প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৮
একটি গানের খোঁজে

একটি গানের খোঁজে আমি হাঁটছি আসমুদ্রহিমাচল। একটি সুর আমাকে উন্মাতাল করছে অহর্নিশ। আমি ঘুম থেকে জেগে উঠে অস্পষ্ট শুনতে পাই সে গানের সুর, সারা দিনমান সে সুরের ভেতর চলতে থাকে আমার ঘূর্ণিপাক। আমি দোল খাওয়া ঘুড়ির মতো অবিরাম দুলতে দুলতে স্থির ও নির্মল হতে চাই, মলিন মর্ম মুছে দিতে আরাধনায় প্রবৃত্ত হই, মানমন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির সাথে মরমে বাজতে থাকে পুরানো সেই সুর আর আমার চোখে এমনতরো স্পষ্ট হতে থাকে প্রিয়ার মুখশ্রী যেন এইমাত্র আমি সে সুরের লহরীকে তারার দুল বানিয়ে গুঁজে দিচ্ছি প্রিয়ার খোঁপায়।
আমি বাতাসে কান পেতে শুনি আমাকে ক্ষীণস্বরে ডাকছেন রবীন্দ্রনাথ, “এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্নান নবধারাজলে।” আমি রবীন্দ্রনাথের সাথে হাঁটতে গিয়ে টের পাই উদাস, উদ্ভ্রান্ত আমার বিরহে প্রিয়দর্শিনীর অঙ্গ জ্বলে যাওয়া হাহাকার, প্রিয়ার খোঁজে যখন ভাটির গাঙ বেয়ে নৌকার হাল হাতে তুলে নিই, তখন আমার কানে ভেসে আসে এক বধূর হৃদয়সিক্ত গান, “তোরা কে যাসরে ভাটির গাঙ বাইয়া...
একটি গানের খোঁজে আমি গিয়েছিলাম চর্যার ধরায়। আচানক চর্যার ভেতর থেকে ভেসে আসে সুকোমল কুহু কুহু সুর, সেখানে পালতোলা নৌকা আমার কাঙ্ক্ষা উসকে দিয়ে মিশে যায় সুরের মায়ায়, সেখানেও রাখাল তাড়াতে থাকে একপাল গরু, তার গলায় উদগিরিত হয় সুরের অমৃত। আমি টের পাই, যে গানের খোঁজে আমি ছুটছি ক্লান্তিহীন; এই দেশের মৃত্তিকায়, জলে ও হাওয়ায়, ফুলে ও ফসলের শ্যামলিমায় মিশে আছে সে গানের সুর।
গান আমার মায়ের “হারিয়ে যাওয়া নোলক”, আমার বোনের সিঁথির সিঁদুর, বাবার হাতের লাঠির বেজে ওঠা ঠকঠক, বন্ধুর প্রাণোচ্ছল হাসি। আমার ভেতর ক্রমাগত বাড়ছে পরম বেদনার যে ভ্রুণ, তাকে বিরহী সুরের জল ও হাওয়ায় করছি নৈমিত্তিক পরিচর্যা। বেদনার হাতে হাত রেখে সুর চলতে থাকে জীবনের রেললাইনে। বেদনা আর সুরের প্রণয় পরস্পরকে করে তোলে আরশিনগরের আজন্ম পড়শী।
একটা গানের খোঁজে আমি নিজেকে শর্তহীন সমর্পণ করেছি পাখি ও ফুলের কাছে, পাহাড় ও পাথারের কাছে, সৌম্য ও স্নিগ্ধতার কাছে। আমি অপার হয়ে বসে থেকেছি সুদীর্ঘকাল। তারপর একদিন জেনেছি, যে গানটির জন্যে আমি দিগ্বিদিক ছুটেছি উদ্ভ্রান্তের মতো, সে গানের সুর মাখা আছে আমার মায়ের সর্বাঙ্গে। আমি আনত মস্তকে নিজেকে সমর্পণ করি মায়ের পদতলে, আমার দেহমন শীতল হয়ে আসে।
অবশেষে জেনেছি, আমাদের মৃদগত সকল গানের একটিই সুর। একই সুরে আমরা সকলেই জন্ম নিই, হাসি, কাঁদি; সুর কেটে গেলে মরে যাই, এই সুর সঞ্চারিত হয় অন্য কোনো প্রাণে, অন্য কোনো আখ্যান ও উপাখ্যানে। এভাবেই কালান্তরে চলতে থাকে অনুজ্ঞা। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অবিরত মস্তিষ্কের নিউরনে বেজে চলেছে যে মনোহরা সুর, বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দে তা বেজে চলবে অন্তহীন কাল, থামবে না কোনোদিন।








