প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১৯
গুরু পূর্ণিমা

সনাতনী হিন্দু বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে যাঁরা কর্মযোগের মাধ্যমে সমাজে আধ্যাত্মিকভাবে বিকশিত ও আলোকিত মানুষ গড়ে তোলেন, তাঁদের সাধনালব্ধ জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁদের সম্মানার্থে অনুসারী ও শিষ্যদের ভক্তিপূর্ণ প্রণতি নিবেদনের মধ্য দিয়েই গুরু পূর্ণিমা তিথি উদযাপিত হয়।
শুভ গুরু পূর্ণিমা তিথির গুরুত্ব
জগতে সকল গুরুদেবই আমার গুরু। তাঁদের শ্রীচরণ স্মরণ, মনন ও পূজন করা সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীর কর্তব্য-এটাই সনাতন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা। যিনি কৃপা করে আমার অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখিয়েছেন, সৃষ্টিকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন এবং জীবাত্মার মোক্ষলাভের পথ শিক্ষা দিয়েছেন, সেই গুরুদেবের শ্রীচরণে জানাই ভক্তিপূর্ণ প্রণাম।
তুমি বিষ্ণু, প্রজাপতি, শঙ্কর হে!
গুরুবন্দনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—গুরুই স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। সৃষ্টিকে পরিচালনার জন্যে তিনি এক থেকে বহুরূপে প্রকাশিত হলেও মূলত তিনিই এক ও অভিন্ন শ্রীগুরুদেব।
ঈশ্বরের শক্তির প্রকারভেদ
ঈশ্বরের শক্তি তিন প্রকার—একলক্ষ্মীগণ, পুরে মহিষীগণ আর ব্রজে গোপীগণ আর সভাতে প্রধান। ব্রজেন্দ্রনন্দন যাতে স্বয়ং ভগবান।।
অবতারী যৈছে কৃষ্ণ করে অবতার।
অংশিনী রাধা হৈতে তিনগণের বিস্তার। লক্ষ্মীগণ তাঁর বৈভববিলাংশরূপ। মহিষীগণ বিভবপ্রকাশ স্বরূপ। আকার-স্বভাব-ভেদে ব্রজদেবীগণ। কায়ব্যূহরূপ তাঁর রসের কারণ।।
বহু কান্তা বিনা নহে রসের উল্লাস।
লীলার সহায় লাগি বহুত প্রকাশ।।
তার মধ্যে ব্রজে নানাভাব রসভেদে। কৃষ্ণকে করায় রাসাদিক লীলা-স্বাদে।। গোবিন্দ-নন্দিনী রাধা- গোবিন্দ-মোহিনী। গোবিন্দী সর্বস্ব, সর্বকান্তা-শিরোমণি।।
(চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ৪র্থ পরিচ্ছেদ)
পরমেশ্বর শিবের দক্ষিণামূর্তি রূপকে ‘গুরুমূর্তি’ বলা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তর্ষি এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণুসহ সকল দেবতা এই পূর্ণিমা তিথিতে মহাদেবের নিকট পরমজ্ঞান লাভ করেন। তাই শিবকে আদিগুরু হিসেবে মান্য করা হয়। এ তিথিতে মহর্ষি ব্যাসদেব জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে এর আরেক নাম ব্যাস পূর্ণিমা। ব্যাসদেব বেদ সংকলন এবং মহাভারতের রচয়িতা হিসেবে সমাদৃত।
ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এবং বাংলাদেশের সনাতনী হিন্দুরা এ তিথিতে তাঁদের নিজ নিজ আধ্যাত্মিক গুরু ও দীক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিশেষ উৎসবের মাধ্যমে গুরু পূর্ণিমা পালন করেন।
কেন পালন করা হয়?
এ জগতে বিদ্যাশিক্ষা ও উন্নত জীবনের পথ নির্মাণের জন্যে যেমন একজন জাগতিক শিক্ষকের প্রয়োজন, তেমনি আধ্যাত্মিক জীবনের উৎকর্ষ লাভের জন্য একজন আধ্যাত্মিক গুরুর প্রয়োজন। সেই গুরু তাঁর সাধনালব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করেন।
গুরু ব্যতীত প্রকৃত জ্ঞান কিংবা ঈশ্বরপ্রাপ্তি সম্ভব নয়। ব্রহ্ম বা ঈশ্বর চৈতন্যময় রূপে সর্বত্র বিরাজমান হলেও ব্রহ্মজ্ঞ গুরুর আশ্রয় ছাড়া তাঁকে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ, ব্রহ্মজ্ঞ গুরুর মধ্যেই ব্রহ্মের চৈতন্যশক্তি বিশেষভাবে বিকশিত থাকে। এ কারণেই গুরু পূর্ণিমায় গুরু-উপাসনা, তাঁর আদর্শ এবং প্রদর্শিত পথ অনুসরণের অঙ্গীকার করা হয়।
সদ্গুরু কে?
নাম ও সদ্গুরুর দেহ একই তত্ত্বের প্রকাশ। বাহ্যিকভাবে তাঁর দেহে মানুষের মতো রক্ত-মাংস ও অস্থি থাকলেও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে তিনি নামতত্ত্বেরই প্রতীক।
যেমন-জল থেকেই বরফের সৃষ্টি হয়। বরফের কোনো অংশ নরম মনে হয়, আবার কোথাও তা অত্যন্ত শক্ত বলে অনুভূত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবই জল। তেমনি সদ্গুরুর দেহও আধ্যাত্মিক সত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতির জন্যে শিষ্যের অবশ্যই গুরুবাক্য পালন করা কর্তব্য। সনাতন ধর্মে গুরুর বাণী সম্পর্কে সংশয় পোষণ করলে ইহকাল ও পরকাল—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
মাতা গুরু, পিতা গুরু, গুরু জ্যেষ্ঠভাই।
তাঁহার চেয়ে অধিক গুরু ভজিলেই সে পায়।।
আমার জীবনে যাঁদের কাছ থেকে যা কিছু শিখেছি, তাঁরা সকলেই আমার গুরু। সেই সকল গুরুজনের শ্রীচরণে প্রণাম নিবেদনের মাধ্যমে গুরু পূর্ণিমা তিথিতে জগতের সকলের মঙ্গল কামনা করছি।
জগতের সকল জীব সুখী ও নিরোগ থাকুক।
লেখক : সারথি, শারদাঞ্জলি ফোরাম ও সনাতনী গবেষক।আমার পরম আরাধ্য গুরুদেব শ্রী শ্রী রামঠাকুর।








