প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৫
বিস্মৃতির অতলে চাঁদপুরের ‘অখ্যাত বীর’
ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী কিংবদন্তি সাঁতারু আব্দুল মালেক

দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে ব্রজেন দাসের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও, তাঁর ঠিক পরেই বিশ্বমঞ্চে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেছিলেন আরও এক অদম্য জলপুত্র। তিনি আব্দুল মালেক। ১৯৬৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড অভিমুখে সাঁতার কেটে সফলভাবে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন চাঁদপুরের এই কৃতি সন্তান। কিংবদন্তি ব্রজেন দাসের পর তিনি ছিলেন ইংলিশ চ্যানেল জয় করা দ্বিতীয় বাংলাদেশি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি) সাঁতারু । অথচ প্রচারবিমুখ এই গুণী অ্যাথলেট আজ নিজ জেলা চাঁদপুরেও এক ‘অখ্যাত বীর’ হিসেবে পরিচিত।
|আরো খবর
সফলতার নেপথ্যে হার না মানা গল্প
আব্দুল মালেকের চ্যানেল জয়ের পথটি সহজ ছিলো না। ১৯৬৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রচেষ্টায় টানা ১২ ঘণ্টা সাঁতার কেটেও তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন । তবে দমে যাননি এই লড়াকু সৈনিক। ইংল্যান্ডে কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যান এবং দীর্ঘ তিন বছর পর ১৯৬৬ সালে ১৩ ঘণ্টা ৪২ মিনিটে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড প্রান্তে পৌঁছে ইতিহাস গড়েন। যদিও কিছু দেশীয় নথিতে এই জয়ের সাল ১৯৬৫ উল্লেখ করা হয়, তবে অফিসিয়াল ‘চ্যানেল সুইমিং ডোভার’ রেকর্ড অনুযায়ী সঠিক সালটি হলো ১৯৬৬।
বিশ্বমঞ্চে প্রথম আলোড়ন
চ্যানেল জয়ের আগেই আব্দুল মালেক নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে। ১৯৬৩ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ৩৩ মাইলের বিশ্ব দূরপাল্লার সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি সমগ্র বিশ্বে ৪র্থ এবং এশিয়া মহাদেশের সাঁতারুদের মধ্যে ১ম স্থান অধিকার করেন। নিজ জেলা চাঁদপুরেও তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। ১৯৬৪ সালে চাঁদপুর শহরের বর্তমান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কে হাসান আলী হাই স্কুল মাঠের সম্মুখস্থ চাঁদপুর লেকে একটানা ৩৫ মাইল সাঁতার কেটে তিনি স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৬৫ সালে নারায়ণগজ্ঞ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত আয়োজিত দূরপাল্লার সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক দেশপ্রেমিক
আব্দুল মালেক কেবল একজন ক্রীড়াবিদই ছিলেন না, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন কৃষি প্রকৌশলী। চ্যানেল জয়ের পর তিনি লন্ডনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং সেখানে সাঁতার প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিদেশের মাটিতে থেকেও তিনি দেশের টানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তৎকালীন প্রতিকূলতায় সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও লন্ডনে অবস্থানরত বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করেন । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংগৃহীত সেই অর্থ তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন ।
শেষ বিদায়
প্রচারণা থেকে দূরে থাকা এই চিরকুমার গুণী মানুষটি ১৯৮৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তাঁর অকাল প্রয়াণে দেশ এক রত্নকে হারায় । আজ তাঁর সেই অনন্য কীর্তিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের দাবি, যাতে চাঁদপুরের এই ‘অখ্যাত বীর’ তাঁর যোগ্য সম্মান ফিরে পান। সূত্র : মামুনুর রশিদের ফেসবুক পেইজ।
তাঁর নামে যা হয়েছে, হয়নি আর যা হওয়া দরকার
বিশ্বখ্যাত সাঁতারু আব্দুল মালেককে সরকার মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার, একুশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কার দিতে পারতো, দুঃখজনকভাবে সেটা দেওয়া হয় নি। সেটা দেওয়ার ব্যাপারে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো যেতে পারে।
অবশ্য চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা চাঁদপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে নির্মিত তাদের প্রথম দ্বিতল ভবনটিকে ‘মালেক ক্রীড়া ভবন’ হিসেবে নামকরণ করে ন্যূনতম শ্রদ্ধা জানিয়েছে। কিন্তু কে এই আব্দুল মালেক সেটা কোনো ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড বা স্থায়ী ফলকে লিখে ‘মালেক ক্রীড়া ভবন’ কিংবা চাঁদপুর স্টেডিয়ামের কোথাও ঠাঁই দেয় নি। চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা দেরিতে হলেও এই খ্যাতিমান সাঁতারুকে বর্তমান ও উত্তর প্রজন্মের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারে। জেলা ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃপক্ষ কিংবা অন্য কেউ চাঁদপুর লেকের পাড়ে সুবিধাজনক স্থানে ‘এই লেকেই সাঁতার কেটেছিলেন চ্যানেল বিজয়ী সাঁতারু আব্দুল মালেক’ শিরোনামে তাঁর জীবনী সম্বলিত একটি সুদৃশ্য বিল বোর্ড স্থাপন করতে পারে।







