প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৪
বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি

আধুনিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক গতি—সবকিছুর সঙ্গেই বিদ্যুতের সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। একবিংশ শতাব্দীতে বিদ্যুৎ এখন আর শুধু একটি সুবিধা নয়; এটি মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রা ও জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। ফলে জনগণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় বিদ্যুৎ খাতকে যুগোপযোগী সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আরও কার্যকর, নির্ভরযোগ্য ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গত কয়েক দশকে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুতের সংযোগ বিস্তৃত হয়েছে। শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সেচব্যবস্থা এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার এবং অনলাইনভিত্তিক সেবার সম্প্রসারণের ফলে বিদ্যুতের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয় না; উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সঞ্চালন ও আধুনিক বিতরণব্যবস্থা। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। গরমের সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ বিশেষ কষ্টে পড়েন। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। কৃষিক্ষেত্রে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হলে ফসল উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ শুধু নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে না, জাতীয় অর্থনীতির গতিকেও মন্থর করে দেয়।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—এই তিনটি স্তরকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা, সাবস্টেশনের সক্ষমতার ঘাটতি কিংবা বিতরণব্যবস্থার ত্রুটির কারণে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকেন্দ্রিক হলে চলবে না; জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুরোনো সঞ্চালন লাইন সংস্কার, আধুনিক সাবস্টেশন স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিতরণ লাইন উন্নয়নের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক স্মার্ট গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া, কোথায় ত্রুটি হয়েছে তা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা করা সহজ হয়। স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ ও দ্রুত পুনঃসংযোগ ব্যবস্থা চালু করা গেলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বড় এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। শহরের পাশাপাশি ধীরে ধীরে গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকেও আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা। দেশের সব অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা এক রকম নয়। শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা, শহর, গ্রাম ও কৃষিপ্রধান অঞ্চলের চাহিদার ধরন ও সময় ভিন্ন। গ্রীষ্মকালে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও শীতলীকরণ যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে চাহিদা বাড়ে, আবার সেচ মৌসুমে কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চল ও মৌসুমভিত্তিক চাহিদার সঠিক পূর্বাভাস তৈরি করতে হবে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস এবং তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব।
বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণও অত্যন্ত জরুরি। কোনো একটি জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বর্জ্য থেকে জ্বালানি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সৌরশক্তির ব্যবহার এবং উপযোগী এলাকায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনিয়মিত উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা বা এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়নে অবকাঠামোর পাশাপাশি সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রকৃত প্রয়োজন নিরূপণ, ব্যয় ও সুফলের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অযৌক্তিক বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সিস্টেম লস কমানোও বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ লাইন, অবৈধ সংযোগ, মিটারিংয়ের দুর্বলতা এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুতের অপচয় ঘটে। উন্নত মিটারিং ব্যবস্থা, স্মার্ট প্রিপেইড মিটার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক বিতরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। বিদ্যুতের অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়; এটি অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপও কমাতে পারে।
গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নও বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ, বিল, মিটার, ভোল্টেজ সমস্যা কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে সহজে অভিযোগ জানাতে এবং দ্রুত সমাধান পেতে চান। এ জন্য কার্যকর কলসেন্টার, অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হলে গ্রাহকদের আগাম তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।
বিদ্যুতের গুণগত মানের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধু বিদ্যুৎ থাকা যথেষ্ট নয়; ভোল্টেজের ওঠানামা, ঘন ঘন ট্রিপিং এবং নিম্নমানের সরবরাহের কারণে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের পাশাপাশি মানসম্মত ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অপ্রয়োজনে বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা ও অন্যান্য যন্ত্র চালু না রাখা, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ব্যয়বহুল সময়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোর বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করা জরুরি। চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পিক আওয়ারে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, একটি আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। জনগণের চাহিদা, শিল্পায়নের গতি, কৃষির প্রয়োজন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে এখন প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়; প্রয়োজন সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির বিস্তার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি এবং গ্রাহকসেবার উন্নয়ন।
বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে হবে জনগণের স্বার্থ ও প্রকৃত চাহিদাকে। কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কেবল নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, শিক্ষার মান, স্বাস্থ্যসেবা এবং একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত। সময়োপযোগী সংস্কার ও কার্যকর আধুনিকায়নের মাধ্যমেই বিদ্যুৎ খাতকে আরও শক্তিশালী, টেকসই ও জনবান্ধব করা সম্ভব।
লেখক : চিন্তক, কবি ও প্রাবন্ধিক।







