প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫০
বহু বছর পর আলফু কাকুর সঙ্গে দেখা—স্মৃতির পাতায় এক আবেগঘন সন্ধ্যা

মানুষের জীবনে কিছু কিছু দেখা হয়তো নিছক দেখা নয়—সেগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়ার এক অপূর্ব উপলক্ষ। সময়ের স্রোতে কত মানুষ হারিয়ে যায়, কত সম্পর্ক দূরে সরে যায়, কত পরিচিত মুখ অচেনা হয়ে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ কোনো একদিন বহু বছর পর সেই মানুষগুলোর কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে মনে হয়, সময় যেন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে আসে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে শৈশব-কৈশোরের সেই চেনা দিনগুলো। শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬)—আমার জীবনে তেমনই একটি আবেগঘন ও স্মরণীয় সন্ধ্যা।
আমাদের সহপাঠী বন্ধু মো. মুক্তার আহমেদ প্রধানের জন্মদাতা পিতা মো. আলমাছ প্রধান, যিনি সবার কাছে স্নেহের আলফু কাকু নামে পরিচিত। বয়স এখন ৮৭ বছর। তাঁর বাড়ি পশ্চিম হাতিঘাটা, মতলব উত্তর উপজেলায়।
এই দেখা যেন আমাকে অনেক বছর পেছনে নিয়ে গেল। মনে পড়ে গেল ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সেই দিনগুলোর কথা। বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাঠবাদাম গাছের নিচে বস্তা বিছিয়ে বসতেন আলফু কাকু। তাঁর ছোট্ট সেই দোকানটি ছিল আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও আপন একটি জায়গা। সেখানে পাওয়া যেত বুট, বাদাম, কুকিজ বিস্কুট, সুপার বিস্কুট, বন, তক্তা বিস্কুট, লাঠি বিস্কুট, কেওরা, মটর ভাজা, দেশীয় কলা, গ্লুকোজ বিস্কুট, তিব্বত স্নোসহ আরও কত কী! অল্প দামে নানা রকম খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যেত তাঁর কাছে।
সেই সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর এই ছোট্ট ব্যবসা ছিল অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আনন্দের উৎস। টিফিনের সময় কিংবা ক্লাসের ফাঁকে আমরা তাঁর কাছে ছুটে যেতাম। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—ওটা শুধু একটি ছোট্ট দোকান ছিল না; আমাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরো আবেগ ছিল। কাঠবাদাম গাছের নিচে বসে থাকা সেই মানুষটি ছিলেন আমাদের স্কুলজীবনেরই যেন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমি, ফারুক হোসেন এবং মুক্তার আহমেদ প্রধান—আমরা তিনজন ছিলাম সহপাঠী বন্ধু। একই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি, পাশাপাশি বেড়ে উঠেছি, কত হাসি-আনন্দ, দুষ্টুমি, গল্প আর স্বপ্ন ভাগাভাগি করেছি। ১৯৯৫ সালে আমরা এসএসসি পাস করার পর জীবনের প্রয়োজনে যে যার পথে চলে যাই। তারপর সময়ের ব্যবধানে আর দেখা হয়নি। কে কোথায় আছি, কেমন আছি—জীবনের ব্যস্ততায় সেসব খবরও ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
কিন্তু বন্ধুত্বের স্মৃতি কি কখনো সত্যিই হারিয়ে যায়? হয়তো যায় না। হৃদয়ের কোনো এক গোপন কোণে তা ঠিকই থেকে যায়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় হঠাৎ সেই সুপ্ত স্মৃতির দরজা খুলে গেলো।
বন্ধু ফারুক হোসেন আমাকে মোবাইল ফোনে জানাল—কুমিল্লা ঝাউতলার রয়েল হসপিটালে মুক্তারের মাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে আসবে। সঙ্গে মুক্তারের বাবা আলফু কাকুও এসেছেন। ফারুক বলল, “চলো, দেখে আসি।”
কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো—এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। বহু বছর পর সহপাঠী বন্ধু মুক্তারের বাবা আর স্কুলজীবনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রিয় আলফু কাকুর সঙ্গে। তাই আর দেরি না করে রয়েল হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
হাসপাতালে পৌঁছে গিয়ে দেখি—আলফু কাকু দাঁড়িয়ে আছেন।
সেই মুহূর্তে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো। চোখের সামনে যেন ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই কাঠবাদাম গাছটি ভেসে উঠল। মনে হলো, ৩০-৪০ বছর আগের সেই দিনগুলো যেন আজও কোথাও হারিয়ে যায়নি।
আলফু কাকুর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি ফারুককে চিনতে পারলেন। কিন্তু আমাকে প্রথমে চিনতে পারলেন না। বয়সের ভার, সময়ের ব্যবধান আর জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার স্বাভাবিক পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তখন আমি নিজের পরিচয় দিলাম। আমার কথা শুনে তিনি আমাকে চিনতে পারলেন।
সেই মুহূর্তটি ছিল সত্যিই আবেগঘন।
যে মানুষটি একসময় আমাদের স্কুলের ক্যাম্পাসে বসে আমাদের হাতে বুট, বাদাম কিংবা বিস্কুট তুলে দিতেন, আজ বহু বছর পর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিতে হচ্ছে! সময় কত কিছু বদলে দেয়! মানুষকে বদলে দেয়, চেহারা বদলে দেয়, জীবনকে বদলে দেয়—কিন্তু স্মৃতিকে বদলাতে পারে না।
এরপর আমাদের বন্ধু মুক্তার আহমেদ প্রধানও এসে উপস্থিত হলো। তারপর আমরা চারজন—আমি, ফারুক হোসেন, মুক্তার আহমেদ প্রধান এবং প্রিয় আলফু কাকু—একসঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নিলাম। সেই ছবিটি হয়তো দেখতে সাধারণ একটি ছবি; কিন্তু আমাদের কাছে এটি নিছক ছবি নয়। এর ভেতরে জমে আছে কয়েক দশকের স্মৃতি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
ছবি তোলার পর আমরা চায়ের আড্ডায় মিলিত হলাম। শুরু হলো পুরোনো দিনের গল্প। কথায় কথায় ফিরে এলো সেই বিদ্যালয়জীবন, সহপাঠীদের স্মৃতি, স্কুলের মাঠ, শ্রেণিকক্ষ, টিফিনের সময়, হাসি-ঠাট্টা এবং কাঠবাদাম গাছের নিচে আলফু কাকুর সেই ছোট্ট দোকান।
কত বছর কেটে গেছে!
