বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫৬

স্বর্ণের ডিজিটাল মোহ—নিঃস্ব হওয়ার নতুন ফাঁদ?

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
স্বর্ণের ডিজিটাল মোহ—নিঃস্ব হওয়ার নতুন ফাঁদ?

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: স্বর্ণের ডিজিটাল মোহ—নিঃস্ব হওয়ার নতুন ফাঁদ?

প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে সত্য, কিন্তু সেই সুযোগেই হানা দিচ্ছে একদল আধুনিক তস্কর। কেনাকাটা থেকে ব্যাংকিং—সবই এখন আঙুলের ডগায়। এই ডিজিটাল বিপ্লব-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সম্প্রতি বাজারে আবির্ভাব ঘটেছে ডিজিটাল গোল্ড বা অ্যাপে স্বর্ণ জমানোর এক চটকদার মোহ। ‘গোল্ড কিনেন’ (Gold Kinen)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি আগামীর নিরাপদ বিনিয়োগ, নাকি ই-ভ্যালি, ডেসটিনি বা কুখ্যাত ইউনিপেটুইউ-এর প্রেতাত্মা?

Unipay2u
চিত্র: স্বর্ণ জালিয়াতির পথিকৃৎ ইউনিপেটুইউ (ছবি: সংগৃহীত)

স্মৃতিতে ইউনিপেটুইউ: ছয় হাজার কোটির সেই রক্তক্ষরণ

দেড় দশক আগের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাদের তাড়িত করে। ২০১১ সালে ইউনিপেটুইউ (Unipay2u) স্বর্ণে বিনিয়োগের নামে এদেশের প্রান্তিক মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনির প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছিল। তাদের প্রতারণার নীল নকশা ছিল আজকের এই অ্যাপগুলোর মতোই ‘পরিপাটি’। চাঁদপুরসহ সারাদেশের অগণিত নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ একটু বাড়তি লাভের আশায় তাদের জীবনের শেষ সম্বল—তিল তিল করে গড়া ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) বা পেনশনের টাকা তুলে দিয়েছিলেন সেই হায়েনাদের হাতে। আজ ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও সেই টাকা ফেরেনি; বরং হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়ে হারিয়ে গেছে অন্ধকারের গহ্বরে।

Destiny 2000
চিত্র: এমএলএম প্রতারণার ঐতিহাসিক আখ্যান ডেসটিনি-২০০০ (ছবি: সংগৃহীত)

রাষ্ট্রীয় অভিভাবকহীনতা: যেখানে আইনও মূক ও বধির

ডিজিটাল গোল্ড প্ল্যাটফর্মগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এদের আইনি ভিত্তিহীনতা। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এর ঝুঁকিগুলো আঁতকে ওঠার মতো। ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠান আমানত গ্রহণ করতে পারে না। অথচ এই অ্যাপগুলো স্বর্ণের নামে যে অর্থ সংগ্রহ করছে, তার কোনো ব্যাংকিং গ্যারান্টি বা আমানত সুরক্ষা নেই। এছাড়া বিএসইসি ও এমএলএম বিরোধী আইন অনুযায়ী, অনুমোদনহীন বিনিয়োগ স্কিম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

MTFE
চিত্র: আধুনিক অ্যাপ ভিত্তিক প্রতারণার নতুন ফাঁদ এমটিএফই (ছবি: সংগৃহীত)

অদৃশ্য সম্পদের মায়া ও গোপন চার্জের কারসাজি

ডিজিটাল গোল্ডের ক্ষেত্রে গ্রাহক তার মোবাইল স্ক্রিনে কেবল কিছু সংখ্যার অবয়ব দেখেন। কিন্তু সেই সমপরিমাণ স্বর্ণ আসলেও কোনো সুরক্ষিত ভল্টে রক্ষিত আছে কি না, তা যাচাই করার কোনো স্বতন্ত্র অডিট বা বাস্তব প্রমাণ গ্রাহকের আয়ত্তে নেই। তদুপরি, কেনার সময় ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বিক্রির সময় বড় অংকের সার্ভিস চার্জ-এর যে চাতুর্য রয়েছে, তাতে স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী না হলে গ্রাহকের মূলধনই খোয়া যাওয়ার উপক্রম হয়।

Evaly
চিত্র: ই-কমার্স ও ই-ভ্যালির গ্রাহকদের অনিশ্চিত পথচলা (ছবি: সংগৃহীত)

সঞ্চয় হোক নিরাপদ, হুজুগে নয়

আমাদের সমাজের এক বড় ট্র্যাজেডি হলো হুজুগে পড়ে বিনিয়োগ করা। আমরা ভুলে যাই যে, বিনিয়োগ মানে কেবল মুনাফা নয়, মূলধনের অখণ্ডতাও। যারা চটকদার বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ এই অনিশ্চিত গোল্ড অ্যাপে বিনিয়োগ করছেন, তারা মূলত জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে সুখস্বপ্ন দেখছেন। প্রকৃত নিরাপদ সঞ্চয় হলো সেটিই, যেখানে রাষ্ট্রের আইন আপনার অর্থের পাহারাদার। রাষ্ট্র যেখানে দায়বদ্ধ নয়, সেখানে আমানত রাখা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।

উপসংহার: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করুন

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, যারা সহজ উপায়ে সম্পদ বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখিয়েছে, দিনশেষে তারা সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে চম্পট দিয়েছে। ইউনিপেটুইউ থেকে এমটিএফই—প্রতিটি নামই এক একটি ট্র্যাজেডির আখ্যান। রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিহীন যেকোনো বিনিয়োগই একটি নিশ্চিত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ডিজিটাল রঙিন বিজ্ঞাপনের মায়া কাটিয়ে নিজের নিরাপদ ফিক্সড ডিপোজিট রক্ষা করুন। অ্যাপের কাল্পনিক স্বর্ণের চেয়ে সিন্দুকে রাখা এক রতি আসল স্বর্ণ হাজার গুণ বেশি নিরাপদ।

সতর্কতা সংকেত: বিপদ চেনার ৫টি লক্ষণ

  • অস্বাভাবিক মুনাফার হাতছানি ও প্রলোভন।
  • নতুন গ্রাহক যুক্ত করলে ‘রেফারেল বোনাস’ (পনজি স্কিম)।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসি-র তদারকির অনুপস্থিতি।
  • স্বর্ণ বাস্তবে স্পর্শ করা বা তাৎক্ষণিক ডেলিভারি পাওয়ার অভাব।
  • অর্থ উত্তোলন বা বিক্রির সময় অযৌক্তিক সার্ভিস চার্জের জাল।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়