শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:১৪

১২৭ বছরের ঐতিহ্য, ৭.৮৩ একর জমি, ২৮০০ শিক্ষার্থী— জাতীয়করণের অপেক্ষায় বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

আব্দুল্লাহ আল মামুন।।
১২৭ বছরের ঐতিহ্য, ৭.৮৩ একর জমি, ২৮০০ শিক্ষার্থী— জাতীয়করণের অপেক্ষায় বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

১২৭ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস, নিজস্ব ৭.৮৩ একর জমি, বিশাল খেলার মাঠ, দুটি পুকুর, আধুনিক অবকাঠামো ও বিজ্ঞানাগার এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। শতবর্ষ পেরিয়ে শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রাখলেও দীর্ঘ দিনেও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের তালিকায় স্থান পায়নি। এবার এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠটিকে সরকারি করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। ১৮৯৯ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুরহাটে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিলো অবহেলিত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমিক ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পত্রমিতালির স্মৃতি

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও বিদ্যাপীঠটির তৎকালীন প্রধানদের পত্রমিতালি ছিলো। ফলে প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই এটি কেবল একটি স্থানীয় বিদ্যালয় নয়, বরং বৃহত্তর অঞ্চলের জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সাফল্যের ধারাবাহিকতা ও কৃতী শিক্ষার্থী

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় প্রায় ১,৬০০ এবং ১৯৯৫ সালে চালু হওয়া কলেজ শাখায় প্রায় ১,২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে জেলাজুড়ে সুনাম ধরে রেখেছে বিদ্যাপীঠটি। প্রতিবছরই এখানকার শিক্ষার্থীরা বুয়েট, মেডিকেল কলেজ ও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।

এ প্রতিষ্ঠানের বহু সাবেক শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে শিক্ষা, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায় অবদান রাখছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ড. সবুর খান এবং ক্যানসার শনাক্তকরণ গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত গবেষক ড. আবু আলী ইবনে সিনহা।

জাতীয়করণের উপযোগী পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো

জাতীয়করণের দাবির পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি—প্রতিষ্ঠানটির বিশাল নিজস্ব সম্পদ ও অবকাঠামো। প্রায় আট একর জমির ওপর বিশাল খেলার মাঠ, দুটি পুকুর, স্কুল ও কলেজের পৃথক ভবন এবং আধুনিক বিজ্ঞানাগার রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, “দেশে যদি ১০টি প্রতিষ্ঠানও জাতীয়করণ করা হয়, তবে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ তার মধ্যে স্থান পাওয়ার যোগ্য। আমাদের বিশাল জমি, উন্নত অবকাঠামো ও নিজস্ব আয় রয়েছে। এটি সরকারি করা হলে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়বে না, বরং শিক্ষার্থীরা স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাবে।”

স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক পরিষদের জেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমান জুয়েল এবং কলেজ শাখার শিক্ষক মো. রাসেল মিয়া জানান, যাতায়াতের সুবিধার কারণে চারপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ পরিবারের সন্তানরা এখানে পড়তে আসে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হলে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।

সরকারের তথ্য তলব ও আশার আলো

চাঁদপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল্লাহ জানান, সরকার ইতোমধ্যে শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য চেয়েছে এবং জেলা শিক্ষা অফিস থেকে বাবুরহাট বিদ্যালয় ও কলেজের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক-২ বরাবর বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি পাঠানো হয়েছে। এই পদক্ষেপের পর জাতীয়করণের দাবিটি নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

১২৭ বছরের পুরানো এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠকে জাতীয়করণ করা হলে শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে না, বরং চাঁদপুর সদরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়