প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০০:৩৪
ভিক্ষাবৃত্তি না ব্যবসা?

চাঁদপুর শহরে দিন দিন চোখে পড়ার মতো বাড়ছে ভিক্ষাবৃত্তি। শহরের ব্যস্ততম সড়ক, চাঁদপুর কোর্ট স্টেশন, ওয়ান মিনিট মোড়, ঢাকা হোটেলের সামনে, কালীবাড়ি মন্দির ও বায়তুল আমীন মসজিদের সামনে এখন প্রায় প্রতিদিনই ভিক্ষুকদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে—এটি কি নিছক দারিদ্র্যের চিত্র, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সংগঠিত চক্র?
ওয়ান মিনিট থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত মাত্র ২০ থেকে ৫০ গজের মধ্যেই প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ জন ভিক্ষুককে অবস্থান নিতে দেখা যায়। কেউ সড়কের ওপর শুয়ে গড়াগড়ি করছেন, মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। কেউ বসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন পথচারীদের দিকে। এ ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের চাপ যেমন আছে, তারচেয়েও বেশি মানুষ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেন। ফলে ভিক্ষুকদের উপস্থিতিতে সড়ক আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। যারা ভিক্ষা করছেন, এদের মধ্যে আছেন প্রতিবন্ধী, হাত-পা ভাঙ্গা ব্যক্তি ও বয়স্ক অন্ধ মানুষ। তবে স্থানীয়দের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই একই ব্যক্তিদের প্রতিদিন একই জায়গায় দেখা যায়, যা সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।
চাঁদপুর কোর্ট স্টেশন থেকে সামান্য সামনে রেলওয়ে হকার্স মার্কেট সংলগ্ন সাবেক শপথ চত্বর (বর্তমান আল্লাহু চত্বর) মোড়ে গেলেও একই দৃশ্য। সেখানে ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত ভিক্ষুককে দেখা যায়। বিশেষ করে ট্রেন আসার সময় এবং নামাজের সময় তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। অনেকে অন্ধ বা শারীরিকভাবে অক্ষম বলে পরিচয় দেন। পথচারীদের সহানুভূতি আদায়ে বিভিন্ন কৌশলও চোখে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় রেলওয়ে বায়তুল আমীন জামে মসজিদের সামনে। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত ভিক্ষুক মসজিদের সামনে অবস্থান নেন। এর মধ্যে ছোট ছোট শিশুকে দিয়েও ভিক্ষা করানো হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রচলিত শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে শিশুর প্রতি শোষণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবুও প্রকাশ্যেই শিশুদের এভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কে যারা শুয়ে গড়াগড়ি করে ভিক্ষা করেন, তাদের পেছনে একজন ‘সরদার’ রয়েছে। কিছুক্ষণ পরপর একজন ব্যক্তি এসে তাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় এবং তাদের তদারকি করে। তবে ভিক্ষুকদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ধারণা করা হচ্ছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।
পথচারী সাধারণ মানুষ অভিযোগ করে, এসব ভিক্ষুক মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের দাবি, প্রকৃত অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের জন্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও পূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হোক।
পথচারীদের মতে, প্রকৃত অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের জন্যে সরকারি বা বেসরকারি পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের দিয়ে ভিক্ষা করানো বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। চাঁদপুর শহরের মানবিক মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।