জীবনের ব্যস্ততায় আমরা সবাই কত দূরে চলে গেছি। কিন্তু আজকের সেই চায়ের আড্ডায় মনে হলো, বয়স যেন আবার একটু কমে গেছে। আমরা যেন আবার সেই স্কুলের ছাত্র—বন্ধুদের সঙ্গে বসে গল্প করছি, হাসছি, আর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের পরিচিত সেই আলফু কাকু।
এরপর মুক্তারের জীবনসঙ্গিনী তাঁর শাশুড়ি—অর্থাৎ মুক্তারের মা—এবং তাঁদের নাতিকে সঙ্গে নিয়ে রয়েল হসপিটালে এসে পৌঁছান। হাসপাতালের পাশেই কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকায় মুক্তার পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে মনে হলো, সময় আমাদের শুধু দূরে সরিয়ে নেয়নি; প্রত্যেককে নিজের নিজের জীবন ও পরিবারের সঙ্গে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে।
বন্ধু মুক্তারকে আমি সবসময়ই একজন ভালো মানুষ হিসেবে দেখেছি। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো অর্থ-সম্পদ নয়; একজন ভালো মানুষ হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই প্রকৃত অর্জন। দীর্ঘদিন পর দেখা হলেও মুক্তারের প্রতি সেই পুরোনো আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় কোনো কমতি অনুভব করিনি।
শুক্রবারের এই সাক্ষাৎ আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল—জীবন আসলে খুবই ছোট। আমরা প্রতিদিন কত ব্যস্ততায় ছুটে চলি, কত মানুষকে হারিয়ে ফেলি, কত স্মৃতি পিছনে ফেলে আসি। অথচ একটি ফোনকল, একটি দেখা, একটি চায়ের কাপ কিংবা একটি পুরোনো ছবি মুহূর্তেই আমাদের বহু বছর আগের জীবনে ফিরিয়ে নিতে পারে।
শুক্রবার সন্ধ্যার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো এটাই—হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে তোলা যায়।
প্রিয় আলফু কাকুকে দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগল। বয়সের ভারে শরীর হয়তো আগের মতো নেই, স্মৃতির পাতাগুলো হয়তো কিছুটা ঝাপসা হয়েছে; কিন্তু তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার জায়গাটি আজও অটুট। ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই কাঠবাদাম গাছের নিচে বসে থাকা আলফু কাকু আমাদের শৈশবের গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে আজও বেঁচে আছেন।
আল্লাহর কাছে আন্তরিক দোয়া করি—প্রিয় মো. আলমাছ প্রধান (আলফু কাকু) সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন এবং নেক হায়াত লাভ করুন। আমাদের বন্ধু মোঃ মুক্তার আহমেদ প্রধান ও তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্য সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিময় জীবন লাভ করুন। তাঁদের পরিবারে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নেমে আসুক।
আর আমার প্রিয় দুই সহপাঠী বন্ধু—ফারুক হোসেন ও মুক্তার আহমেদ প্রধান—তোমাদের সঙ্গে আজকের এই দেখা যেন আবারও আমাদের পুরোনো বন্ধুত্বকে নতুন করে প্রাণ দিল। জীবনের যত ব্যস্ততাই থাকুক, আমাদের সেই স্কুলজীবনের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও স্মৃতিগুলো যেন কখনো মুছে না যায়।
শুক্রবারের ছবিটি তাই শুধু একটি ছবি নয়—এটি আমাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়ের পুনর্মিলনের দলিল। এটি সাক্ষ্য দেবে, চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কিছু মানুষ, কিছু সম্পর্ক আর কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।
সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, জীবন বদলে যায়—কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব ও হৃদয়ের স্মৃতি থেকে যায় আজীবন।
শুক্রবারের এই সন্ধ্যা আমার স্মৃতির পাতায় তাই বিশেষ হয়ে থাকবে। ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কাঠবাদাম গাছের নিচ থেকে শুরু হওয়া এক সম্পর্কের গল্প আজ বহু বছর পর কুমিল্লার ঝাউতলার রয়েল হসপিটালে এসে নতুন করে প্রাণ পেল।
আলফু কাকুর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। মুক্তার ও তাঁর পরিবারের জন্য রইল আন্তরিক ভালোবাসা, শুভকামনা ও দোয়া। আর প্রিয় বন্ধু ফারুক—তোমার সেই একটি ফোনকলের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা; তোমার ফোনকল না এলে হয়তো আজকের এই আবেগঘন পুনর্মিলনও হতো না।
পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হোক বারবার, স্মৃতির দরজা খুলুক বারবার, আর আমাদের বন্ধুত্ব বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখুন, ভালো রাখুন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক পরিচিতি :
অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার,
এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচ,
ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়,
মতলব উত্তর, চাঁদপুর।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ







