প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৪
মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, একেবারে মুক্ত করার উদ্যোগ!

মাদক নিয়ন্ত্রণের কথা আমরা বহুদিন ধরেই শুনে আসছি। অভিযান হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে, মামলা হয়েছে—তবু মাদকের বিস্তার পুরোপুরি থামেনি। সেই বাস্তবতায় হাজীগঞ্জ উপজেলাকে পর্যায়ক্রমে মাদকমুক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক, উচ্চাভিলাষী এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইবনে আল জায়েদ হোসেনের প্রস্তাবে বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নকে দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত আশাব্যঞ্জক। পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব ইউনিয়নকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন।
হাজীগঞ্জের মাদক-বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার, মজুদ, বিক্রি ও সেবনের সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নাম মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অন্য এলাকার তুলনায় কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে থাকলেও পুরোনো সেই বদনাম একদিনে মুছে যাওয়ার নয়। তাই মাদকমুক্ত হাজীগঞ্জ গড়ার ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি সেই পুরোনো পরিচয় বদলে দেওয়ার একটি বড় সামাজিক প্রত্যয়। তবে ঘোষণা দেওয়া যতটা সহজ, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। মাদক ব্যবসার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ, সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক, প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং তরুণদের একটি অংশের আসক্তি—সবকিছু মিলিয়ে এই উদ্যোগের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। মাদকসেবীকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; প্রয়োজন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ। একই সঙ্গে মাদক বিক্রি ও পাচারের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ ও দৃঢ় প্রয়োগও অপরিহার্য। বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের মধ্যে ভুল ওষুধ বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিভিন্ন ওষুধ সেবনের প্রবণতা নিয়েও যে উদ্বেগ সভায় উঠে এসেছে, সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে তাই শুধু মাদকদ্রব্যের তালিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে তরুণদের স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও নিরাপদ বিনোদনের সুযোগের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা এবং কিছুদিনের ব্যবধানে পুরো হাজীগঞ্জকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ—দুটিকে আমরা বৃহত্তর সামাজিক শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখতে চাই। তবে প্রতিটি উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, ন্যায়সংগত প্রয়োগ এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ওপর।
আমরা চাই, বড়কুল পূর্ব ইউনিয়ন হোক এই অভিযাত্রার সফল প্রথম অধ্যায়। এরপর একে একে হাজীগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন মাদকমুক্তির আওতায় আসুক। শুধু অভিযান পরিচালনা করে নয়—মাদক ব্যবসার পথ বন্ধ করে, মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে এই উদ্যোগকে টেকসই করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, মাদকবিরোধী অবস্থান যেন দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থাকে। মাদকের বিরুদ্ধে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে—এমন আস্থা তৈরি করাই হবে এই উদ্যোগের অন্যতম বড় শক্তি।
আমরা চাই, হাজীগঞ্জ তার দীর্ঘদিনের মাদক-সম্পর্কিত বদনাম থেকে টেকসইভাবে মুক্তি পাক। চাই, মাদকমুক্তির সাফল্য শুধু চাঁদপুর জেলায় নয়, সারা বাংলাদেশে আলোচনার জন্ম দিক। আজ যে উদ্যোগটি বড়কুলে শুরু হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই যেন দেশের অন্যান্য উপজেলা ও জনপদের জন্য অনুসরণযোগ্য একটি অনন্য মডেল হয়ে ওঠে।
চ্যালেঞ্জ অনেক, পথও কঠিন। কিন্তু দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়—হাজীগঞ্জ হোক সত্যিকার অর্থেই মাদকমুক্ত। সফল হোক এই দুঃসাহসিক উদ্যোগ; শতভাগ সফলতা আসুক, আর সেই সাফল্যের সুখ্যাতিতে হাজীগঞ্জের নতুন পরিচয় ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে।








