শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৯

জনতার দরজায় জনপ্রতিনিধি: পানির গন্ধে রাজনীতির দায়বদ্ধতা!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
জনতার দরজায় জনপ্রতিনিধি: পানির গন্ধে রাজনীতির দায়বদ্ধতা!
ছবি :জনতার এমপি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক।

চাঁদপুরের পুরান বাজারের ১ নং ওয়ার্ডের রিফুজি কলোনি। চাঁদপুরের পুরানবাজারের ১ নং ওয়ার্ডের রিফুজি কলোনি। ঘিঞ্জি গলি আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের মাঝে সরাসরি ট্যাপের পানি শুঁকে দেখছেন, পরখ করছেন এর স্বচ্ছতা। সাধারণ কোনো পরিদর্শক নন, তিনি স্বয়ং সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। এই দৃশ্যটি বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যতটা বিরল, ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথা ভাঙার রাজনীতি: গ্লাসের পানিতে জনদুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি

সাধারণত আমরা অভ্যস্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে জনপ্রতিনিধিদের ফাইল সই করার দৃশ্যে। কিন্তু রিফুজি কলোনির বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—সাপ্লাইয়ের পানি মুখে নেওয়ার অযোগ্য। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এমপি মানিক সরাসরি কলোনির অলিগলিতে হাজির হন।

একজন আইনপ্রণেতা যখন নিজে পানি পরীক্ষা করেন, তখন তা কেবল একটি 'ফটোসেশন' থাকে না; বরং তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর (পৌরসভা বা ওয়াসা) গাফিলতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়ায়। এটি জনগণের মৌলিক অধিকার—নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার লড়াইয়ে একটি সরাসরি সংকেত।

ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নাকি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান?

এই ঘটনাটি সামনে এনেছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:

তৎক্ষণাৎ সমাধান বনাম টেকসই ব্যবস্থাপনা: একজন এমপির সরাসরি উপস্থিতি তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি মজবুত মনিটরিং ব্যবস্থা।

জবাবদিহিতার সংস্কৃতি: যখন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নিজে মাঠে নামেন, তখন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। এটি কি নিয়মিত প্রথা হয়ে উঠবে?

আস্থার সংকট নিরসন: সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী যখন দেখে তাদের সাংসদ তাদেরই টিউবওয়েলের পানি স্পর্শ করছেন, তখন রাজনীতির প্রতি হারিয়ে যাওয়া আস্থা কিছুটা হলেও ফিরে আসে।

ভোটের রাজনীতি বনাম ভাতের (ও পানির) অধিকার

নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এ দেশের রাজনীতির চিরচেনা সংস্কৃতি। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার দৃষ্টান্তই একজন রাজনীতিবিদকে 'জননেতা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রিফুজি কলোনির বাসিন্দাদের পানির দুর্গন্ধ দূর করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার অধিকার। শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের এই পদক্ষেপ বার্তা দিচ্ছে যে—"রাজনীতি তখনই সার্থক, যখন তা এসি রুম থেকে বেরিয়ে সাধারণের ড্রেন আর পানির লাইনের সমস্যার সমাধান খোঁজে।"

পরিবর্তনের এই মডেলে কী আছে আগামীর জন্য?

এই ঘটনাটিকে একটি মডেল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কেবল চাঁদপুর নয়, সারা দেশের জনপ্রতিনিধিরা যদি এভাবে নিজ নিজ এলাকার বাস্তব সংকটগুলো নিজের চোখে দেখেন, তবে কর্মকর্তাদের ফাইলবন্দি আশ্বাসের প্রয়োজন পড়বে না।

"পানির স্বচ্ছতা পরিমাপের মাধ্যমে আসলে রাজনীতির স্বচ্ছতাই মাপছেন সাধারণ মানুষ।"

এখন দেখার বিষয়, এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ কি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে? চাঁদপুর কি নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সারা দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারবে? উত্তরটি সময়ের হাতে, তবে শুরুটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং প্রতিশ্রুতিশীল।

লেখক: অধ্যাপক মোঃ জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি, সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়