প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৬:০১
রেললাইনের ‘মরণনেশা’: সাংবাদিকরা দেখলে গোয়েন্দারা দেখে না কেন?

|আরো খবর
রেললাইনের ‘মরণনেশা’: সাংবাদিকরা দেখলে গোয়েন্দারা দেখে না কেন?
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
সিনিয়র সাব-এডিটর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ও কলামিস্ট
সম্প্রতি আরটিভি-র ক্যামেরায় উঠে আসা রাজধানীর রেললাইন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে মাদক বিক্রির দৃশ্য কোনো সাধারণ প্রতিবেদন নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ ও প্রশাসনিক নজরদারির এক ভয়াবহ চিত্র। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, দিবালোকেই নারী, পুরুষ এমনকি কিশোররা অবলীলায় মাদক কেনাবেচা এবং সেবন করছে। প্রশ্ন জাগে, যে দৃশ্য একজন সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে, তা বছরের পর বছর প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে কীভাবে?
(ভিডিওটি আরটিভি থেকে সংগৃহীত)
নরক যন্ত্রণা যেখানে নিত্যসঙ্গী
পৃথিবীতে কেউ যদি জীবন্ত ‘নরক যন্ত্রণা’ দেখতে চান, তবে তাকে কোনো কাল্পনিক নরকে যেতে হবে না; তিনি যেন একবার কোনো মাদকসেবীর বাড়িতে গিয়ে দাঁড়ান। সেখানে গেলেই দেখা যাবে একটি সাজানো সংসার কীভাবে তিলে তিলে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সন্তানের নেশার টাকা জোগাতে মায়ের চোখের জল, বাবার অসহায় আত্মসমর্পণ আর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে এক চরম বিভিষিকায়। মাদকের এই ছোবল কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং একটি গোটা পরিবারকে জ্যান্ত কবরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। রেললাইনের পাশে বসে যারা আজ ধোঁয়ায় বুঁদ হয়ে আছে, তারা আসলে নিজেদের সাথে সাথে তাদের পরিবারের হাজারো স্বপ্নকে পুড়িয়ে ছাই করছে।
দৃষ্টির আড়ালে নাকি প্রশ্রয়ে?
রেলপথের দুই পাশে ঝুপড়ি ঘরগুলোতে মাদকের যে হাট বসেছে, তা একদিনে তৈরি হয়নি। মাদকসেবীরা সেখানে প্রকাশ্যেই পাইপ আর লাইটার নিয়ে ‘মরণনেশা’র ধোঁয়ায় বুঁদ হয়ে থাকছে। এই মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত। ভিডিওতে দেখা যায়, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই সেখানে লেনদেন চলছে, যেন এটি কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয়, বরং নিত্যদিনের বাজার। সাংবাদিকদের জন্য যদি এই স্পটগুলো খুঁজে পাওয়া এত সহজ হয়, তবে শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এখানে কার্যকর আঘাত হানতে পারছে না? এটি কি স্রেফ নজরদারির অভাব, নাকি পর্দার আড়ালে কোনো অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে?
কমিশনারের বক্তব্য ও বাস্তবতা
প্রতিবেদনে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়েছে। তিনি মাদকের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে কঠোর পদক্ষেপ এবং নিয়মিত অভিযানের কথা বলেছেন। তার এই বক্তব্য নীতিগতভাবে যথার্থ হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে এর মিল পাওয়া দুষ্কর। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার কথা বলা হয়, তখন রেললাইনের ওপর এমন প্রকাশ্য আসর সাধারণ মানুষের মনে অনাস্থা তৈরি করে। কমিশনারের বক্তব্য তখনই যথার্থ প্রমাণিত হবে, যখন কেবল দু-একজন সেবনকারীকে নয়, বরং এই ব্যবসার মূল হোতা বা ‘গডফাদার’-দের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
উপসংহার
ভিডিওতে যে দৃশ্য আমরা দেখছি, তা আমাদের রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করে সত্য তুলে ধরেছেন। এখন বল প্রশাসনের কোর্টে। পুলিশ কমিশনারের আশ্বাসবাণী কি কেবল কাগুজে শব্দে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রেললাইনের এই মরণনেশা চিরতরে বন্ধ হবে—তা দেখার অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ। মাদক নির্মূল না হলে আমাদের সমাজ এই ‘নরক যন্ত্রণা’ থেকে কোনোদিনই মুক্তি পাবে না।
সতর্কবার্তা: মাদক কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং একটি পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। মাদককে ‘না’ বলুন। আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি মাদকাসক্তির শিকার হন, তবে বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়তে মাদকের অন্ধকার জগত থেকে ফিরে আসুন।
জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা কেন্দ্র: ০১৭৫৫৫৫০০৬৭ অথবা সরকারি হেল্পলাইন ৩৩৩।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








