প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৫
গাইড বইয়ের বিপরীতে একটা নির্মোহ প্রস্তাবনা

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গাইড বা সহায়ক বই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে যেন এক অনিবার্য উপাদান। কোনোক্রমেই যেন শিক্ষার্থীরা গাইড বই ব্যতিরেকে পাঠ চুকাতে পারছে না। ফলে বাজারে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য চূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। এ কারণে প্রকাশনীর নানাবিধ কৌশলের বেড়াজালে আটকে আছে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী। অথচ গাইড বইনির্ভর যাতে শিক্ষা কার্যক্রম না হয়—তার জন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। পাঠ্যক্রম সেভাবে তৈরি হলেও বাস্তবায়নের আয়োজনে ঘাটতিও আছে।
গাইড বইয়ে যাতে শিক্ষার্থীরা আদিষ্ট না হয়, তার জন্য সরকারি মহল ছাড়াও বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মহল দিব্যি সমালোচনার নহর বইয়ে দেয়—এতে কোনো কুণ্ঠাবোধ নেই। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, গাইড বই কি বায়বীয় তথা হাওয়াই হয়ে এসে শিক্ষার্থীর টেবিলে জুড়ে বসে? তা তো নয়।
গাইড বই তো বাংলাবাজার কিংবা দেশের কোনো না কোনো এলাকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এ ঘটনা তো গোপন নয়, বরং উন্মুক্ত। দেশের সংশ্লিষ্ট সকল মহল গাইড বই প্রকাশের তথ্য জানে না—তা অবিশ্বাস্য ঠেকে। তাহলে গাইড বই প্রকাশ অবধারিত করতে কারা গোপনে কড়া নাড়ছে?
গভীরভাবে লক্ষ করা গেছে যে, সহায়ক বই বিক্রিতে শুধু প্রকাশনীসহ খুচরা বিক্রেতারা যে লাভবান হচ্ছে তা কিন্তু নয়; এর সাথে সম্পৃক্ত আছেন শিক্ষকরাও। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাতে প্রকাশনী কিংবা লাইব্রেরির মাধ্যমে উপঢৌকন নিচ্ছেন। এর একটি অংশ শিক্ষক-কর্মচারীগণ পাচ্ছেন, আরেকটি অংশ প্রধান শিক্ষক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা পেয়ে থাকেন। আবার কোনো ক্ষেত্রে বড় অংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়ে নেন, বাকি অংশ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
এদিকে এ নিয়ে অনেককে আবার উপরভাসা সমালোচনা করতে দেখি। তাদের মতে, অধিক টাকা নিয়ে মানসম্মত বই তালিকায় না নিলে শিক্ষার্থীরা মানহীন হয়ে গড়ে উঠবে, তাই শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু পাবে না। তবে আমার আপত্তি সেই জায়গায় নয়। গাইড বই যদি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা অর্জনে প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে গাইড বই কেনার ক্ষেত্রে মানসম্মত কিংবা মানহীনতার প্রশ্ন নিশ্চয়ই অবান্তর।
তবে আমার প্রস্তাবনা হচ্ছে, পাঠ্যপুস্তকে সৃজনশীল প্রশ্ন ও কিছু বহুনির্বাচনী প্রশ্নের নমুনা দেওয়া থাকে। শিক্ষার্থীরা প্রথমেই এই সব প্রশ্নের সমাধান করে থাকে এবং এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সে কারণে এই নমুনা প্রশ্ন কিছু বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। উদাহরণস্বরূপ : প্রতিটি অধ্যায় শেষে অন্তত ৫টি রচনামূলক সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর এবং অন্তত ১০টি উত্তরবিহীন প্রশ্ন সন্নিবেশ করা যেতে পারে। উত্তরবিহীন ১০টি প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থীরা নিজে নিজে বের করবে এবং এর সঠিকতা যাচাই ও পরামর্শের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের সহযোগিতা নেবে। পরীক্ষায় পাঠ্যপুস্তকের নমুনা প্রশ্ন না দেওয়াই উচিত হবে। কারণ প্রশ্নের ধরন বুঝতে এবং সমাধানের সক্ষমতা অর্জনে নমুনা প্রশ্ন পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। আমরা হামেশাই দেখে থাকি, বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাজারের গাইড বই থেকে হুবহু উদ্দীপকসহ নমুনা প্রশ্ন দেওয়া হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীরা বরাবরই গাইড বইয়ের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে করতে সময় সাবাড় করে দিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, একেকটি অধ্যায়ে অন্তত চার-পাঁচশত বহুনির্বাচনী প্রশ্ন দেওয়া থাকে। কার্যত সৃজনশীল মেধা বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। সেই সেকেলে পদ্ধতিতেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পথ চলছে। ফলে শিখনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না; শিক্ষার পথ সুগম না হয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের পথ হলো—পাঠ্যপুস্তকে প্রশ্নের সমাধানসহ ও সমাধানবিহীন অন্তত ১৫টি প্রশ্নের একটি প্রশ্নব্যাংক অধ্যায়ভিত্তিক যুক্ত করে দেওয়া।
আরেকটি চরম সংকটের কথা বলা দরকার। সরকারপ্রদত্ত বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ বইয়ে পর্যাপ্ত রসদ না থাকায় এ দুটোর জন্য প্রাসঙ্গিক বই বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি গ্রামারে যেসব উপাদান দেওয়া হচ্ছে তা খুবই অপ্রতুল। এতটুকু পাঠ অনুশীলন করলে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে তা অনেক কম হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে অনুশীলনের পর্যাপ্ত রসদ দিতে হবে এবং ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজির বাংলা অনুবাদ করে দিলে শিক্ষার্থীদের পাঠোদ্ধার করতে সুবিধা হবে। পাশাপাশি ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ১ম পত্রের প্যাসেজগুলোর বাংলা অনুবাদও জরুরি।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, যুক্তরাজ্যে সহায়ক বইয়ের প্রচলন আছে। সেখানে ঈএচ ইড়ড়শং বা চবধৎংড়হ-এর তৈরি রিভিশন গাইড ও ওয়ার্কবুক মূল কারিকুলামের সহায়ক হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে এ মাধ্যমটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেখানকার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা এটি নিয়মিত ব্যবহার করে। এগুলো সরকার কর্তৃক সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও সহায়ক বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি আছে। এসব বই পাঠ্যবইয়ের জটিল বিষয়গুলোর সমাধান করে থাকে।
অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাতেও মূল বইয়ের বাইরে সহায়ক বই শ্রেণিকক্ষে যুক্ত করে শিখন-শেখানো কাজ সুগঠিত করা হচ্ছে। এগুলোকে ‘স্টাডি বুক’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠ্যবইয়ের সাথে প্রশ্নব্যাংক যুক্ত করে দেওয়া হয় ব্যাপক অনুশীলনের জন্য। বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের সাথেও প্রশ্নব্যাংক যুক্ত করে দিলেই বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
এখানে আলোচনা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষই নিম্নবিত্ত। তাই বর্তমান সময়ে সন্তানদের লেখাপড়া করানো আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। শিক্ষা উপকরণ এবং প্রাসঙ্গিক বই কিনতে পরিবারের উপার্জনের সিংহভাগ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার ব্যয়ভার নির্বাহ করতে গিয়ে পরিবারের জন্য খাদ্যের জোগান দিতে ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাহুল্য নয় যে, পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা এখন আরও বেপরোয়া; বিশেষ করে প্রকাশনীগুলোর দৌরাত্ম্য। গাইড বই নির্ধারিত মূল্যে অর্থাৎ গায়ের দামে কিনতে হচ্ছে, কোনো কমিশন দেওয়া হচ্ছে না। বিক্রেতারা প্রকাশনী ও পুস্তক বিক্রেতা সমিতির উপর দায় চাপাচ্ছেন। এটি একটি পথভ্রষ্ট সিন্ডিকেট। এ কারণে শিক্ষাব্যবস্থা আরও বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
প্রকাশনীর আরেকটি অপকৌশল উন্মোচন না করা অন্যায় বৈ কিছু নয়। সেটা হলো, বিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজি ব্যাকরণ বই পাঠ্য করার সাথে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে, প্রকাশনীর গাইড বইও চালিয়ে দিতে হবে। বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে, প্রকাশনী গাইড বই প্রকাশ করে তেমন কোনো মুনাফা করতে পারছে না; যেন কেবল ব্যাকরণ দুটোতেই তাদের মুনাফা ও যাপিত জীবন!
হতবাক হওয়ার বিষয় হলো, বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণের চেয়ে গাইড বইয়ের সংখ্যা ১০–১২টিরও অধিক। দুটো ব্যাকরণের কাঁধে ভর দিয়ে তারা গাইড বইগুলো বিক্রি করছে।
আরেকটি দিক লক্ষণীয় যে, আগে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কেন্দ্রে অবস্থান করত। এখন অতি কৌশলে এর প্রভাব প্রান্তিকের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে; অর্থাৎ সিন্ডিকেট আরও বড় হয়েছে। যদিও এ ঘৃণিত সিদ্ধান্তের সুফল খুচরা বিক্রেতারা কতটুকু পেয়ে থাকেন, তাতে আমি সন্দিহান।
প্রসঙ্গত, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে প্রকাশনী ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়ানোর কথা। কিন্তু কোনো দ্বন্দ্ব যদি না থেকে থাকে, তবে বুঝতে হবে প্রান্তিক বিক্রেতা থেকে যারা নেতা বনে গেছেন, তারা নেহাতই প্রকাশনীর মালিকদের দাসত্ব বরণ করেছেন এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের স্বার্থে কুঠারাঘাত করছেন। এরা সর্বোপরি প্রকাশনীর মালিকদের অনুগত দাস হয়ে গেছেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে যেমনই করুক না কেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যাই হোক, প্রকাশনীর মালিক এবং খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে গলায় গলায় পিরিত কতটুকু আছে বা নেই, সেটা এই নিবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় নয়।
এ দেশের গরিব শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পর্যায়ের গাইড বই ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা চড়া মূল্যে কিনে রীতিমতো সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী বই কিনতে না পেরে লেখাপড়া থেকে বিচ্যুত হচ্ছে এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে লক্ষ লক্ষ কোমলমতি শিক্ষার্থী। তাহলে প্রতিবছর রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা অনর্থক নয় কি? সরকারের এমন সদুদ্দেশ্য কেবল ব্যাহতই হচ্ছে না, বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের এটি একটি অন্যতম উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। সে মতে, সরকার কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে গাইড বইয়ের অভাব দূর করতে হবে। উপরে যে প্রস্তাবটি করা হলো, এর চেয়ে আরও জুতসই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অবশ্যই সাধুবাদ জানাবো। তবুও আমার দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাক এবং তার সাথে সাথে প্রতিটি শিক্ষার্থী হয়ে উঠুক সুনাগরিক ও বিশ্বনাগরিক—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি : সভাপতি, বাংলাদেশ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি।







