বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৪৬

সকলের সর্বোত্তম প্রাপ্তি হয়ে উঠুক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনলাইন ডেস্ক
সকলের সর্বোত্তম প্রাপ্তি হয়ে উঠুক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয়ের গৌরবদীপ্ত উৎসব। এ উৎসব একান্তই বাঙালির নিজস্ব ও অনন্য সম্পদ। আমাদের শেকড়-সচেতনতার এ এক নান্দনিক উপলক্ষ। এ উৎসব কেবল নববর্ষকে বরণ কিংবা পুরোনো বছরকে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, আমাদের সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আর উৎসবপ্রবণ বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বনের ইতিহাস। পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি, বাঙালির নিজস্ব উৎসবগুলো ছিলো সত্যিকারের মিলন মেলা। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, প্রাণের সাথে প্রাণের সম্মিলনের সত্যিকারের উৎসব ছিলো এ লোকাচারগুলো। হলকর্ষণ উৎসব, জমিদারের খাজনা উৎসব, নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ এ উৎসবগুলো আমাদের জীবনে এমনি এমনি আসেনি। হাজার বছর ধরে বংশ পরম্পরায় উৎসবগুলো ঐতিহ্য আর ইতিহাসকে বহন করে আমাদেরকে উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। এতে কোনো মতপথ, ধর্মবর্ণের ভেদাভেদ ছিলো না। এ উৎসবের পরিচিতি ছিলো একটাই। এ ছিলো আম বাঙালির প্রাণের উৎসব। কেউ কখনও প্রশ্ন তোলেনি এটা ধর্মে হারাম, এটা শাস্ত্রের চোখে অচ্ছুৎ। মানুষ প্রাণ খুলে এসব উৎসবে মাতোয়ারা হতো। কিন্তু যতো দিন গড়িয়ে যাচ্ছে ততোই একদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসন যেমন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে গিলে ফেলছে, তেমনি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে আমাদের উৎসবে ঢুকে পড়েছে বিভেদ ও বৈষম্যের আগুন। ফলে পহেলা বৈশাখ আজ কারও কাছে উদ্যাপনের আর কারও কাছে তা প্রতিরোধের।

সম্রাট আকবরের আমলের আগে থেকেই এ ভূখণ্ডের বাঙালি বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করে আসছে। তখন অগ্রহায়ণ ছিলো আমাদের পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম মাস। একে নবান্নের মাধ্যমে বরণ করেই নতুন বছরকে জীবনের সাথে জড়িয়ে নেওয়া হতো। শরৎকাল ছিলো বছরের শেষ ঋতু। কাউকে আশীর্বাদ করতে গেলে বলা হতো, “তুমি শত শরৎ বেঁচে থাকো।” অর্থাৎ তোমার শত বছর পরমায়ু হোক। কিন্তু সম্রাট আকবর এসে খাজনা আদায়ে সমস্যা দেখতে পেয়ে বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস ঘোষণা করে পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ উদ্যাপনের উৎসবের প্রচলন করেন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে চৈত্রের চৌচির করা গরম আর বৈশাখের খরতাপ আগুনে উৎসব উদযাপন অনেকটাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবুও বাঙালি ঐতিহ্যকে লালন করার পুণ্য অভিপ্রায়ে এ কষ্টকে তুচ্ছ করে আসছে। কিন্তু দিন যতো যায় পহেলা বৈশাখ চলে যায় একদিকে কর্পোরেট বাণিজ্যের ক্রোড়ে আর অন্যদিকে ঘোরতর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আস্ফালনের শাঁখের করাতে। ফলে আম বাঙালি মন খুলে সমবেত হয়ে উৎসবকে উদ্যাপন করতে পারেনি। লোক দেখানো বাণিজ্য পশরার মাটির সানকিতে পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড় হতে যেমন টেনে নিয়ে গেছে কৃত্রিম কর্পোরেট মঞ্চে, তেমনি ‘মঙ্গল’ নিয়ে বিভীষিকা আর পহেলা বৈশাখের নির্মল শোভাযাত্রাতেও কারও কারও গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়। ফলে বৈশাখের উৎসবে হামলার হুমকি উৎসবকে সংকুচিত করে আনতে বাধ্য করে। বাঙালি হিসেবে এ যেমন আমাদের জন্যে বেদনার তেমনি লজ্জারও। অথচ গৌরবের বিষয় ছিলো এই, ইউনেস্কো আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছিলো।

বিশ্বের ইতিহাসে যদি আমরা চোখ বুলাই তবে দেখবো, ইন্দোনেশিয়ানরা তাদের সংস্কৃতিকে ধর্মের সাথে মিলিয়ে ফেলেনি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও ধর্মীয় বিধিনিষেধকে তাদের ঐতিহ্যের উৎসবে নাক গলাতে দেয়নি। আর ইউরোপ-আমেরিকার কথা তো বলাই বাহুল্য। আজকাল আমাদের দেশে ইংরেজি নববর্ষ উদ্যাপনে একদল মানুষের উৎসাহের কমতি থাকে না, কিন্তু পহেলা বৈশাখ এলে তাদের উন্নাসিকতা বেড়ে যায়। পাশ্চাত্যের হ্যালোইন পালনে বাধা নেই, কিন্তু বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশে অ্যালার্জি তৈরি হয়। সত্যিই অতি বিচিত্র এ দেশ! অতি বিচিত্র এ দেশের মানুষ!

তারপরও আমরা স্বপ্ন দেখি ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তার। আমরা বাংলাদেশি বাঙালি হিসেবেই আমাদের ঐতিহ্যের উৎসবকে সমুন্নত রাখতে চাই। আমরা আমাদের শেকড়কে জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত করতে চাই। কোনো বিদেশি সংস্কৃতিকে নিজেদের ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে দিতে আমরা চাই না। আমরা নির্বিঘ্নে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি হিসেবেই নববর্ষকে বরণ করতে চাই। যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে বিভেদকে জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা বাংলা নববর্ষকে আমাদের জাতীয় জীবনে পেতে চাই। যে যেখানে থাকুক না কেন, আমরা সবাইকে জানাই শুভ নববর্ষ। সকল বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ নিয়ে আসুক শান্তি ও সমৃদ্ধি। স্বাগত হোক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। নববর্ষ হয়ে উঠুক আমাদের সকলের সর্বোত্তম প্রাপ্তি সর্বস্তরে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়