বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্লা সেলিম!

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৬

প্রবীণের ভ্রমণ অধিকার-বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন

হাসান আলী
প্রবীণের ভ্রমণ অধিকার-বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন

মানুষের জীবনে ভ্রমণ শুধু আনন্দের জন্যে নয়, এটি মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক সংযোগ এবং জীবনের প্রতি নতুন করে আগ্রহ ফিরে পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রবীণদের ভ্রমণকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়, প্রয়োজন হিসেবে নয়। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রবীণ বয়সে ভ্রমণ একটি মৌলিক মানসিক ও সামাজিক প্রয়োজন, যা তাদের সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রবীণ বয়সে মানুষের জীবনের গতি ধীর হয়ে আসে। কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষ হয়, দায়িত্ব কমে যায়, কিন্তু সেই সঙ্গে কমে যায় সামাজিক যোগাযোগ এবং জীবনের বৈচিত্র্য। অনেক প্রবীণ দিনের পর দিন একই পরিবেশে, একই রুটিনে জীবন কাটাতে থাকেন। এই একঘেঁয়েমি ধীরে ধীরে তাদের মনে নিঃসঙ্গতা, হতাশা এবং অবসাদ তৈরি করে। এই অবস্থায় ভ্রমণ তাদের জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।

ভ্রমণ প্রবীণদের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। নতুন জায়গা দেখা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া—এসব তাদের মনে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। তারা নিজেদের আর অবহেলিত বা অপ্রয়োজনীয় মনে করেন না। বরং তারা অনুভব করেন, জীবন এখনো চলমান, এখনো উপভোগ করার মতো অনেক কিছু আছে। এই অনুভূতি তাদের মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনে।

শুধু মানসিক নয়, ভ্রমণ প্রবীণদের শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। ভ্রমণের সময় তারা চলাফেরা করেন, নতুন পরিবেশে সময় কাটান, যা শরীরকে সক্রিয় রাখে। দীর্ঘ সময় ঘরে বসে থাকার ফলে যে শারীরিক দুর্বলতা তৈরি হয়, ভ্রমণ তা কমাতে সাহায্য করে। খোলা বাতাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং শারীরিক নড়াচড়া প্রবীণদের শরীর ও মনকে সতেজ রাখে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে অনেক প্রবীণ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভ্রমণে যেতে পারেন না। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। অবসর জীবনে অনেক প্রবীণের নিয়মিত আয় থাকে না। তারা নিজের আনন্দের জন্যে অর্থ ব্যয় করতে সংকোচ বোধ করেন। দ্বিতীয়ত, সহযাত্রীর অভাব। একা ভ্রমণ করা অনেক প্রবীণের জন্যে নিরাপদ বা স্বস্তিকর মনে হয় না। তৃতীয়ত, পারিবারিক বাধা। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় উদ্বেগ থেকে প্রবীণদের ভ্রমণে যেতে নিরুৎসাহিত করেন।

এই বাস্তবতায় প্রবীণের ভ্রমণকে বিলাসিতা হিসেবে নয়, অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন একজন প্রবীণের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনি তার মানসিক সুস্থতার জন্যে ভ্রমণের সুযোগ পাওয়ার অধিকারও থাকা উচিত। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকারি পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবীণদের জন্যে বিশেষ ভাড়া ছাড়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকিট এবং সহায়তা সেবা চালু করা যেতে পারে। এতে প্রবীণরা সহজে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে ভ্রমণ করতে পারবেন। একইভাবে বেসরকারি পরিবহন সংস্থা এবং পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রবীণবান্ধব সেবা চালু করতে পারে।

সামাজিক সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবীণদের জন্যে গ্রুপভিত্তিক ভ্রমণের আয়োজন করতে পারে। এতে প্রবীণরা নিরাপদ পরিবেশে ভ্রমণ করতে পারবেন এবং একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন। এটি তাদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পরিবারের সদস্যদের মনোভাব পরিবর্তনও অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রবীণদের সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে তাদের আটকে রাখা সমাধান নয়। বরং তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী, নিরাপদভাবে ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া উচিত। পরিবারের সহযোগিতা প্রবীণদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং তাদের জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।

প্রবীণ বয়স জীবনের শেষ অধ্যায় হলেও এটি আনন্দহীন বা সীমাবদ্ধ হওয়ার কথা নয়। এই সময়টাতেও মানুষের স্বপ্ন থাকে, ইচ্ছা থাকে, পৃথিবীকে দেখার আকাঙ্ক্ষা থাকে। সেই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। অতএব, প্রবীণের ভ্রমণকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এটি তাদের মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং জীবনের মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। প্রবীণের ভ্রমণ অধিকার নিশ্চিত করা মানে তাদের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যারা প্রবীণ, তারা একদিন এই সমাজ গড়েছেন। তাদের জীবনের শেষ সময়ে যদি আমরা তাদের একটু আনন্দ, একটু স্বাধীনতা এবং একটু পৃথিবী দেখার সুযোগ দিতে পারি, তাহলে সেটাই হবে তাদের প্রতি আমাদের সত্যিকারের শ্রদ্ধা।

প্রবীণের ভ্রমণ তাই কোনো বিলাসিতা নয়—এটি তাদের জীবনের একটি প্রয়োজন, একটি অধিকার এবং একটি মর্যাদার অংশ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়