শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্লা সেলিম!

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৯

কদমবুচি শুধু জায়েজ নয়, সুন্নাতে সাহাবাও

মুফতি মাওলানা মোঃ বখতিয়ার উদ্দিন আল কাদেরী
কদমবুচি শুধু জায়েজ নয়, সুন্নাতে সাহাবাও

ইসলাম সুন্দরতম একটি আদর্শের নাম। ইসলামের শিষ্টাচারিতা অতি চমৎকার। ছোট-বড় সকলের প্রাপ্য অধিকার, সম্মান, স্নেহ, আদব, ভালবাসা, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সুন্দর আচরণের যে শিক্ষা ইসলামে দেয়া হয়েছে-তা অন্য কোন ধর্মে দেখা যায় না। বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে বড়কে সম্মান করেনা এবং ছোটকে স্নেহ করেনা সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নবী-ই করীমের শিক্ষা। সম্মান প্রদর্শন বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন সালাম প্রদান, দেখলে সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাওয়া, কাজকর্মে সহযোগিতা করা, প্রয়োজনীয় বস্তু এগিয়ে দেয়া, পর সাক্ষাৎ হলে কিংবা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাওয়ার প্রাক্কালে কদমবুচি করা। বড়দের মধ্যে রয়েছে- মা-বাবা, শিক্ষকমণ্ডলী, দাদা-দাদী, নানা-নানী, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, চাচা-চাচী, মামা-মামী, বড় ভাই, বড় বোন ইত্যাদি মুরব্বীদের কাছ থেকে দো’আ নেয়ার অন্যতম পন্থা হল সালাম বিনিময়ের পর কদমবুচি করা। এ কাজটি অত্যন্ত চমৎকার একটি শিক্ষা, যাতে করে শিশুরা মুরব্বীদের প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল ও বিনয়ী হয়ে গড়ে উঠে। অনেকে এ কদমবুচি নাজায়েয মনে করে, এমনকি মুরব্বীদেরকে কদমবুচি করা হারাম, শির্ক ইত্যাদি ফতোয়া দিতেও দ্বিধাবোধ করেনা। মূলত পবিত্র কোরআন-হাদীসের দলীল ছাড়া এ ধরনের লাগামহীন বক্তব্য দ্বারা নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্তির শিকার হয়। আর সমাজ হয় শিষ্টাচার বঞ্চিত, ছোটদের মনে বড়দের। প্রতি শ্রদ্ধা কমতে থাকে। তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা সুন্দরতম আদব-কায়দার অন্যতম পন্থা যে কদমবুচি ইসলামী শরীয়তে কতটুকু অনুমোদিত তা পাঠকসম্মুখে উপস্থাপনই এ প্রয়াস। নিম্নে কদমবুচির বৈধতার উপর আরো কয়েকটি দলীল উপস্থাপন করা হল: হযরত ওয়াযে ইবনে আমের রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন একদা আমরা হুজুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র খিদমতে উপস্থিত হলাম অর্থাৎ আমরা হুযুরের পবিত্র হাত এবং চরণযুগল ধরে চুম্বন করলাম। -আদাবুল মুফরাদ: ১৪৪ পৃষ্ঠা হযরত বুরাইদা রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন-একজন বেদুঈন হুযুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র কাছে। মু’জিযা চাইল। হুযুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বেদুঈনকে এরশাদ করলেন, ওই বৃক্ষটাকে বলো আল্লাহর রসুল তোমাকে ডাকছেন। সে যখন বললো, বৃক্ষটা তার ডানে-বামে, সম্মুখে, পেছনে ঝুঁকল, তখন ওটার শেকড়গুলো ভেঙ্গে গেলো। তারপর তা মাটি খোদাই করে শিকড়গুলো টেনে ও বালি উড়িয়ে হুজুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’য়া সম্মুখে এসে দাঁড়াল এবং বলল-আসসালামু আলায়কা এয়া রসুলাল্লাহ। বেদুঈন বললো, আপনি তাকে আদেশ করুন যেন এটা ওখানে ফিরে যায়। তাঁর নির্দেশে ওটা ফিরে গেল এবং তার শেকড়গুলোর উপর গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বেদুঈন বললো, আমাকে অনুমতি দিন আমি আপনাকে সাজদা করবো। তিনি এরশাদ করলেন, যদি কাউকে সাজদাহ করার হুকুম দিতাম তাহলে নারীকে হুকুম দিতাম সে যেন তার স্বামীকে সাজদা করে। বেদুঈন আরজ করলো- হুযুর তাহলে আমাকে আপনার হস্ত ও পদদ্বয় চুম্বন করার অনুমতি দিন। তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করলেন। -শিফা শরীফ, দালাইলুহুযুয়্যাহ, আবু না’ঈম পৃষ্ঠা-৩৩২ কসীদায়ে বুরদা শরীফে আছে- হুযুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আহবানে বৃক্ষরাজি সাজদাকারী অবস্থায় চলে আসলো। তাঁর