শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৯

চার শতকের ইতিহাসে মোড়ানো বাখরপুর জামে মসজিদ

কবির হোসেন মিজি
চার শতকের ইতিহাসে মোড়ানো বাখরপুর জামে মসজিদ

মেঘনা নদীর মৃদু ও শীতল হাওয়া যেখানে এসে দোলা দিয়ে যায়, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে তিন গম্বুজের এক নীরব স্থাপনা। ইট, চুন আর সুরকির গায়ে লেগে আছে চার শতকের স্মৃতি। এটি চাঁদপুর সদর উপজেলার বাখরপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ

মসজিদটির কাছে পৌঁছাতেই প্রথমে চোখে পড়ে এর গাম্ভীর্য। কোনো জাঁকজমক নেই, নেই আধুনিক নকশার ঝলক। তিনটি গম্বুজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা ইতিহাসের ভার বহন করছে নিরবে। মেঘনার এতো কাছাকাছি হয়েও স্থাপনাটি অদ্ভুতভাবে দৃঢ়, ঠিক যেমন বহু বছর ধরে টিকে থাকা মানুষের বিশ্বাস

স্থানীয়দের কথায়, এই মসজিদের সঠিক নির্মাণ সাল কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তবে নির্মাণশৈলী, দেয়ালের পুরুত্ব আর গম্বুজের ধরণ দেখে সহজেই বোঝা যায় এটি মোগল আমলের স্থাপত্য১৭শ' শতকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রে এ অঞ্চলে আগত মুসলিম বণিকদের হাত ধরেই এমন মসজিদ গড়ে উঠেছিলো বলে ধারণা করা হয়। বাখরপুর জামে মসজিদ সেই ইতিহাসেরই জীবন্ত চিহ্ন।

IMG 20260314 WA0012

মসজিদের মূল ভবনটি তুলনামূলক ছোট, তবে তার গঠন ভীষণ শক্তচুন ও সুরকির তৈরি মোটা দেয়াল, সারিবদ্ধ খুঁটি আর পাঁচটি দরজা আজও বহন করে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলের সাক্ষ্য। ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে তিন গম্বুজের নিচে হাতে আঁকা নকশার চিহ্ন, যা সময়ের সঙ্গে অনেকটাই ঝাপসা হলেও এখনো সৌন্দর্যের আভাস দেয়। মূল মিম্বারের দু পাশে দুটি মেহরাব মসজিদটির ধর্মীয় কাঠামোকে পরিপূর্ণ করেছে।

একসময় এই মসজিদ নিয়ে মানুষের মনে অনেক ভয় ছিলো। সংস্কারের অভাবে গাছ-ঝোপে ঢাকা পড়ে থাকায় অনেকে এটিকে ‘জ্বীনের মসজিদ’ বলেও ডাকতো। সন্ধ্যার পর কেউ আসতে চাইতো না। কিন্তু গত চার থেকে পাঁচ দশকে এলাকাবাসীর উদ্যোগে ধীরে ধীরে চেহারা বদলাতে থাকে মসজিদটির। মূল স্থাপনার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার করা হয়, যোগ হয় মুসল্লিদের সুবিধার জন্যে বর্ধিত অংশ।

বর্তমানে মূল মসজিদে দেড় শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বর্ধিত ভবনসহ জুমার দিনে একসঙ্গে প্রায় চার শতাধিক মানুষ এখানে নামাজ পড়েন। মসজিদের পাশে রয়েছে ঈদগাহ ও পুকুর, যা পুরো এলাকাটিকে দিয়েছে এক পরিপূর্ণ ধর্মীয় পরিবেশ

এই মসজিদকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসও কম নয়। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসেন কেবল দেখতে, আবার কেউ কেউ মানত করে নামাজ আদায় করেন। অনেকের বিশ্বাস, এখানে এসে দোয়া করলে মন শান্ত হয়। এই বিশ্বাসই হয়তো চার শতক ধরে মসজিদটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মসজিদটির গুরুত্ব স্বীকৃত। এটি চাঁদপুরের ইতিহাসের একটি অংশযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ মসজিদ এলাকাকে আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

চারপাশে নদীর শব্দ, বাতাসে পুরানো ইটের গন্ধ আর তিন গম্বুজের ছায়া মিলিয়ে বাখরপুর জামে মসজিদ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, চারশো বছর আগের কোনো এক সময় থেকে কেউ এখনো নিঃশব্দে প্রার্থনার ডাক দিয়ে যাচ্ছেন

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়