয়ে ভাড়া আর দু বেলার খাওয়া জুটে। ব্যবস্থাটা বসতির লোকগুলোই করে দিয়েছে কিন্তু উনাদের কথামতো চলতে হয় তাই একটু ঝামেলা আর কী?’

‘আর উনার ওষুধ?’

‘বন্ধ আছে। তাইতো এই অবস্থা, সমস্যাটা দিনদিন বাড়ছে। আমার নিজের শারীরিক অবস্থাও বেশি একটা ভালো থাকে না যে কাজ করে রোজগার করব। বসতির লোকগুলোর ওপর ভরসা করে বেঁচে আছি।’

ভদ্রমহিলার কথায় আমরা সকলে নীরব ভূমিকা পালন করছি। আমাদের সমাজে সমস্যাগুলো বাড়ছে দিনদিন আর শেষ বয়সের অসহায়ত্ব যেন ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। একেকজনের সমস্যা একেক ধরনের শুধু পরিণামটা একইÑঅসহায়ত্ব। ইচ্ছে করে সকলের জন্য কিছু একটা করি কিন্তু কীভাবে আমার অবস্থাও তো এদের মতোই। পকেটে টাকা যা আছে তাতে নিজেরই চলবে না আর এদের সহায়তা করি কীভাবে? আমি তারপরও কিছু টাকা দিতে চাইলাম মহিলা নিতে চাইছে না। পেটে ক্ষুধা অথচ আত্মসম্মানের চাদরটা আজও আগলে রেখেছেন। তাদের সহযোগীতা করতে হলে উপায় একটাই কিন্তু এভাবে একটা অপরিচিতকে কী ভরসা করা ঠিক হবে? জীবনে আর আছে কী যে হারিয়ে যাবে বা নষ্ট হবে তারচেয়ে যদি কাউকে সহযোগীতা করতে পারি তবে মনে করব যেন মানব সেবার একটা সিঁড়ি অন্তত পাড় করেছি। মানুষ মানুষের জন্য কথাটা তখনই বাস্তব হবে যখন কারো জন্য ভালো কিছু করা হয়। দেরি না করে অবশেষে বলিÑ

‘আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমাদের সাথে আসতে পারেন। আমার বাড়িটা খালিই পড়ে থাকে আপনারা এসে থাকবেন আর আমার পেনশন যেহেতু আছে আমি অন্তত চারটে ডালভাত আপনাদের দুবেলা খাওয়াতে পারব।’

‘আপনারা কী সকলে সরকারি চাকরি করেন? আপনাদের কত সুবিধা পেনশন আছে। শেষ জীবনটা অন্তত আমাদের মতো অসহায় হয়ে থাকতে হয় না।’

‘চাকরি করতাম কোনো এক সময় এখন অবসর গ্রহণ করেছি। আপনি ঠিকই বলেছেন পেনশনের এই সুবিধা আছে বলেই মানুষ আজও সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহী। তা আপনি চাইলে আসতে পারেন।’

‘না থাক ভাইজান আমরা আর কারো ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। বাঁচবই বা কয়দিন, বাকি জীবনটা কেটে যাবে কোনো মতে শুধু ভয় একটাই আল্লাহ যদি তার আগে আমাকে নিয়ে যায় তখন এই লোকটার কী হবে? এটা ভাবলেই আর নিজেকে স্থির রাখতে পারি না।’

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়