দিকে, পা ছাড়া, গোচা (কান্ড)’র পর উপর ভর করে চলে আসলো। (কসীদায়ে বুরদা) হযরত সোহাইব রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন- অর্থাৎ আমি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে দেখেছি, তিনি হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র হাতে ও পায়ে চুমু দিচ্ছেন। -বুখারী ফিল আদাবিল মুফয়ান, পৃষ্ঠা-১৪৪। হযরত ইবনে জাদ’আন রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, হযরত সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে বলেছেন-অর্থাৎ আপনি কি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আপনার হাত দ্বারা স্পর্শ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি তাঁর হাতে চুম্বন করলেন। -বুখারী ফিস আদান: পৃষ্ঠা-১৪৪) প্রমাণিত হল- ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শনার্থে বুযুর্গানে দ্বীনের হাতে ও পায়ে চুম্বন করা শুধু জায়েযই নয়, বরং সুন্নাত সম্মত। কতেক লোক বুযুর্গানে দ্বীনের হাত ও পায়ে চুমু খাওয়াকে শির্ক, পুজা ইত্যাদি বলে থাকে। উল্লেখিত বিশুদ্ধ বর্ণনাসমূহ তাদের ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা উচিত। যদি হস্ত ও পদ চুম্বন করা শির্ক হতো তাহলে হুযুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কখনোই তা করার অনুমতি প্রদান করতেন না। প্রতীয়মান হলো- হস্ত ও পদচুম্বন করলেও সম্মান প্রদর্শনার্থে শির্ক কিংবা পুজা নয়। যদি এটাকে শির্ক বলা হয়, তবে কি হুযুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি শির্ক করার অনুমতি প্রদান করেছেন? এবং সাহাবায়ে কেরামের দ্বারা কি শির্ক সংঘটিত হয়েছে? (না’উযু বিল্লা-হ!) এর কোনটিই হতে পারে না। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দ্বীন সহকারে প্রেরিত হয়েছেন, তার (দ্বীন) মৌলিক শিক্ষাই হল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যেহেতু বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ এবং সাহাবা-এ কেরামের পবিত্র জীবনে কদমবুচি তথা সম্মান প্রদর্শনার্থে বুযুর্গানে দ্বীনের হাত ও পা চুম্বন করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, তাই বলা যায়- কদমবুচি করা কোন গর্হিত কাজ তো নয়ই, বরং এটা একটি বরকতময় আমল। কদমবুচি শির্ক বলে যারা ফিতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে তারা বলে বেড়ায় কারো সামনে মাথা নিচু করাই সাজদাহ আর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সাজদাহ করা হারাম; তাই কদমবুচিও হারাম। অথচ তাদের জানা দরকার, রুকু ও সাজদার জন্য নিয়্যত আবশ্যক। যেহেতু কদমবুচির ক্ষেত্রে কোন মুসলমানের অন্তরে কণিকালেও সাজদাহ করার নিয়্যত থাকেনা, সেহেতু কদমবুচি হারাম বলাটা ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টির নামান্তর। পরিশেষে বলতে হয়, মা-বাবা, শিক্ষকমণ্ডলী, পীর-মাশাইখ, বুযুর্গানে দ্বীন এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে কদমবুচি নিঃসন্দেহে একটি বৈধ আমল, যা নতুন প্রজন্মের একটি উত্তম আদর্শও বটে। এতে শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি, স্নেহ, মমতা ও ভালবাসা বৃদ্ধি পায়। আর নবীজী এরশাদ করেছেন-তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার না হও এবং ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত একে অপরকে ভাল না বাস। সুতরাং প্রমাণিত হল-একে অপরের ভালবাসা ঈমানের দাবি ও ঈমানদারের পরিচায়ক। আল্লাহ পাক আমাদেরকে আল্লাহর রসুলের শেখানো আদর্শ পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করার তাওফীকু দান করুন। আমীন। আর এ নিবন্ধে একথাও প্রমাণিত হলো যে, সাজদা শুধু আল্লাহরই জন্য। মানুষ-মানুষ কিংবা অন্য কিছুকে কোনরূপ সাজদা করার অনুমতি ইসলাম দেয় না। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ইবাদতের নিয়্যতে সাজদা করলে তা হবে নিরেট শির্ক। আর তা’যীমের জন্য করলে তা হবে হারাম। আল্লাহ বুঝার তাওফীকু দিন!! আমীন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়