প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২০
জাতীয় শিক্ষক দিবসের ভাবনা

শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, নিরস ও প্রাণহীন। শিক্ষার গুণগত মান কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে পরিমাপ যায় না, এটি নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মানবিকতা, পেশাগত নৈতিকতা ও আত্মসম্মানবোধ চর্চা, গবেষণার স্বতন্ত্র পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কল্যাণমুখী সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে।ৃ
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষা খাত, যা জন্মকাল থেকে অবহেলিত। এটির ছিল না কোনো সার্ভিস রুলস, বেতন, নিয়মিত অনুদানপ্রাপ্তি অথচ এই খাত থেকেই তৈরি হচ্ছে দেশের সব বিভাগের মানবসম্পদ। মানবসম্পদ তৈরির অঁাতুড়ঘর যেহেতু দুর্বল তাই রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রই কাঙ্ক্ষিত মাত্রার সেবা দেওয়ায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা বিভাগের অবহেলিত অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বলা যায় শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৫-১৯৮১) বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। তার প্রশাসন একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে, যা সমাজতান্ত্রিক মডেল থেকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের দিকে মুভ করে এবং শিক্ষায় ‘প্রদান পদ্ধতির বহুত্ব’কে গ্রহণ করে। ১৯৮০ সালে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য মাসিক বেতন আদেশ (এমপিও) ব্যবস্থার প্রবর্তন একটি যুগান্তকারী নীতি ছিল, যা বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি সারা দেশে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষাগত প্রবেশাধিকার প্রসারে শিক্ষকদের অপরিহার্য ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়। এ ব্যবস্থাটি প্রথমবারের মতো শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় বেতন কাঠামোর অধীন নিয়ে আসে। প্রাথমিকভাবে এমপিও ব্যবস্থা বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া শুরু হয়, এটি তখন তিন মাস পরপর বিতরণ করা হতো। বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য চাকরিবিধি প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে চাকরির নিশ্চয়তা, শৃঙ্খলা ও শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়। মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মাদরাসা শিক্ষকতা পেশাকে সুসংহত করা হয়। ১৯৮০ সালে নিরক্ষরতা দূরীকরণে গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। যার মাধ্যমে ৪০ লাখের অধিক মানুষ অক্ষরজ্ঞান লাভ করে।
১৭ সেপ্টেম্বর আমরা পালন করি ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ আর ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় কোষাগার থেকে বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া এবং চাকরিবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নসহ শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষকদের কল্যাণে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনন্য অবদানের জন্য তিনি এ দেশের শিক্ষক সমাজের মধ্যমণি হয়ে আছেন। তাই তার জন্মদিন ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস সরকারিভাবে পালনের দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ। জিয়ার স্মৃতিকে অম্লান রাখতে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি এবং বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিয়াম মিলনায়তনে শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার প্রথম চেক বিতরণী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শহিদ জিয়ার জন্মদিবস ১৯ জানুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে তৎকালীন সরকার এ দিবসটি চালু করে। কিন্তু দিবসটি সেভাবে প্রচার-প্রচারণা ও গুরুত্ব পায়নি। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং জাতি সুদিনের অপেক্ষায় দিন গুনছে যেটির সূত্রপাত আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে হবে বলে সবাই আশা করছে।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলেন বেসরকারি শিক্ষকরা তখন সরকার থেকে বেতন পেতেন না। জিয়াউর রহমান শিক্ষকদের জন্য ৩০ শতাংশ বেনিফিট চালু করেন। ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়া সেটিকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করেন। তার আগের সরকারও ধাপে ধাপে এটি বৃদ্ধি করে। তিনি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন মওকুফ ও উপবৃত্তি চালু করেন, যা নারী শিক্ষায় এক অনন্য অবদান রেখে চলেছে। বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার বিস্তারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে সেটিও বেগম খালেদা জিয়ার আমলে।
শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, আমাদের দেশে ন্যূনতম ভালো একটা শিক্ষাব্যবস্থা এ পর্যন্ত তৈরি হয়নি যে দাবিটি সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই উঠে এসেছে। আমাদের শিক্ষায় নানা ধরনের বৈষম্য রয়েছে। অল্প লোক ইংরেজিতে শিক্ষিত হয়েছে। শতকরা তিন থেকে চার ভাগ লোক ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে পরেন। তার মানে দেশটা দুই ভাগে বিভক্ত। একইভাবে ভালো কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি হয়নি সেটাও শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্বলতার জন্য। নিরক্ষরতা দূর করতে জিডিপির কমপক্ষে ছয় ভাগ খরচ করতে হয়, যা ইউনেস্কো বলেছে সেই ১৯৬৮ সালে। কিউবা ১০ থেকে ১১ ভাগ জিডিপি খরচ করে তার নিরক্ষরতা দূর করেছে। আমরা সেই দুই ভাগের কাছাকাছি। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন যে উদ্দেশ্যে, সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি এবং মাধ্যমিক শিক্ষকরা বঞ্চিত বলে সমস্যা যেন আরও বেড়ে গেছে।
শিক্ষা ও গণতন্ত্রকে অপরিহার্যভাবে একত্রিত করেছেন মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই। তার মতে শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, নিরস ও প্রাণহীন। এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি শিক্ষাকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে নাকি কেবল উন্নয়ন সূচকের একটি পরিসংখ্যানমূলক খাত হিসেবে দেখছে? ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি তার পেডাগজি অব দ্য আপ্রেসড বইয়ে বলেছেন শিক্ষা মানুষকে কেবল তথ্যগ্রাহী ক্রীড়নক হিসেবে নয়, সচেতন ও দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এই সময়ে জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপরোক্ত বিষয়গুলোর সুস্পষ্টতা নির্ধারণে সহায়তা করতে হবে।
জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যে, শিক্ষার শক্তি রাষ্ট্র ও সমাজকে আলোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে যাতে তার সম্ভাবনাকে সীমিত করে একটি স্বার্থপর, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে বন্দি করে না ফেলে। শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আরও সুস্পষ্ট ও সুসংহত হতে হবে, সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার গুণগত মান কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে পরিমাপ যায় না, এটি নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মানবিকতা, পেশাগত নৈতিকতা ও আত্মসম্মানবোধ চর্চা, গবেষণার স্বতন্ত্র পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কল্যাণমুখী সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, শিক্ষার দর্শন ও নৈতিক কাঠামো নিয়ে যদি নীরবতা বজায় থাকে, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক, অস্থায়ী এবং গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাবশূন্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে প্রশাসনিক খাতের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেটি যাতে না হয়, শিক্ষক সমাজকে সেই প্রতিজ্ঞাই গ্রহণ করতে হবে আজ।








